শিল্প ক্ষেত্রে বড় পরিসরে কাজ করতে চাইতেন অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান

বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাস্কর ও শিল্পী অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান। গত ২০ জুলাই প্রয়াত হন তিনি।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাস্কর ও শিল্পী অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান। গত ২০ জুলাই প্রয়াত হন তিনি। কিংবদন্তি এ শিল্পীর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন এবং দেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে তার অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সামিট গাজীপুর ৪৬৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্কে’ একটি স্মরণসভা আয়োজিত হয়।

হামিদুজ্জামান খান ভাস্কর্য পার্ক ঘুরে দেখার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ (অব.), হামিদুজ্জামান খানের সহকর্মী, সহপাঠী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ, নারায়ণগঞ্জ আর্ট কলেজ ও ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা, দেশের খ্যাতনামা আর্ট গ্যালারি এবং হামিদুজ্জামানের পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া অনলাইনের মাধ্যমে যুক্ত হন সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান। হামিদুজ্জামান খান তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।

স্বামীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হামিদুজ্জামান খানের সহধর্মিণী ভাস্কর আইভি জামান বলেন, ‘ও অনেক দিন বাঁচতে চেয়েছিল। আরো অনেক কাজ করতে চেয়েছিল। আমি মাঝে মাঝে বলতাম আমরা মারা যাওয়ার পর আমাদের কবর কোথায় হবে? ও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। বিশ্বাসই করতে চাইত না এত তাড়াতাড়ি ও চলে যাব। কাজের প্রতি ভীষণ প্রেম ছিল ওর। জীবনের বেশির ভাগ সময়টা কাজ নিয়েই থেকেছেন তিনি। আমি নিজেও একজন ভাস্কর। তাই ওর কাজকে আমি সবসময়ই অনুপ্রেরণা দিয়েছি। কখনো থামাইনি। আপনারা ওর জন্য দোয়া করবেন।’

সামিট গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‌একদিন অফিসে বসে হামিদ ভাইয়ের সঙ্গে ভাস্কর্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, “বড় কিছু করতে চাই।” আমি বললাম, “চলুন, আমরা গাজীপুরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেসিপ্রোকেটিং বিদ্যুৎ কেন্দ্র ৪৬৪ মেগাওয়াট তৈরি করছি। সেখানে অনেক মেটালের টুকরো, স্ক্র্যাপ পড়ে আছে। এগুলো দিয়ে কিছু সৃষ্টি করেন।” সেই স্ক্র্যাপ দিয়েই তার কোমল হাতে গড়ে উঠল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় “‍হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্ক’’। কী আনন্দই না হয়েছিল তার! এখানেই দিন-রাত কাজ করতেন, সৃষ্টি করতেন, আমাদের শেখাতেন—শিল্প কীভাবে শ্রম থেকে জন্ম নেয়, শিল্প কীভাবে মনুষ্যত্বকে উঁচু করে। আজ সামিট পরিবার তার সে সান্নিধ্যে উপলব্ধি করেছি শিল্প ও শিল্পায়ন একে অন্যের পরিপূরক।’

বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিতে অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খানের অনবদ্য অবদান এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের ওপর তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন খ্যাতনামা শিল্পী নিসার হোসেন, ময়নুল আবেদিন ও চারুকলা অনুষদের শিক্ষক নাসিমুল খবির ডিউক। আলোচনা শেষে হামিদুজ্জামান খানের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে স্মরণসভার সমাপ্তি হয়।

সামিট গাজীপুর ৪৬৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্ক’-এ রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘতম ম্যুরাল। ২০১৯ সালে উদ্বোধনের পর থেকে এ পার্কে ৮৬টি ভাস্কর্য স্থাপন করেছেন হামিদুজ্জামান খান। এছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গভীর অর্থবহ ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য সিরিজ ‘‌রিমেমব্র্যান্স ৭১’-এর মাধ্যমে তার প্রতিভা সর্বাধিক প্রকাশ পায়, যা প্রথম তৈরি করেন ১৯৭৬ সালে। পরবর্তী চার দশক ধরে থিমটি বিভিন্ন রূপ, শৈলী ও মাধ্যমে পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে। এ শিল্পকর্মে বীর মুক্তিযোদ্ধা, পাখি ও স্বাধীনতার প্রতীককে নান্দনিকভাবে তুলে ধরেছেন। বঙ্গভবন, সিউল অলিম্পিক পার্কসহ দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন ভাস্কর্য উদ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামিদুজ্জামান খানের ভাস্কর্য স্থায়ীভাবে স্থান পেয়েছে। তিনি তার এসব কর্মের মধ্য দিয়েই অমর হয়ে থাকবেন সবার মাঝে।

আরও