অভিনয়, সাহিত্য, উপস্থাপনা

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন রাহুল

বছর দেড়েক আনন্দবাজার রবিবাসরীয়র নিয়মিত পাঠক ছিলাম। প্রথম পাতায় বড় পরিসরের এক একটা লেখা আসত বিচিত্র বিষয়ে।

একদিন দেখি সেখানে লেখকের নাম রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। বন্ধুত্ব, ফেলে আসা সময় ইত্যাদি নিয়ে লেখা—আজকের দিনে যাকে মুক্তগদ্য বলে অনেকে। পড়তে গিয়ে অনুভব করলাম শব্দের সঙ্গে অনুভবের যোগ খুব দৃঢ়। আজকাল এমন লেখা কালেভদ্রেই আসে। সন্দেহ হচ্ছিল লেখক আমাদের পরিচিত অভিনেতা কিনা। সার্চ করে নিশ্চিত হই, আসলেই তাই। ‘রাহুলের স্ক্র্যাপবুক’ নামে একটা বই চোখে পড়েছিল, কিন্তু সেটা নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী ছিলাম না। তবে ওই লেখাটা পড়ে বুঝেছিলাম এ অভিনেতা ভালো লেখকও বটে! অভিনয় অবশ্য আরো আগে থেকেই দেখেছি।

শুরুটা কবে ঠিক মনে নেই। তবে সেটা ২০১০ সালের আগেই হওয়ার কথা। ‘পিয়া রে’ গানটা শোনেনি, আমাদের বয়সের এমন মানুষ কমই পাওয়া যাবে। বালাজি শক্তিভেল পরিচালিত তামিল সিনেমা ‘কাদাল’-এর রিমেক ছিল ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ (২০০৮)। রাজ চক্রবর্তীর পরিচালনায় সে সিনেমায় অভিনয় করেন রাহুল ও প্রিয়াংকা সরকার। ‘পিয়া রে পিয়া রে’ গানটা পশ্চিমবঙ্গ পার করে স্যাটেলাইট টিভির কল্যাণে বাংলাদেশেও বাজত। টিনএজ লাভ স্টোরির এ সিনেমা জনপ্রিয় হয়েছিল পুরো মাত্রায়। তারপর অবশ্য রাহুল নায়ক হওয়ার খুব বেশি চেষ্টা করেননি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘অভিনেতা’, ক্যারেক্টার আর্টিস্ট।

২০১৩ সালে মুক্তি পায় কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘মেঘে ঢাকা তারা’। ঋত্বিক ঘটকের জীবন অবলম্বনে তৈরি। এ সিনেমায় ঋত্বিকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’র শঙ্কর চরিত্রটি রিপ্রাইজ করেন রাহুল। মূল সিনেমায় চরিত্রটি করেছিলেন অনীল চট্টোপাধ্যায়। কমলেশ্বরের সিনেমায় রাহুল কয়েক সেকেন্ড সম্ভবত সুযোগ পেয়েছিলেন অনীল অভিনীত শঙ্করকে ফুটিয়ে তুলতে। তিনি সেটা পেরেছিলেন এবং তার চেয়ে বড় ব্যাপার, রাহুলকে অনীলের ছোট সংস্করণ মনে হয়েছিল। মজার ব্যাপার ব্যক্তি জীবনে অনীল চট্টোপাধ্যায়ও নানা বিষয় নিয়ে আগ্রহী ছিলেন, রাহুলও তা-ই।

ক্যারিয়ারে খুব বেশি সফল (ব্যবসাসফল) সিনেমায় রাহুল অভিনয় করেননি। যেসব সিনেমায় অভিনয় করেছেন সেখানে তিনি ক্যারেক্টার আর্টিস্ট। সে কারণেই হয়তো মনে পড়ে সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত জুলফিকারের কথা। শেকসপিয়রের লেখা লেপিডাসের রেজারেকশন লালটু দাস নামে পুলিশ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তেমন কোনো স্টাইকিং চরিত্র না, কিন্তু বন্দুক তাক করে সংলাপ বলার দৃশ্যটা মনে পড়ে। আবার মনে পড়ে সদ্য স্ট্রিম হওয়া ওয়েব সিরিজ ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র কথাও। সেখানেও অভিনয় করেছেন পুলিশ চরিত্রে।

রাহুলের জন্ম অভিনয়-ঘেরা পরিবারে। তার বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চের অভিনেতা ছিলেন। রাহুলও অভিনয় করেছেন মঞ্চে, তারপর টেলিভিশন, সিনেমা এবং ওটিটিতে। সেই সঙ্গে ছিল লেখালেখি। খুব নিয়মিত না হলেও নিয়মিত বিরতিতে লিখতেন তিনি পত্রপত্রিকায়। সুখপাঠ্য লেখা সেসব। রাহুলের স্ক্র্যাপবুক, কলোনি কল্লোলিনীতে নাইন্টিজের নস্টালজিয়া মিলবে। এছাড়া লেখাপত্তর, জলের বায়োস্কোপও পাঠকরা খুঁজে নিতে পারেন। ভিন্ন এক রাহুলকে খুঁজে পাবেন তারা। শুনতে পারেন তার পডকাস্ট ‘সহজ কথা’। উপস্থাপক রাহুলের মধ্যে এক তার্কিককেও খুঁজে পেতে পারেন।

মূলত কলকাতার মাসালা সিনেমার ‘নায়ক’ ছিলেন না রাহুল। আবার তিনি অনীল চ্যাটার্জিও নন। খানিকটা ভাবুক, কিছুটা তার্কিক, অনেকটা অভিনেতা তিনি। দাদাগিরির সেটে জানিয়েছিলেন তিনি ক্রিকেট পাগল, কুইজার ছিলেন স্কুলে। তার কাজকর্মেও তার ছাপ আছে।

রাহুল চলে গেলেন অকালে। রেখে গেলেন টুকরো লেখা, অভিনয় আর কিছু জীবনবোধ। মানুষের জীবনে কতকিছুই না হয়। কত অদ্ভুত সমাপতন থাকে। ১৮ বছর আগে ‘পিয়া রে’ গেয়েছিলেন জুবিন গর্গ। গত সেপ্টেম্বরে সিঙ্গাপুরে পানিতে ডুবে মারা যান তিনি। ছয় মাস পর ওড়িশার তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে পানিতে ডুবে চলে গেলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।

আরও