লোকগল্প ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তি

স্বাধীনতার আগে থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রে লোকগল্পের প্রভাব দেখা যায়। বহু সিনেমা নির্মিত হয়েছে লোকগল্প ভিত্তি করে। নির্মাণ করেছেন নামী পরিচালক ও প্রযোজকরা। সময়ের পরিক্রমায় এ ধারা ক্ষীণ হয়ে এলেও এখনো বাংলাদেশের কনটেন্টে লোকগল্পের প্রভাব আছে। এ বিষয় নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক লেখার প্রথম পর্বটি আজ প্রকাশ হলো।

একটি দেশ, ভাষাভাষী অঞ্চল, জাতিসত্তাকে প্রকাশ করে তার লোকগল্প। শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের মুখে মুখে এ গল্পগুলো বেঁচে থাকে। ফলে কোনো না কোনোভাবে সাধারণ মানুষ নিজেদের যুক্ত করতে পারে গল্পগুলোর সঙ্গে। তারা সেই গল্পগুলোর কোনো চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে। ফলে গল্পের আবেদন কখনো কমে না। তাই চলচ্চিত্রের মতো আধুনিক মাধ্যমেও লোকগল্প দেখতে পছন্দ করে দর্শক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও একসময় ঘুরেফিরে এসেছে লোকগল্প। সেসব চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হয়েছে, বারবার দর্শক দেখেছে। কোনো সিনেমা রিমেকও হয়েছে। মূলত একটা নির্দিষ্ট কালপর্বে লোকগল্প ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তি।

লোকগল্প থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে প্রথমেই ‘রূপবান’-এর নাম করা যায়। ১৯৬৫ সালে সিনেমাটি নির্মাণ করেন সালাউদ্দিন। গল্পে দেখা যায়, এক রাজ্যের দরবেশ হুকুম করেন রাজার ১২ দিনের শিশুপুত্রকে ১২ বছরের এক কন্যার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ১২ বছরের জন্য গভীর জঙ্গলে পাঠাতে হবে। রাজা দরবেশের হুকুমমতে তার রাজ্যের উজিরের ১২ বছর বয়সী মেয়ে রূপবানের সঙ্গে তার ১২ দিনের শিশুপুত্রের বিয়ে দিয়ে বনবাসে পাঠিয়ে দেয়। গভীর জঙ্গলে নানা বিপদ-আপদের মধ্যে রূপবান তার ১২ দিন বয়সী স্বামীকে কোলে কোলে বড় করতে থাকে।

দর্শকমহলে দারুণ সাড়া ফেলা সিনেমাটি ব্যবসাসফল হয়েছিল। দর্শকরা সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। এতটাই আলোড়ন তুলেছিল যে সুজাতা যেই বাঁশ ধরে গান গেয়েছিলেন সেই বাঁশটি পরে নিলামে উঠেছিল।

স্বাভাবিকভাবেই এরপর লোকগল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের হিড়িক পড়ে। পরের বছর সফদার আলী ভূঁইয়ার পরিচালনায় আসে ‘রহিম বাদশা ও রূপবান’, ইবনে মিজানের পরিচালনায় ‘আবার বনবাসে রূপবান’ ও ‘জরিনা সুন্দরী’, সৈয়দ আউয়াল নির্মাণ করেন ‘গুনাই বিবি’। এ তালিকায় জহির রায়হানও আছেন। তার পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘বেহুলা’। একই সময়ে সালাউদ্দিন তার ‘রূপবান’ উর্দুতে মুক্তি দেন।

আজকে হলিউডে আমরা যে ফ্যান্টাসি ঘরানার সিনেমা দেখি, তার মূল বিষয়গুলো বাংলাদেশের লোকগল্পেও ছিল। তবে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক সময় আরব ও পারস্যের গল্পকেও প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

১৯৬৭ সালে আজিজুর রহমানের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘সাইফুলমূলক বদিউজ্জামান’। আরব্য রজনীর গল্প থেকে বাংলায় রচিত ‘সয়ফুলমূলক বদিউজ্জামান’ অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মিত।

সত্তরের দশক শুরুর আগে একদিকে লোককাহিনী অন্যদিকে ফ্যান্টাসিনির্ভর চলচ্চিত্র তৈরি হতে থাকে। এ সময় ইবনে মিজান ‘জরিনা সুন্দরী’, ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’, ‘আমীর সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী’, ‘রাখাল বন্ধু’র মতো আরো অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

আরো ছিল সফদার আলী ভূঁইয়ার ‘কাঞ্চন মালা’, খান আতাউর রহমানের ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘অরুণ বরুণ কিরণ মালা’, রহিম নওয়াজের ‘সুয়োরানী দুয়োরানী’, মহিউদ্দিনের ‘গাজীকালু চম্পাবতী’, শহীদুল আমিনের ‘রাজকুমারী চন্দ্রবান’, ‘শাহজাদী গুলবাহার’, নূরুল হক বাচ্চুর ‘কুচবরণ কন্যা’ [সাদাকালো], শফি বিক্রমপুরীর ‘আলাদীন আলিবাবা সিন্দাবাদ’, সফদার আলী ভূঁইয়ার ‘রসের বাইদানী’। এ রকম আরো অনেক সিনেমার নাম করা যায়।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় লোকগল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি সিনেমা নির্মাণ করেছেন ইবনে মিজান। তিনি এ ধারায় সাফল্যও পেয়েছেন। পাশাপাশি এফ কবির চৌধুরী, আজিজুর রহমান, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, শামসুদ্দিন টগর, তোজাম্মেল হোসেন বকুলসহ আরো বহু নির্মাতা এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

এ ধারাবাহিকতা ছিল সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকেও। বেদের মেয়ে জোসনা ছিল এর সর্বোচ্চ সফল অধ্যায়। এটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত। তোজাম্মেল হক বকুলের পরিচালনায় ১৯৮৯ সালে সিনেমাটি মুক্তি পায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সিনেমার ৫০টি প্রিন্ট অনেক বছর দেশের প্রতিটি হলে কয়েকবার করে প্রদর্শিত হয়। যশোরের ‘মণিহারে’ টানা ছয় মাস দেখানো হয়, আবার রাজশাহীর ‘উপহার’ হলেও পাঁচ মাসের বেশি চালানো হয়েছিল ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। এটি পশ্চিমবঙ্গে রিমেকও হয়েছিল।

পরবর্তী সময়েও লোকগল্প থেকে সিনেমা নির্মিত হয়েছিল। তবে এক্ষেত্রে বাংলার লোকগল্পে বিশেষ নজর না দিয়ে সাপভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের হিড়িক দেখা যায়। সময়ের পরিক্রমায় স্যাটেলাইটের আগমন, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নতুন গল্পের চাহিদায় এ ধারা সীমিত হয়ে আসে। নব্বইয়ের দশকে এ পরিবর্তন স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। (চলবে)

আরও