এবার ঈদুল আজহায় মুক্তি পেয়েছে সিনেমা ‘পিনিক’। নারী কেন্দ্রিক এ চলচ্চিত্রে রয়েছে রহস্য-রোমাঞ্চ। সিনেমাটি নির্মাণে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। সে গল্প বণিক বার্তাকে বলেছেন সিনেমার নির্মাতা জাহিদ জুয়েল এবং সিনেমার লেখক আখিউজ্জামান মেনন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি
আমাদের এখানে কমার্শিয়াল সিনেমায় পুরুষ প্রোটাগনিস্টই বেশি দেখা যায়। একজন নারীকে প্রোটাগনিস্ট করে সিনেমা নির্মাণের চ্যালেঞ্জগুলো কি ছিল?
জাহিদ : আমার কাছে মনে হয় নায়ক আসলে ‘গল্প’। যে ধরনের সিনেমা আমি দেখে বড় হয়েছি, বিশেষ করে হরর এবং থ্রিলার, সেখানে গল্পটাই মানুষকে টেনে নিয়ে যেত। সেখানে কে কাস্টিং থাকছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। সেই জায়গা থেকে সবস্ময়ই আমার গল্পের প্রতি একটা আগ্রহ ছিল। সেখানে পিনিকের গল্পটা খুবই চমৎকার। সেখানে আমার মনে হয়েছে একটা নারী কাস্টিং দরকার। সেটাকেই আমি নিয়েছি। চ্যালেঞ্জ তো থাকেই। আমাদের দেশের দর্শকরা বড় বড় কাস্টিং, পুরুষ প্রোটাগনিস্টে অভ্যস্ত। সেখান থেকে আমি একটু আলাদা গল্প বলার চেষ্টা করেছি।
‘পিনিক’ এর গল্প লেখার আইডিয়াটা কিভাবে এল?
মেনন : নির্মাতার চাওয়া ছিল এমন একটা গল্প বানানো যেখানে গল্পটাই প্রাধান্য পাবে। গল্পটাই হিরো হয়ে উঠবে। আমাকে অনেককিছুই ইন্সপায়ার করেছে। প্রথমত আমি খুবই জাদুবাস্তবতা দিয়ে প্রভাবিত একজন মানুষ। সেখান থেকে আমার মাথায় ছিল, গল্পটাই এমন একটা মোহ তৈরী করবে, যা সবকিছুকে ডমিনেট করবে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে গল্পটা নির্মাণ হয়েছে।
একটা গল্প নিয়ে অনেকদিন কাজ করার মত বিলাসিতা কি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে আছে?
মেনন : আমাদের ইন্ডাস্ট্রি তো অনেককিছুই দেয় না। চাইলেই যেকোন গল্প নির্মাণ করতে পারবেন না। পিনিক তো একটা ‘জনরা-শিফটিং’ সিনেমা। মিস্ট্রি, থ্রিলার, ফাইট, রোম্যান্টিসিজম সবকিছুই আছে। এটার পেছনে সময় দেয়ার জন্য অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। কিন্তু দিনশেষে আপনি যদি মনে করেন এটা করা উচিত, এটা আপনার প্রাণের কথা, তাহলে তো করতেই হবে। তো সেই বিলাসিতাটা নেই যে একটা কাজের পেছনে অনেকটা সময় দেব, কিন্তু সেই জায়গাটা ধীরে ধীরে তৈরী হচ্ছে সেটা ভালো খবর।
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত জীবন সিনেমাকে কতটা প্রভাবিত করে?
জাহিদ : অবশ্যই প্রভাবিত করবে। গল্পে না হলেও, প্রচার প্রচারণায় ইফেক্ট পড়ে। ব্যাক্তিগত জীবনে যদি আপনার একটা ব্যাড রিউমর থাকে, সেটা তো একটা নেগেটিভ প্রভাব ফেলবেই। এখানে আসলে গল্পটাকে ভালোবাসতে হবে। কে কি করছে সেই ব্যক্তিগত জায়গাটাতে না গিয়ে, ঐ গল্পে তার চরিত্রটা কেমন সেটা দেখতে হবে।
একজন পুরুষ হয়ে একটা নারী চরিত্র নিয়ে লিখতে গিয়ে কি কি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে?
মেনন : প্রথমত চরিত্রটার ইনার সাইকেল ডেভেলপমেন্টটাকে বুঝতে হয়েছে। সব চরিত্রই তো একটা জার্নির ভেতর দিয়ে যায়। ফিমেল চরিত্র তৈরী করার জন্য তার ইনার সাইকোলজিটা বুঝতে হয়েছে। তেমনিভাবে এটা তো দেখাতে হবে পর্দায়। সেটা কিভাবে রিসিভ হচ্ছে, সেটাও ভাবতে হয়েছে। আমি যেটা বুঝতে পারছি সেটা দর্শকের সাথে কতটুকু কানেক্ট করছে সেটাও ব্যালেন্স করতে হয়। দুইদিক থেকেই চ্যালেঞ্জটা নিতে হয়। সেক্ষেত্রে লেখকদের একটা আলাদা জার্নি থাকে। অবশ্যই ফিমেল সাইকোলজিটা বোঝাটা কঠিন ছিল। আমাদের এই সমাজের নারীরা নানা চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে যায়। আমি হয়ত সেটা অত গভীর থেকে বুঝতেও পারব না। সেটাই আমি যতটুকু পেরেছি বোঝার চেষ্টা করেছি।
অনেকসময়ই কমার্শিয়ালি সাকসেসফুল সিনেমা বানানোর জন্য আমরা ‘সোশ্যাল মিডিয়া ফ্রেন্ডলি’ ডায়লগ ব্যবহার করি। এটা কি সিনেমার গভীরতা কমিয়ে দেয়?
মেনন : পিনিকে এমন কিছুই ঘটেনি। একটা গল্পে তো অনেক এলিমেন্ট থাকে। ধরুন সোশ্যাল মিডিয়ার খুবই জনপ্রিয় ডায়লগ বা ‘মিম’ কে আপনি আপনার গল্পে নিলেন। গল্পের তো একটা নিজস্ব শরীর আছে। গল্প একটা বহমান নদীর মত। ওখানে জোর করে কিছু দিতে চাইলে হবেনা। আপনি যদি সেটাকে ফিট করাতে পারেন, কোন সমস্যা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার ডায়লগ নেয়াতে কোন সমস্যা নেই। ব্যবহারটা ঠিকভাবে করতে হবে।
সিনেমা বানানোর জন্য কি দর্শকের পছন্দ মাথায় রাখা উচিত? নাকি নির্মাতার স্বতন্ত্রভাবেই নির্মাণ করা উচিত?
জাহিদ : দর্শক নির্মাতাকে দেখতে চায় আসলে। দর্শন তো নিজেরা সিনেমা বানায় না। দর্শকরা তো আসলে নির্মাতার সিনেমাটা দেখতে যায়। দর্শকরাও চায়না নির্মাতা তাদেরকে পোট্রে করুক। দর্শক চায় তারা একটা চমৎকার গল্প দেখবে। দর্শকের মত করে কেউ সিনেমা বানায় না। ডিরেক্টর তার মত বানায়। দর্শক সেটা রিসিভ করে, দর্শক রিজেক্ট করে। এটা কখনই এমন হয় না যে দর্শক গিয়ে বলছে প্লিজ এভাবে সিনেমাটা বানান।
আমরা বেশিরভাগ সময়ই পোস্ট প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে দেখি, দেশের বাইরে থেকে পোস্ট- প্রোডাকশন করানোটাকেই অনেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। আমাদের দেশে কি স্টুডিওর সংকট রয়েছে?
জাহিদ : আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়ত ভাবি, বিদেশে সিনেমা নিয়ে গেলে অনেক ভালো করতে পারব। বা একধরনের ‘আওয়াজ’ তৈরী করতে পারব। আসলে এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু হয়েছে তেমনও আমরা দেখিনা। কিন্তু আমরা চেষ্টা করেছি পুরো সিনেমাটাই দেশে করার। শুধু কিছু অংশের ভিএফএক্স এর জন্য আমরা আমেরিকা পাঠিয়েছিলাম। তবুও সেখানে একজন বাংলাদেশীর কাছে পাঠিয়েছিলাম যে আমার বন্ধু। এখানে টেকনিক্যাল লোক নেই বলে বিধেশে পাঠিয়েছি এমন না। এখানেও অনেকেই আছে, অনেক ভালো ভালো কাজ করছে।
সিনেমা লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়া আমাদের দেশের কতটা নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ?
মেনন : সব পেশাতেই তো ঝুঁকি আছে। তবে হ্যা, এই পেশায় আসতে হলে যে কাউকেই মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে আসতে হবে। আমি যদি মনে করি খুব দ্রুত অনেককিছু হয়ে যাবে, তেমনটা এখানে হবে না। শুধুমাত্র সিনেমা লেখাকেই পেশা হিসেবে নেয়ার ক্ষেত্রে বলব, দুই নৌকায় পা দিলে সমস্যা। লেখার সাথে অন্য কিছু করতে গেলে একটাতে প্রভাব পড়বেই। এই পেশায় আসলে ধৈর্য নিয়ে আসতে হবে। এটা সারা পৃথিবীতেই। হলিউডে কিছুদিন আগে স্ক্রিপ্ট রাইটাররা টাকা পায়না তাই প্রটেস্ট করল। তাই সবাই স্ট্রাগল করছে। কিন্তু একটা ভালো দিক হল, যারা নতুন কাজ করছে, তাদের মধ্যে অনেকেই শুধু সিনেমা লিখেই অনেক ভালো করছে। ফিনানশিয়ালিও।
মাঝখানে আমাদের সিনেমা ছিল না, এখন ভালো ভালো সিনেমা হচ্ছে হল নেই। হলগুলো কেন ঠিক করা হচ্ছেনা?
জাহিদ : এখানে একটা বড় ইনভেস্টমেন্টের ব্যাপার আছে। পুরোনো হলগুলোতেই আসলেই অনেক সমস্যা আছে। সিনেমা দেখতে গেলে সাউন্ড ঠিক থাকে না, গরমে এসি থাকেনা। সেক্ষেত্রে আমাদের সিনেপ্লেক্সের সংখ্যা কম। এখানে সরকারের হস্তক্ষেপ লাগবে। আমাদের দর্শক আছে। আমাদের জনসংখ্যা অনেক বেশি। তাই হল থাকলে মানুষ সিনেমা দেখবে এবং অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই সরকারের উচিত এখানে ইনভেস্ট করা।