সংগীতে খুরশীদ আলমের ছয় দশক

সময় বদলেছে, বদলেছে গান প্রকাশ ও শোনার ধরনও। কিন্তু খুরশীদ আলমের কণ্ঠ এখনো শ্রোতাদের কাছে শ্রুতিমধুর।

রবীন্দ্রসংগীতচর্চা দিয়ে গানের জগতে পথচলা শুরু করেন সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম। এরপর আধুনিক গান, বেতার ও চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ছয় দশকের কাছাকাছি সময় ধরে বাংলা গানের সঙ্গে যুক্ত তিনি। সময় বদলেছে, বদলেছে গান প্রকাশ ও শোনার ধরনও। কিন্তু খুরশীদ আলমের কণ্ঠ এখনো শ্রোতাদের কাছে শ্রুতিমধুর।

খুরশীদ আলমের জন্ম জয়পুরহাটে। মাত্র তিন বছর বয়সে ঢাকায় আসেন। চাচা ড. আবু হায়দার সাজেদুর রহমানের কাছে সংগীতে হাতেখড়ি। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী। তার কাছেই রবীন্দ্রসংগীতের তালিম নেন খুরশীদ আলম। ষাটের দশকের শুরুতে বিভিন্ন আয়োজনে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে সাফল্যও পান। ১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালে ইস্ট পাকিস্তান এডুকেশন উইকে রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক গানে প্রথম এবং পল্লীগীতিতে দ্বিতীয় হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তার। ১৯৬৫ সালে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা এলে গানের পথেও পরিবর্তন আসে। এরপর আধুনিক গানে মনোযোগী হন তিনি।

১৯৬৬ সালে বাংলাদেশ বেতারে অডিশন দেন খুরশীদ আলম। অডিশন বোর্ডে ছিলেন আবদুল আহাদ, ফেরদৌসী রহমান ও সমর দাস। অডিশনের পর সমর দাস তাকে নিয়মিত তালিমের জন্য নিজের কাছে আসতে বলেন। ছয় মাসের সেই তালিমে গান পরিবেশনের পাশাপাশি স্বর ও কণ্ঠের নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। এ সময়ের অনুশীলন তার গায়কির ভিত শক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরের বছর আজাদ রহমানের সুরে ‘তোমার দু হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ ও ‘চঞ্চল দু নয়নে বলো না কি খুঁজছ’ গান দুটি বেতারে প্রচারিত হয়। প্রথম গানটি তৎকালীন পাকিস্তানে ডিস্কে প্রকাশিত হয়ে ভালো সাড়া পায়।

চলচ্চিত্রেও খুরশীদ আলম নিজেকে প্রমাণ করেছেন। এখানে তার যাত্রা শুরু ১৯৬৯ সালে। বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ সিনেমায় আজাদ রহমানের সুর ও সংগীত পরিচালনায় ‘বন্দী পাখির মতো মনটা কেঁদে মরে’ গানটি করেন তিনি। গানটির কথা লিখেছিলেন তার চাচা আবু হায়দার সাজেদুর রহমান। নায়ক রাজ রাজ্জাকের ঠোঁটে গানটি পর্দায় জনপ্রিয়তা পায়। শিল্পীর প্লেব্যাক ক্যারিয়ার বিস্তৃত হয়েছে কয়েক দশকজুড়ে। চার শতাধিক চলচ্চিত্রে গান করেছেন তিনি। রাজ্জাক, ওয়াসিম, মাহমুদ কলি, আলমগীর, জাভেদসহ অনেক নায়কের ঠোঁটে তার কণ্ঠের গান জনপ্রিয় হয়েছে। ‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে’, ‘যদি বউ সাজো গো’, ‘ধীরে ধীরে চল ঘোড়া’, ‘মা গো মা ওগো মা’সহ তার গাওয়া বহু গান বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। আজাদ রহমান ও সত্য সাহার সঙ্গে তার উল্লেখযোগ্য কাজের পাশাপাশি সমর দাস, খন্দকার নুরুল আলম, আলী হোসেন, আলম খান, রবীন ঘোষসহ আরো অনেক সুরকার ও সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

সহশিল্পীদের সঙ্গেও তার দীর্ঘ কর্মসম্পর্কের স্মৃতি রয়েছে। রুনা লায়লার সঙ্গে তার গাওয়া ‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে’ দর্শক-শ্রোতার কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। চলচ্চিত্রের কাজের সূত্রে জাভেদসহ সে সময়ের অনেক শিল্পীর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সেই সময়ের চলচ্চিত্রের গান রেকর্ডিংয়ে শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের সরাসরি উপস্থিতি ছিল নিয়মিত বিষয়। সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে একুশে পদক পেয়েছেন তিনি। নিজের শিকড়ের শহর বগুড়াতেও পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা।

খুরশীদ আলমের ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়ের সঙ্গে বাংলা গানের পরিবর্তনের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। তার শুরুর সময়ে গান শেখা ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিজ্ঞ শিল্পীদের কাছ থেকে নিয়মিত তালিমের সুযোগ ছিল। প্রায় ছয় দশকের এ পথচলায় খুরশীদ আলমের কণ্ঠে তৈরি হয়েছে বাংলা গানের অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। বেতারের গান থেকে চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক—বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে তার কাজের পরিসরও বদলেছে। তবে সংগীতের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনো অটুট।

আরও