একজন নারীকে পর্দায় দেখতে ভালোবাসে সমাজ, তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, আবেদন উপভোগ করে। অথচ সেই নারী যখন নিজের শর্তে বাঁচতে চান, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেন, তখনই শুরু হয় আপত্তি, নিন্দা আর চরিত্রের বিচার। প্রশ্ন জাগে, সমাজ কি সত্যিই সেই নারীকে ঘৃণা করে, নাকি ঘৃণা করে তার নিজের মতো করে বাঁচার সাহসকে?
২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ডার্টি পিকচার’ সিনেমায় বিদ্যা বালান অভিনীত ‘সিল্ক’ চরিত্রটি যেন এই দ্বন্দ্বেরই এক প্রতিচ্ছবি। চলচ্চিত্রজগৎ জানে, সিল্কের শরীরী আবেদন দর্শক টানে, তার উপস্থিতি ব্যবসা এনে দেয়। সিল্কও জানেন নিজের আকর্ষণের বাণিজ্যিক মূল্য। কিন্তু যে শিল্প তাকে ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা ও মুনাফা অর্জন করে, সেই শিল্পই তাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত। পর্দায় তিনি কাঙ্ক্ষিত, অথচ পর্দার বাইরের মানুষটি যেন অগ্রহণযোগ্য।
চরিত্রটি দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী সিল্ক স্মিতার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। বাস্তবেও চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই অভিনেত্রীর পরিচয় দীর্ঘদিন আটকে ছিল তার আবেদনময় পর্দার উপস্থিতিতে। অভিনয়ের বিস্তৃত ক্যারিয়ার ছাপিয়ে তার শরীরী ইমেজই হয়ে উঠেছিল আলোচনার প্রধান বিষয়। যেন একজন নারীকে পর্দায় যতটা আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, মানুষ হিসেবে তাকে ততটাই আড়াল করে রাখা হয়।
অনেক বছর পর, ভিন্ন এক সমাজ ও সময়ের বাংলাদেশে পরীমণিকে ঘিরেও দেখা যায় জনদৃষ্টির এমন এক জটিলতা। তার অভিনয়জীবনে স্বপ্নজাল, বিশ্বসুন্দরী কিংবা মা-এর মতো সিনেমা রয়েছে। কিন্তু সেসব সিনেমা নিয়ে কিংবা তার অভিনয় নিয়ে শেষ কবে আলোচনা হতে দেখেছেন আপনি? মনে করতে পারবেন না। আলোচনা হয় কেবল তার ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ইত্যাদি নিয়ে।
২০২১ সালে বোট ক্লাবের ঘটনায় যৌন নিপীড়ন ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তোলার পর ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায়। অভিযোগের বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি আলোচনার বড় অংশজুড়ে চলে আসে পরীমণির ব্যক্তিগত জীবন ও জীবনযাপন। পরে অন্য একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ফলে একজন নারী অভিযোগকারী, একজন অভিনেত্রী এবং একজন অভিযুক্ত—তার এই ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় একসময় মিশে যেতে থাকে জনপরিসরের আলোচনায়। অথচ অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াকে আলাদা করে দেখার প্রয়োজন ছিল।
এখানেই প্রশ্নটি আরো গভীর হয়ে ওঠে। কেন একজন অভিনেত্রীর অভিনয়ের চেয়ে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানুষের কৌতূহল কখনো কখনো বেশি হয়ে ওঠে? মনোবিজ্ঞানে ‘পরাসামাজিক সম্পর্ক’ বা প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ নামে একটি ধারণা রয়েছে। গণমাধ্যমের কোনো পরিচিত মুখকে নিয়মিত দেখতে দেখতে দর্শকের মনে তার সঙ্গে একধরনের একতরফা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তাকে দেখে, তার কথা শুনে দর্শকের মনে হতে পারে, মানুষটিকে তারা খুব ভালোভাবে চেনে। কিন্তু এই পরিচিতির অনুভূতি থেকেই কখনো জন্ম নেয় অদ্ভুত এক অধিকারবোধ—তিনি কী করবেন, কার সঙ্গে থাকবেন, কী পরবেন, এমনকি কীভাবে জীবন কাটাবেন, তা নিয়েও যেন মত দেয়ার অধিকার দর্শকের রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই বিচারকে আরো সহজ ও ব্যাপক করে তুলেছে।
গণমাধ্যমও এই চক্রের বাইরে নয়। একজন নারীর ব্যক্তিগত ঘটনা হয়ে ওঠে শিরোনাম, শিরোনাম থেকে তৈরি হয় বিতর্ক, আর সেই বিতর্কই আবার নতুন খবরের উপাদান। এভাবে একজন মানুষ ক্রমশ আড়ালে চলে যান, সামনে থেকে যায় তার সম্পর্কে তৈরি হওয়া একটি জনপরিচিত চরিত্র। দর্শক তাকে দেখতে দেখতে ভুলে যায়, পর্দার বাইরেও তার একটি ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে, যেখানে প্রবেশের অধিকার সবার নয়।
তবে একজন পরিচিত মানুষের কাজের সমালোচনা করা আর তাকে অপমান, হেয় কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের জন্য সামাজিকভাবে শাস্তি দেয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জনপরিচিতি কাউকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখে না, আবার কাউকে তার মর্যাদা হারানোর অধিকারও সমাজকে দেয় না।
‘ডার্টি পিকচার’-এর সিল্ক ও পরীমণির জীবন এক নয়। একজন সিনেমার চরিত্র, অন্যজন বাস্তবের মানুষ। তাদের অভিজ্ঞতাকেও এক করে দেখার সুযোগ নেই। তবু দুজনকে পাশাপাশি রাখলে সমাজের একটি পুরনো দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠে—নারীকে আকর্ষণীয় হিসেবে গ্রহণ করতে সমাজের আপত্তি নেই, কিন্তু সেই নারী নিজের স্বাধীনতার সংজ্ঞা নিজে নির্ধারণ করতে চাইলে শুরু হয় অস্বস্তি। তাকে সুন্দর হতে হবে, কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া চলবে না; আকর্ষণীয় হতে হবে, কিন্তু নিজের ইচ্ছার মালিক হওয়া যাবে না; জনপ্রিয় হতে হবে, কিন্তু প্রচলিত শালীনতার সংজ্ঞার বাইরে যাওয়া যাবে না।
হয়তো সমাজ সব সময় সেই নারীকে ঘৃণা করে না, যাকে সে নিন্দা করে। বরং কখনো কখনো সে অস্বস্তিতে পড়ে সেই নারীর স্বাধীনতায়, যিনি সমাজের অনুমতির অপেক্ষায় নিজের জীবন কাটাতে রাজি নন। আর সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, সেই নারীর গল্প বলার অধিকারটুকুও অনেক সময় তার নিজের হাতে থাকে না। অন্যেরা তার পরিচয় তৈরি করে, অন্যেরা তার বিচার করে, এমনকি অন্যরাই ঠিক করে দেয়—তিনি আসলে কেমন মানুষ।
তবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে তারকাদের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও তৈরি হয়। তাদের প্রতিটি প্রকাশ্য আচরণ, বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট অসংখ্য মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে তরুণ অনুসারীদের ওপর। তাই ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই তাদের উচিত নিজের প্রকাশভঙ্গি ও তার সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা। কারণ তারকাখ্যাতি শুধু মনোযোগ পাওয়ার সুযোগ নয়, সেই মনোযোগের সঙ্গে আসে কিছু দায়িত্বও।