পূর্বের প্রতিশ্রুতিগুলো ভেঙেছে নীরবে

বুকে ভীষণ আক্ষেপ নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!’ বলে কবিতা শেষ করেছিলেন।

বুকে ভীষণ আক্ষেপ নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!’ বলে কবিতা শেষ করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি আসলে মিথ্যার ডাকনাম। এমন কথায় বিশ্বাস করেই চোখে স্বপ্ন নিয়ে সুদূর রাশিয়া থেকে লন্ডনে এসেছিল তাতিয়ানা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার নাবালিকা মেয়েটি মারা যায় লন্ডনের এক হাসপাতালে। আনা হাসপাতালের রাশিয়ান-ব্রিটিশ নার্স, তাতিয়ানার জিনিসপত্রের মধ্যে একটা ডায়েরি খুঁজে পায়। জানতে পারে তার রাশিয়ার গ্রাম থেকে যুক্তরাজ্যে আসার নেপথ্যকথা। কীভাবে সে গৃহকর্মীর কাজ করার মিথ্যা বলে এখানে আসে, কিন্তু রাশিয়ান মাফিয়ার খপ্পড়ে পড়ে যৌনকর্মী হতে বাধ্য হয়। নীলচে শিরায় ঢোকায় মাদক। পড়তে পড়তে আনা মুখোমুখি হয় এক ভয়ংকর সত্যের। রাশিয়ান মাফিয়া বস সেমিওন তাতিয়ানাকে ধর্ষণ করেছিল। আনা বুঝতে পারে, সেমিওন সম্ভবত তাতিয়ানার সন্তানের বাবা।

সত্য খুঁজতে গিয়ে আনা জড়িয়ে পড়ে ভয়ংকর এক রুশ মাফিয়া পরিবারের সঙ্গে। পথে দেখা হয় ড্রাইভার নিকোলাইয়ের সঙ্গে। নিজেকে শুধু ড্রাইভার দাবি করলেও নিকোলাই পরিবারটির সব কুকর্মের ওপর চাদর বিছানোর দায়িত্ব পালন করে। শেষ পর্যন্ত তাতিয়ানার সন্তানকে কি আনা বাঁচাতে পারে? কেউ কি আদৌ কথা রাখে? এভাবে আমাদের সাদা-কালোর বাইনারি চিন্তাভাবনার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর জগতে আলো ফেলেছিল ডেভিড ক্রোনেনবার্গের ‘ইস্টার্ন প্রমিজেস’। নিঃসীম পাপের জগতে আকণ্ঠ ডুবে থেকেও নৈতিকতার প্রশ্নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার এক দার্শনিক সত্যের মুখোমুখি করেছিলেন তিনি। বোঝাতে চেয়েছিলেন, নৈতিকতার বাঁধ ভেঙেও ঢুকে পড়তে পারে ঘোলাটে বেনোজল।

গ্যাংস্টার সিনেমার বহুল ব্যবহৃত ফর্মুলায় সিনেমাটিকে ফেলা যায় না। সাধারণত গ্যাংস্টার সিনেমাগুলোয় সহিংসতাকে কাব্যিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ এখানে সহিংসতাকে শুধুই দর্শককে শক দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় না, বরং হয়ে ওঠে এক ধরনের ভাষা। রক্তাক্ত দৃশ্য হয়ে ওঠে চরিত্রগুলোর অস্তিত্বের সঙ্গে সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ। যেমনটি দেখা যায় বিখ্যাত বিতর্কিত বাথহাউজ ফাইটের দৃশ্যটায়। এখানে নগ্ন সহিংসতা দর্শককে পেছনে ঠেলে দেয় না, চোখ বন্ধ করতে বাধ্য করে না। অস্বস্তি সত্ত্বেও দেখায় নিকোলাইয়ের ট্যাটু ভরা শরীরে আঁকা এক নীরব দলিল। বুক, পিঠ, হাঁটু সবখানে ছড়িয়ে থাকা ট্যাটুগুলো কেবল ছবি নয়, একেকটা জীবনপাঠ। ক্রোনেনবার্গ সবসময়ই শরীর নিয়ে কাজ করেছেন (দ্য ফ্লাই, ক্র্যাশ)। রাশিয়ান মাফিয়া সদস্যদের শরীরে উল্কির মাধ্যমে ‘পরিচয়’ লেখা হয়। ট্যাটু মানে অতীত, ইতিহাস, ক্ষমতা। নিকোলাইয়ের ট্যাটু নেয়ার দৃশ্যটি পুরুষতান্ত্রিক রীতির এক পুনর্জন্ম। দর্শককে জিজ্ঞেস করে, আমাদের পরিচয় আমরা নিজে নির্ধারণ করি, না সমাজ আমাদের শরীরে খোদাই করে দেয়?

গ্যাংস্টার সিনেমায় নারীদের প্রায়ই ভোগ্যপণ্য বা ট্র্যাজিক লাস্যময়ী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু আনা একজন মা, একজন সহমর্মী নার্স, একজন অনুসন্ধানী। সে শুধুই পুরুষদের জগতে বিচরণ করে না, বরং নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে সেই পুরুষতান্ত্রিক গ্যাংস্টার কাঠামোকে প্রশ্ন করে। নাবালিকা কিশোরী তাতিয়ানাকে ধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয়, তার ডায়েরি গোটা গল্পের ট্রিগার। এভাবে সিনেমাটি হয়ে ওঠে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক স্তবগান, যা অন্যান্য গ্যাংস্টার সিনেমায় দুর্লভ।

গডফাদার, ক্যাসিনো, স্কারফেস, গুডফেলাস সিনেমাগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইতালীয় পরিবারকেন্দ্রিক। অথচ ইস্টার্ন প্রমিজেসের রাশিয়ান মাফিয়া ডায়াস্পোরিক—অর্থাৎ নিজের দেশ থেকে ছিটকে পড়া ব্রিটিশ সমাজে অনুপ্রবেশকারী অভিবাসী। এ সাংস্কৃতিক সংঘাত, পরিচয়ের রাজনীতি, ভাষার দ্বৈততা, আত্মপরিচয়ের সংকট, দুঃখবোধ প্রচলিত মাফিয়ার গল্পের বাইরে গিয়ে এক অনন্যতা এনে দিয়েছে সিনেমাটিকে।

ভিগো মর্টিনসেনের জোরালো অথচ শান্ত উপস্থিতিও এ উচ্চতা ছুঁতে সাহায্য করেছে। সংযত অথচ সংবেদনশীল পারফরম্যান্স, বিশেষত সে বিখ্যাত বাথহাউজ ফাইটের দৃশ্যে, চরিত্রটির কঠোরতা ও অন্তর্নিহিত মানবিক দ্বন্দ্ব উন্মোচিত করে। শারীরিক রূপান্তর, রাশিয়ান উচ্চারণ, ট্যাটুগুলোয়ও রয়েছে নিখুঁত নিষ্ঠা। নাওমি ওয়াটস এক সাহসী কিন্তু মানবিক নারীর ভূমিকায় আবেগ ও শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। বন্দুক ধরেন না, চিৎকার করেন না, তবু সিনেমার সবচেয়ে বিপজ্জনক চরিত্র।

কারণ তিনি প্রশ্ন তোলেন। আর সত্যের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা নারী কোনো পুরুষের বন্দুকের গুলির চেয়েও ভয়ংকর। এখানে ক্রোনেনবার্গের ক্যামেরাও এক নৈর্ব্যক্তিক চরিত্র। না চরিত্রের অনুভূতিতে মাতোয়ারা, না দোষীর দণ্ডে আবেগপ্রবণ। স্থির ক্যামেরার চোখে দর্শক যেন অনুসরণ করতে করতে ঘটনাগুলো ঘটতে দেখে। ক্রোনেনবার্গ দৃশ্য বদলান ধীরে, কাট দেন সময় নিয়ে। সবচেয়ে গভীর সংলাপগুলো অনুচ্চারিত থেকে নীরবতায় ভেসে আসে। চোখের ভঙ্গিতে, দরজার টানে, সিগারেটের ধোঁয়ায়, রক্তাক্ত শরীরে, রেস্তোরাঁর আড়ালে শীতল কসাইখানায় ধ্বনিত হয় নিঃশব্দ চিৎকার। হাওয়ার্ড শোরের আবহসংগীত রাশিয়ার মরমি ব্যঞ্জনায় মুখর। ইগোর আউটকিনের ‘ডার্ক আইজ’ সে নীরবতার তৃষ্ণাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি গ্যাংস্টার ধারায় এরই মধ্যে হয়ে উঠেছে কাল্ট ক্ল্যাসিক। আর নির্মাণশৈলী প্রত্যক্ষ করে সন্দেহও থাকে না, কেন ক্রোনেনবার্গকে ক্র্যাশ সিনেমার জন্য কান ফেস্টিভ্যালে স্পেশাল জুরির পুরস্কারে ভূষিত করে বিশেষ সম্মান দেয়া হয়েছিল।

আরও