বাংলাদেশে জেলফেরত মানুষের সঙ্গে সমাজ ঠিক কেমন আচরণ করে? জেল কি আসলেই সংশোধন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পেরেছে? কিংবা জেলের দাগ লেগে যাওয়া মানুষ কি কখনোই সেই দাগ মুছতে পারে? এমন নানা প্রশ্ন মনে নিয়ে দর্শক ‘দাগি’ দেখে হল থেকে বের হয়েছিল। তাদের সঙ্গে আমিও এক সন্ধ্যায় হাউজফুল শোতে 'দাগি' দেখলাম। আশপাশে তাকিয়ে খেয়াল করলাম, দর্শক শিহাব শাহীনের সিনেমা খুব জমিয়ে দেখল, মন খারাপ করল, হাসল, শেষে কেউ ভেজা চোখে নিয়েও বের হল। প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র।
শুরু থেকে শুরু করা যাক। সিনেমা শুরু তো, গল্পে ঢোকা শুরু। শিহাব শাহীন এখানে এক মিনিটও সময় নেননি। কেউ হলে দেরিতে ঢোকা মানে 'দাগি'র গুরুত্বপূর্ণ শুরুটা মিস করে যাওয়া। জেলজীবন না দেখিয়েই নিশানকে দেখা যায় বিজয় দিবসের দিনে ভাল আচরণের জন্য আটমাস আগেই জেল থেকে বের হচ্ছে। ১৪ বছর খুনের মামলায় সাজা খেটে নিশানের মন আর ভঙ্গিতে এসেছে পরিবর্তন। শুধু জেল খেটে নিজেকে নির্দোষ না ভাবা নিশান চায় তাকে পরিবার, সমাজের সবাই মাফ করে দিক। কিন্তু জেলের দাগ একবার লেগে যাওয়া 'দাগি'কে কি সবাই সহজে মাফ করতে পারে?
'দাগি'র সবচেয়ে বড় পজিটিভ দিক গল্পের বাস্তবতা ও স্ক্রিনপ্লে। পুরো সিনেমায় একবারও গল্পের রেখা থেকে ছিটকে যাবে না দর্শক। বিশেষ করে বিরতির আগে শিহাব শাহীন একজন জেলফেরত মানুষের সঙ্গে সমাজ ও পরিবার কীভাবে আচরণ করে, তা দুর্দান্তভাবে দেখালেন। একইসঙ্গে এর নেগেটিভ দিক - সেকেন্ড হাফ। যে ফ্লোতে গল্প এগুচ্ছিল, বিরতির পর সেটা অনেকটাই খেই হারিয়ে ফেলে।
আফরান নিশো 'সুড়ঙ্গ'র পর আবার সময় নিয়েছেন। ফিরেছেন দারুণ গল্প নিয়ে। 'নিশান' চরিত্রটি নিশোর জন্য সেরা ছিল তা বলা যায়। তিনি কাজও ভালো করেছেন। যেমন লুক, কস্টিউম তেমনি এক্সপ্রেশন আর ডায়ালগ। নিশোর পারফরম্যান্স দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখেছে। ভাল করেছেন তমা নির্জাও। 'সুড়ঙ্গ'র এই জুটিকে দর্শক গ্রহণ করেছেন। তবে নিশান আর তমার 'জেরিন' ক্যারেক্টার দুইটার প্রেমের সম্পর্ক দেখানো উচিৎ ছিল আরেকটু আগে থেকেই। সম্ভব হলে ওদের অন্তরঙ্গতা আর্টিস্টিক্যাল ওয়েতে দেখানো যেত। শহীদুজ্জামান সেলিম মারোয়ারী হিসেবে হিন্দিতে ভালই সংলাপ বললেন। খল চরিত্রে ছিলেন চমৎকার। তবে তার চরিত্রটা খুব একটা কনভিন্সিং না। রাশেদ মামুন অপুও সমানতালে খল চরিত্রে ‘বদগিরি’ দেখালেন। পিতৃত্বের গভীরতা দেখানোর জায়গাটিতে ভাল করেছেন। সংলাপ বলেছেন নিজের এলাকার ভাষায়। তবে আফসোসের জায়গা সুনেরাহর জন্য। এত ভালো একটা কেমিস্ট্রি বিল্ড আপ কিংবা টেনে নিয়ে যাবার জায়গা থাকলেও তিনি আসলেন আর বিদায় নিলেন। এর বাইরে মনিরা মিঠু, গাজী রাকায়েত, মনোজ প্রামাণিক সবাই এনাফ গুড।
‘দাগি’র পোস্টার | ছবি: আইএমডিবি
সিনেমার গানগুলো দৃশ্যের সঙ্গে ভাল সিঙ্ক করেছে। 'আমায় দিও' গানটি সিনেমা হলে শুনতে ভাল লেগেছে। তবে বিজিএমে আলাদা করে বিশেষ কিছু কানে লাগেনি। একটা দায়সারা ভাব ছিল পুরো কাজটায়। এছাড়া খুব একটা অ্যাকশন নেই, নিশো তাতে খুব সাবলীল না।
সিনেমার নেতিবাচক দিক এর চিত্রনাট্যের শেষাংশ। গাঁথুনি আরো ভালো হতে পারত। গল্পে যেহেতু খুব জোর দেয়া হয়েছে, অ্যাকশন পার্ট আরো ছোট করা যেত। বর্ডারে গোলাগুলির যে দৃশ্য দেখানো হয়েছে, তা খুব খেলো মনে হল অথচ ব্যাপারটা এত সহজ না। প্রতিটা বাড়িই বলতে গেলে পুরনো ধাচের দেখানো হল। ভালো লাগেনি, নিশো আর সুনেরাহর না জমা অংশটা। আর, দুটো সংলাপের জন্য পুলিশের চরিত্র না আনলেও হত। তবে দেশী সিনেমায় শায়েরির এত ভাল ব্যবহার কেউ করেছে বলে জানা নেই।
'দাগি'র গল্পটা খারাপ লাগবে না। শিহাব শাহীন কিছু জায়গায় এখনো সিনেমাটিক হয়ে উঠতে পারেননি তবে এটাকে আবার কোনোভাবেই ওয়েব ফিল্মের কাতারে ফেলা যাবে না। বড় পর্দারই সিনেমা। ঈদের তুমুল প্রতিযোগিতায় ভায়োলেন্স, অতিরিক্ত নাচানাচি কিংবা মাসালা ফাইট সরিয়ে ভালো গল্পের সিনেমা দেখতে চাইলে 'দাগি' ভাল লাগবে।
তবে সিনেমাটা ১২-১৫ মিনিট অতিরিক্ত লম্বা হওয়ার একটা আফসোস অনেকেই করেছে। হলের বাইরে তা নিয়ে কথাও উঠেছে। বিজিএমও খুব আহামরি না, হরহামেশা ব্যবহারের মত লাগল। মনে হলো ঈদের জন্য টাইট শিডিউলে তাড়াহুড়ো করেই কাজ শেষ করতে হল 'দাগি'র। তবে এক তারকার বাইরে গিয়ে কাজ করার জন্য এসভিএফ, চরকি, আলফা আই ধন্যবাদ পাবে।