গানের ওপারে ‘গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার’

তার লেখা গানগুলোর বড় অংশে ছিল প্রেমের হাতছানি। ছিল নিভুনিভু মোমবাতির মতো প্রেমের বেদনাও। ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’; ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন’; ‘কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো/কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো’; ‘এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়’; ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’; ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি’ এসব গানের মাধ্যমে তিনি প্রেম ও কোমল ও দুঃখ ছড়িয়ে দিয়েছেন শ্রোতাদের মাঝে।

পৃথিবীতে যা কিছু রচনা করা হয়েছে তার একটা ভিত থাকে। কিছু মৌলিক উপাদান থাকে। যেমন একটি ভবনের মৌলিক উপাদন হলো ইট। তেমনি গানেরও একটা ভিত আছে। সেটি হলো গানের কথা বা লিরিক্স। সে হিসেবে গীতিকার হলেন গানের অন্যতম মূল কারিগর। যদিও একটি গান জনপ্রিয় হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দর্শকের মনে থাকে কেবল গানের কথায় ঠোঁট মেলানো (লিপসিঙ্ক) নায়ক/নায়িকা এবং গায়ক/গায়িকার নাম। গীতিকারের নাম ও তাদের ঘিরে বিশেষ কোনো আলাপ হয় না। অথচ তারাই দাঁড়িয়ে আছেন ‘গানের ওপারে’। তাদেরই একজন হলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার গান এসে পৌঁছেছে। কিন্তু হয়ত আজও গানপ্রেমীদের অনেকে জানেন না কোন গানগুলো গৌরীপ্রসন্নের লেখা।

১৯৮৩ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটি। ২০০৪ সালে বিবিসির জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় ছিল এ গান। তারচেয়েও উল্লেখযোগ্য হলো, বন্ধুদের হারানো আড্ডা, কতশত পুরনো বিকেল মনে করে কিংবা নতুন কোনো বিকেল উদযাপনের আসরে আজও বেজে ওঠে এ গান। এ গানের কথাও এসেছে গৌরীপ্রসন্নের হাত ধরে।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এমন অসংখ্য আধুনিক গান উপহার দিয়েছেন কালজয়ী এ গীতিকার। যেসব গানে সুর ও কন্ঠ দিয়েছেন মান্না দেসহ ভূপেন হাজারিকা, এস ডি বর্মন, আর ডি বর্মন, আরতি মুখার্জি, আশা ভোঁসলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, লতা মাঙ্কেশকর, গীতা দত্তের মতো জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালকরা।

তিনি লিখেছেন দেশাত্মবোধক গানও, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি হলো ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে/ লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি/ আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি/ বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’। অন্যটি ‘মা গো ভাবনা কেন/ আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে/ তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি/তোমার ভয় নেই মা আমরা/প্রতিবাদ করতে জানি’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত এই দুই গান সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে গীতিকার বলেছিলেন, ‘আমার বাড়ি ছিল পাবনায়। ১৯৪৭ সালে ভারতে চলে আসি। কিন্তু আমার মন পড়ে ছিল বাংলাদেশে। তাই গান দুটি লিখে সেই জন্মস্থানের ঋণ কিছুটা হলেও আমি শোধ করেছি।’ উল্লেখ্য, সেসময় মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণায় জুগিয়েছিল এ দুই গান।

দুই কিংবদন্তি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও মান্না দে

১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে জন্ম গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের। ডাক নাম ছিল বাচ্চু। বাবা ছিলেন উদ্ভিদবিদ গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ও গৃহিণী মা সুধা মজুমদার। ছোট থেকেই গানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। বড় বড় শিল্পীদের গান শুনতেন। গান লেখায়ও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। খ্যাতির শিখরে পৌঁছাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল শচীন দেববর্মন (এস ডি বর্মন)। এ জুটির মাধ্যমে আমরা পেয়েছি বহু কালজয়ী গান- ‘মালাখানি ছিল হাতে ঝরে তবু ঝরে নাই’; ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই/সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ ইত্যাদি। কেবল এস ডি বর্মনের সঙ্গে নয়, তার ছেলে রাহুল দেববর্মন (আর ডি বর্মন) ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমজাদের যুগলবন্দী থেকেও এমন গানের সৃষ্টি হয়েছে যা আজও তুমুল জনপ্রিয়। যেমন ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’; যেতে যেতে পথে হলো দেরি/ তাই তো পারিনি, যেতে পারিনি।

তার লেখা গানগুলোর বড় অংশে ছিল প্রেমের হাতছানি। ছিল নিভুনিভু মোমবাতির মতো প্রেমের বেদনাও। ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’; ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন’; ‘কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো/কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো’; ‘এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়’; ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’; ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি’ এসব গানের মাধ্যমে তিনি প্রেম ও কোমল ও দুঃখ ছড়িয়ে দিয়েছেন শ্রোতাদের মাঝে।

বাংলা গান, সিনেমার জগতে তার অবদান আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে যেখানে তার শৈশব কেটেছে, যেখানে তিনি বেড়ে ওঠেন সেখানে কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশে এসে শেষবারের মতো গোপালনগরের পৈতৃক ভিটায় গিয়েছিলেন। মজুমদার এস্টেটের জমির বড় অংশজুড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ঠিক যেভাবে গীতিকারের নাম জানার, তাদেরকে সামনের সারিতে নিয়ে আসার চর্চা তুলনামূলক কম হয়, ঠিক তেমনিভাবে যেন তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের চেষ্টাতেও কমতি রয়ে গেছে। ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট চিরবিদায় নেন গানের ওপারে থাকা এই কিংবদন্তী-গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।

আরও