ভাসমান স্টিমার যাত্রায় দেশ ও মানুষের প্রতিচ্ছবি

প্রচণ্ড শব্দ আর মানুষের কোলাহলের মাঝে পুরান ঢাকার সদরঘাট ছেড়ে যায় বহু বছরের পুরনো স্টিমার ‘রকেট’। গন্তব্য খুলনা।

প্রচণ্ড শব্দ আর মানুষের কোলাহলের মাঝে পুরান ঢাকার সদরঘাট ছেড়ে যায় বহু বছরের পুরনো স্টিমার ‘রকেট’। গন্তব্য খুলনা। ভাসমান এ নদীযানে ওঠে উচ্চবিত্তের গৃহিণী ও সন্তান, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা, ভ্লগার, গায়ক, ভিক্ষুক, বিদেশী নাগরিক, শ্রমিকসহ ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। সমাজের শ্রেণীবৈষম্যের প্রকট প্রকাশ ঘটে স্টিমারেও। আলাদা দামের টিকিটে পরিচয় ঘটে ভিআইপি কেবিন, ফার্স্ট ক্লাস বা তারও নিচুস্তরে অবস্থানের জায়গা, যেখানে একসঙ্গে শুয়েবসে সময় পার করতে পারে যাত্রীরা। স্টিমারের সারেং পত্রিকায় ‘পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসে সয়লাব দেশ’ শিরোনাম পড়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ চিত্র মনে করে হাসে।

আরেকটি নির্বাচন সামনে, সেটা সুষ্ঠু ও অবাধ হবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা রাজনৈতিক দলগুলোর, এমনই খবর শোনা যায় রেডিওতে। যাত্রীদের মধ্যে ট্রাভেল ভ্লগার এক কিশোর লাইভ ভিডিওতে তার এ স্টিমারযাত্রার প্রতি মুহূর্তের অনুভূতি ভাগ করে নিচ্ছে দর্শকের সঙ্গে। স্টিমারের কর্মচারী মজার ছলে সিনেমার সংজ্ঞায়ন করছে এক কিশোরীর সঙ্গে, যে কখনো ভাবতেই পারে না যে নায়ক-নায়িকা ছাড়াও কোনো সিনেমা হতে পারে। এমনই নানা মতের নানা মানুষকে বয়ে নিয়ে চলে রকেট, পথে কুয়াশা আর রাতের আঁধারে দিকভ্রান্ত হয় আবার। সে ভ্রান্তি কাটে অপেক্ষার পর। ভিন্ন ভিন্ন ঘাটে ওঠানামা করে যাত্রীরা। নিজেদের মধ্যে সমাজ, সংসার, রাজনীতি আর পরিবারের একান্ত আলাপও সারে তারা।

নির্মাতা কামার আহমেদ সাইমনের ওয়াটার ট্রিলজি বা জলত্রয়ীর দ্বিতীয় ছবি ‘অন্যদিন...’। এটি ডকু-ফিকশন হাইব্রিড ফর্মে তৈরি, যেখানে বাস্তবতা নির্ভুলভাবে ফুটে ওঠে আর নির্মাণশৈলী নির্ভর করে সিনেমার নিজস্ব সংগৃহীত সময়ের ওপর। আগে বিশদ প্রস্তুতি সেরে যেমন কিছু শিল্পী অভিনয় করেছেন, তেমনি এখানে আছে একেবারে নতুন ও প্রাকৃতিকভাবে সংলাপ বলা শিল্পীরাও। দীর্ঘ সময় শুটিংয়ের এ অভিজ্ঞতার পরও সম্পাদনার টেবিল থেকে পাওয়া ২ ঘণ্টার সিনেমাটি দেখলে একটা গাঁথা মালার মতোই লাগে। ছবিটিতে নায়ক-নায়িকা নেই। বরং স্টিমার ও তার যাত্রীদের মাধ্যমে দেশ ও সমাজের এক ভিন্ন চিত্রায়ণ উঠে এসেছে।

নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন একটি ফ্লাইটে কোথাও যাচ্ছিলেন। সেখানে কিছু মানুষ ‘সেকেন্ড-ক্লাস’ বাথরুম ব্যবহার করার জন্য লাইনে অপেক্ষা করছিল, যদিও অন্য বাথরুমটি ছিল ফাঁকা। ক্রু তাদের সেটি ব্যবহার করতে দেয়নি, যেহেতু সিটের ক্লাস অনুযায়ী তারা ফার্স্ট ক্লাস নয়। ব্যাপারটা নির্মাতাকে অবাক করেছিল। সাইমন নিজেকে সবসময় শ্রেণী ব্যবস্থার সমালোচক হিসেবেই দাবি করেন। তার সে দাবি জোরালোভাবে এল অন্যদিন... সিনেমায়, যেখানে স্টিমারে টয়লেট ব্যবহার করতে গেলে নিচের ক্লাসের এক যাত্রীকে বাধার মুখে পড়তে হয়। এমনও অসংখ্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সামাজিক মেটাফোর আর বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে নির্মিত হয়েছে অন্যদিন...।

স্বাধীনতা ও একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশ বারবার দিশা হারিয়েছে, বারবার নিষ্পেষিত হয়েছে দারিদ্র্য আর অপশাসনের কশাঘাতে। সিনেমাটিতে সেসব উঠে এসেছে স্টিমারের প্রলম্বিত যাত্রায়। অন্ধ গায়ক থেকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মানসিকতা আর ভিআইপি কেবিনের টয়লেট ব্যবহার করতে না পারা এক মধ্যবিত্তের ক্ষোভে উঠে এসেছে আপামর জনতার বক্তব্য। দিশা হারিয়ে দেশ যেমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়, তেমনি রকেটও এগিয়ে যায় নতুন ভোরের আশায়।

অন্যদিন... বাংলাদেশী দর্শকের জন্য একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে পুরো সিনেমাটির ঘোরের মতো আটকে রাখার ক্ষমতা আছে। তাই সিনেমা শেষে মনে হতেই পারে, সংকটে থাকা সারা বিশ্বের নাগরিকদের মতো স্টিমারের যাত্রীরা আসলে আমরাই, নিজেদের প্রতিচ্ছবিই যেন ভিন্নভাবে দেখায় এটি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের দর্শকের জন্য সিনেমা হিসেবে অন্যদিন... একেবারেই নতুন এক অভিজ্ঞতা হয়ে রইল। সিনেমার ভাষা সব দর্শকের ভালো লাগবে না, ২ ঘণ্টা সময়ও অনেকের দীর্ঘ লাগতে পারে, এর প্রাকৃতিক শব্দগ্রহণ অনেকের কাছে সেকেলে লাগতে পারে। তবে সিনেমা শেষে অনেকের ভালো লাগার প্রকাশও ঘটতে পারে একেবারে ভাসমান স্টিমারের সঙ্গে ভেসে চলা দেশের মিল খুঁজে নিয়ে। জলত্রয়ীর তৃতীয় ছবি ‘আরও কিছু জীবন’-এর কাজ হয়তো আগামী বছর শুরু হবে। তবে আশা করা যায়, পরিবর্তনের বাংলাদেশে সে সিনেমা আর গুমঘরে আটকে থাকবে না।

আরও