৬২ বছরে পা দিলেন

মালেনা থেকে মনিকা বেলুচি— সুন্দরী হওয়ার অভিশাপ

সুন্দরী হওয়া কি অভিশাপ? এই প্রশ্ন যেন তার জীবনকে ব্যাখ্যা করে। প্রথম বিয়ে, ভিনসেন্ট ক্যাসেলের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ, দুই কন্যা এবং পরে পরিচালক টিম বার্টনের সঙ্গে সম্পর্ক। ২০২৫ সালে বেলুচি ও বার্টন যৌথ বিবৃতিতে বিচ্ছেদের কথা জানান। বিচ্ছেদের কারণ তারা প্রকাশ্যে জানাননি, বেলুচি পরে শুধু বলেছেন, তাদের পথ একসময় মিলেছিল, পরে আবার আলাদা হয়েছে

পুরুষরা তাকে পাগলের মত চেয়েছে, নারীরা তাকে হিংসা করেছে, করেছে কটাক্ষ। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন সৌন্দর্যের বাইরে গিয়েও মানুষ হিসেবে তাকে দেখুক কেউ। একটি প্রশ্ন আমাদের কাছে রেখেছেন— একজন সুন্দরী নারী কি শুধু ‘সুন্দরী’ হয়েই থাকতে হবে?

১৯৬৪ সালে ইতালির ছোট শহর চিত্তা দি কাস্তেল্লোতে জন্ম মনিকার। স্বপ্ন ছিল আইনজীবী হওয়ার। পেরুজিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময় পড়াশোনার খরচ চালাতে মডেলিং শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই সাময়িক কাজই ধীরে ধীরে বদলে দিল তার জীবন। মিলান, তারপর প্যারিস; ক্যাটওয়াক, বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন-একসময় তার মুখ নিজেই হয়ে উঠল একটি পরিচয়। সিনেমায় পা রাখার আগেই তিনি ছিলেন একটি ইমেজ। আর সেই ‘ইমেজ’-এর সবচেয়ে বড় শক্তিই পরে হয়ে উঠল তার সবচেয়ে বড় বাধা।

বেলুচি পরে বলেছিলেন, ইতালিতে অভিনেত্রীদের কাছ থেকেই তাকে ‘স্টুপিড মডেল’-এর তকমা শুনতে হয়েছে। সুন্দরী হওয়ার কারণে তাকে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও অভিনয়ক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়েছে। অভিনেত্রীর ভাষায়, সৌন্দর্য ঈর্ষা তৈরি করতে পারে, আর যদি কাজটা শুধু সৌন্দর্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা পাঁচ মিনিটের বেশি টেকে না। তারপর এল ‘মালেনা’।

২০০০ সালের সেই ছবিতে জিউসেপ্পে তর্নাতোরে তাকে এমন এক নারীর চরিত্রে দাঁড় করালেন, যার দিকে সবাই তাকায়, কিন্তু কেউ সত্যিকার অর্থে দেখে না। মালেনা কথা বলে খুব কম, তার হয়ে কথা বলে চোখ, হাঁটা ও শরীর। পুরুষরা তাকে কামনা করে, নারীরা তাকে হিংসা করে, আর একটি ছোট শহর তাকে ঘিরে নিজের মতো করে গল্প বানিয়ে নেয়। বেলুচি নিজেই বলেছিলেন, চরিত্রটির এত কম সংলাপ দেখে প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি কীভাবে অভিনয় করবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি শিখেছিলেন—শরীরও কথা বলতে পারে। অদ্ভুতভাবে, মালেনাকে বুঝতে তার নিজের জীবনই কিছুটা সাহায্য করেছিল। তিনিও ছোট শহরে বড় হয়েছেন। জানতেন, এমন জায়গায় যেখানে সবাই সবাইকে চেনে, সেখানে একজন নারীকে নিয়ে সত্যের চেয়ে গল্প দ্রুত ছড়ায়। তবে পার্থক্য ছিল এক জায়গায়— মালেনা নিজের সময়ের ভেতরে বন্দি, বেলুচি সারাজীবন সেই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন।

তার ব্যক্তিগত জীবনেও বিতর্কের শেষ ছিল না। ২০০৪ সালে প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ইতালীয় ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-এর প্রচ্ছদে নগ্ন হয়ে ছবি তোলেন বেলুচি। এটি নিছক ‘প্রভোকেটিভ ফটোশ্যুট’ ছিল না। তৎকালীন ইতালীয় ‘ফার্টিলিটি’ আইন— যার অধীনে আইভিএফ ও ‘ডোনার স্পার্ম’ ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল; তারই প্রতিবাদে তিনি এই ফটোশ্যুট করেছিলেন। ভ্যাটিকানও প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেছিল। এখানে নিজের শরীরকে তিনি প্রথমবারের মতো শুধু সৌন্দর্যকে অবজেক্ট হিসেবে নয়, একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন। এই জায়গাটিই মনিকা বেলুচির গল্পকে সাধারণ ‘সুন্দরী অভিনেত্রীর জীবন’ থেকে আলাদা করে।

সুন্দরী হওয়া কি অভিশাপ? এই প্রশ্ন যেন তার জীবনকে ব্যাখ্যা করে। প্রথম বিয়ে, ভিনসেন্ট ক্যাসেলের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ, দুই কন্যা এবং পরে পরিচালক টিম বার্টনের সঙ্গে সম্পর্ক। ২০২৫ সালে বেলুচি ও বার্টন যৌথ বিবৃতিতে বিচ্ছেদের কথা জানান। বিচ্ছেদের কারণ তারা প্রকাশ্যে জানাননি, বেলুচি পরে শুধু বলেছেন, তাদের পথ একসময় মিলেছিল, পরে আবার আলাদা হয়েছে।

মালেনার নারীটি ছিল অন্যের কল্পনায় তৈরি একটি ছবি। মনিকা বেলুচিও একসময় তেমনই একটি ছবিতে পরিণত হয়েছিলেন— ইতালীয় সৌন্দর্যের, যৌনতার, পরিণত নারীত্বের ও পুরুষের কল্পনার। পার্থক্য হলো, সিনেমায় মালেনা নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায়নি। বেলুচি পেয়েছিলেন। তাই আজ তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো ‘বিশ্বের অন্যতম সুন্দরী নারী’ নয়। বরং একজন অভিনেত্রী, যিনি সারাজীবন প্রচলিত সুন্দরী হওয়ার বাইরেও একটা পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছেন। এই পৃথিবী মনিকা বেলুচিকে বহুবার বহুভাবে দেখেছে। কিন্তু তাকে দেখা আর তাকে চেনা-দুটো কখনোই এক ছিল না।

আরও