নানা ভাষা ও নানা ফর্মে অভিযোজিত হয়েছে মেরি শেলির ক্ল্যাসিক উপন্যাস ফ্র্যাংকেনস্টাইন। চলচ্চিত্র, নাটক, সিরিজ বা কমিকে রূপান্তর ঘটতে ঘটতে ফ্র্যাংকেনস্টাইন সম্ভবত এখন বিশ্ব সাহিত্য ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি অভিযোজিত উপন্যাসগুলোরও একটি। কিন্তু যতবারই নতুন সংস্করণ আসে, মনে হয়—সেই ক্ল্যাসিকের হৃদয়টাকে ঠিকভাবে কি ধরা গেল? দানবকে সবুজ রঙ, চ্যাপ্টা মাথা বা বোল্ট লাগানো ঘাড়ে আটকে দেয়া আগের অনেক সিনেমা যেখানে গল্পটিকে কেবল ভৌতিক রূপেই দেখিয়েছে, সেখানে গিয়েরমো দেল তোরোর মুভি ফ্র্যাংকেনস্টাইন যেন অনেকটাই ভেঙে দিল সেই পরিচিত কাঠামো। বললো এক নিঃশব্দ, মানবিক হৃদয়ের গল্প। দেল তোরো যেন চেষ্টা করেছেন শেলির উপন্যাসের আত্মাটাকেই পর্দায় তুলে আনতে।
দেল তোরো বহুবার বলেছেন, শেলির ১৮১৮ সালের উপন্যাসটা তার কাছে ধর্মগ্রন্থের মতো, আর এই মুভিতে সেই ভালবাসার ছাপ পড়েছে। অনেক পরিবর্তন আছে—এলিজাবেথের চরিত্র এসেছে নতুনভাবে, ভিক্টরের পারিবারিক অতীত, আবার হেনরি ক্লার্ভাল বা জাস্টিনের মতো চরিত্র বাদ পড়েছে। তবু গল্পের মানবিক হৃদয় মুভিতে অক্ষত ছিল। দেল তোরো পরিষ্কারই বলেছেন, তার ফ্র্যাংকেনস্টাইন বিজ্ঞানের বিপর্যয়ের গল্প নয়; বরং ক্ষমা, বোঝাপড়া আর একে অপরকে সত্যিকারভাবে শোনার গল্প। আর ছবিটিও সেই বোধের অনুরণন।
ফ্র্যাংকেনস্টাইন এর একটি দৃশ্য। ছবি- আইএমডিবি
ছবিতে ভিক্টরের বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। ভিক্টর ও তার মার সঙ্গে ভিক্টরের বাবার এক ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক এসেছে নতুনভাবে। এ পরিবর্তনের ফলে গল্পের থিমও কিছুটা পাল্টে যায়। উপন্যাসের জ্ঞান ও ক্ষমতার অহংকার থেকে সরে এসে 'লজ্জা ও পিতার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা'-এর দিকেও ঝুঁকেছে দেল তোরোর ফ্র্যাংকেনস্টাইন। ভিক্টরের বাবা যেমন তাকে পড়া শিখতে না পারার জন্য চড় মারতেন, ঠিক তেমনি ভিক্টরও ক্রিচারকে আঘাত করে যখন সে দ্রুত শিখতে পারে না। মায়ের মৃত্যুতে বাবার ব্যর্থতাকে ছাপিয়ে যেতে পেরেছিলেন ভিক্টর। কিন্তু বাবার নিষ্ঠুরতা তাকে ছেড়ে যায়নি।
ক্রিচারের মানবিক দিক এ ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি। বইয়ের মতো নির্মম ‘দানব’ নয়—এখানে সে যেন আমাদেরই মতো ক্ষত-বিক্ষত এক সত্তা। দেল তোরো দানবকে দানব হিসেবে দেখাতে চাননি; বরং মুখোমুখি সংলাপের মাধ্যমে দেখান—মানুষকে বোঝা যায় তার ক্ষত আর অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষার ভেতর দিয়ে। ভিক্টরকে ডেকে যায় ক্রিচার এক শিশুর অসহায়তায়। উপন্যাসের মতো হত্যার তাণ্ডব করতেও দেখা যায় না ক্রিচারকে। তবে এই মানবিক রূপ মাঝে মাঝে উপন্যাসের ভয় ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নগুলোকে আড়াল করে ফেলে। তবে উপন্যাসের মূল ভাবনার এ বিচ্যুতিকে চলচ্চিত্রটির অখণ্ডতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়নি।
এলিজাবেথ–ক্রিয়েচার সম্পর্কটিও সংযত, মানবিক। বইয়ের মতো দূরত্ব নেই। এখানে বরং তারা পরস্পরের প্রতি একধরনের ‘যৌথতা’ অনুভব করে। প্রচলিত কানুনের সাপেক্ষে দুই সত্তার অপরিপক্বতা মিলে তৈরি করে এক অভিন্ন সুর। আর এলিজাবেথকে এখানে দেল তোরো অনেক শক্তিশালী করে তুলেছেন। নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি গল্পকেও দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
পরিচালক গিয়েরমো দেল তোরো। ছবি- ভ্যানিটি
উপন্যাসে নারী নির্যাতন এবং নিপীড়িত মানুষের প্রতি অবিচারের যে শক্তিশালী সামাজিক সমালোচনা ছিল, ছবিতে তা কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছে। তাছাড়া, ছবিতে ক্রিচারকে দেখে দর্শকদের মধ্যে ভয় জাগে না। কিন্তু শেলির মতে, 'যদি আপনি কিছুকে পৃথিবীতে উন্মোচন করেন, তবে তা অবশ্যই ভীতিকর হতে পারে।'
কেন ভীতিকর করেননি— এ জায়গায়ই হয়তো উন্মোচিত দেল তোরোর ‘থ্রি আমিগোস’ সত্তা। দেল তোরো, আলফনসো কুয়ারন ও আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু— মেক্সিকান এই তিন বিশ্বখ্যাত পরিচালককে একত্রে ডাকা হয় ‘থ্রি আমিগোস’ নামে। সেই থ্রি আমিগোস-এর সিগনেচার মূলত মানবিকতা, দুঃখের নান্দনিকতা আর গভীর দার্শনিক ছোঁয়া। আর সেটাই উপস্থিত ফ্র্যাংকেনস্টাইনে।
গিয়েরমো দেল তোরোর ফ্র্যাংকেনস্টাইনে অস্কার আইজ্যাক ও জ্যাকব এলর্দি যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ—একজন স্রষ্টা, অন্যজন সৃষ্টি; অথচ দু’জনের মাঝেই শূন্যতা, অস্থিরতা আর স্বীকৃতির আকুলতা। ভিক্টর ফ্র্যাংকেনস্টাইন রূপে অস্কার আইজ্যাক দেখিয়েছেন বহুমাত্রিকতা। ভিক্টরের অহংকার, তার শৈশবের ক্ষত, তার জেদ—সব মিলিয়ে তিনি চরিত্রটিকে শুধু পাগল বিজ্ঞানীর স্টেরিওটাইপে রাখেননি। বরং দেখিয়েছেন, মানুষ কেমন করে নিজের ভাঙা পরিচয়ের ভেতর থেকে ঈশ্বর সাজার চেষ্টা করে।
ছবি- আইএমডিবি
আর জ্যাকব এলর্দি যেন ক্রিচার ভূমিকায় চমকে দেয়ার মতো পরিপক্ব। তার দেহযন্ত্রণা, কণ্ঠের কাঁপুনিতে লুকানো শোক, তার শিখতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছে—সব মিলিয়ে ক্রিচারকে তিনি ভয়ের প্রতীক না বানিয়ে সহানুভূতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন। এলর্দির চাহনির সরলতা ও বেদনা—এটাই সিনেমাটিকে মানবিকতার দিকে টেনে আনে। দু’জনের রসায়নেও স্পষ্ট— নিয়তির নিগড়ে তারা অভিন্ন। একজন তার স্রষ্টা হতে চেয়েছে, আরেকজন তার মানবিকতায় আশ্রয় খুঁজছে।
অন্যান্য মুভি অ্যাডাপটেশনের তুলনায়, দেল তোরোর 'ফ্র্যাংকেনস্টাইন' শেলির টেক্সটের বহুস্তরীয় প্রকৃতির বেশ কাছাকাছি পৌঁছেছে। এটি তাই নিছক হরর ফিল্ম নয়, বলা যেতে পারে একটি গথিক সাই-ফাই। ছবিটি শুধু উপন্যাসকেই নয়, বরং মেরি শেলি এবং তার সমসাময়িক পার্সি শেলি, লর্ড বায়রনদেরও সম্মান জানানোর চেষ্টা করেছে। খুব সম্ভবত, সেই প্রচেষ্টাও সফল।