রঙ, পুতুল আর কল্পনার জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ার

মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড় অবদান পাপেট বা পুতুলনাট্য আন্দোলনে। বাংলাদেশের পুতুলনাট্যকে আধুনিক শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। পুতুলকে কেবল বিনোদনের উপকরণ হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন

শিল্প-সংস্কৃতিকে ভিন্ন মাত্রা দান করে কিছু মানুষ। বাংলাদেশের শিল্পের ইতিহাসেও এমন মানুষ আছে যাদের নির্দিষ্ট ফ্রেমে সীমাবদ্ধ করা যায় না। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, পাপেট শিল্পী, শিক্ষক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। শিশুদের জন্য তিনি ছিলেন এক স্বপ্ন নির্মাতা, যেন হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার হাত ধরেই দেশের অসংখ্য শিশু প্রথম শিল্প, রঙ, কল্পনা আর সৃজনশীলতার জগতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।

মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম যশোরে, ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টম্বর। তিনি কবি গোলাম মোস্তফার পুত্র। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন মুস্তাফা মনোয়ার। ছোটবেলা থেকেই শিল্পকলার প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তী সময়ে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে অধ্যয়ন করেন। শিল্পশিক্ষার ভিত্তি সেখানেই নির্মিত হয়। পরে নিজস্ব শিল্পদর্শন ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

দেশে ফিরে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পচর্চা কখনো কেবল ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে নতুন নতুন মাধ্যমের সন্ধান করতে হবে। এ বিশ্বাস থেকেই তিনি যুক্ত হন টেলিভিশন, পুতুলনাট্য ও গণমাধ্যমের সঙ্গে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মুস্তাফা মনোয়ার। ছবি: মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ফেসবুক

মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড় অবদান পাপেট বা পুতুলনাট্য আন্দোলনে। বাংলাদেশের পুতুলনাট্যকে আধুনিক শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। পুতুলকে কেবল বিনোদনের উপকরণ হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার নিরলস প্রচেষ্টায় পুতুলনাট্য গ্রামীণ লোকজ বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক মঞ্চ ও টেলিভিশনের পরিসরে প্রবেশ করে। এ কারণেই তাকে অনেকেই ‘বাংলাদেশের পাপেট ম্যান’ হিসেবে অভিহিত করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও থেমে থাকেনি তার শিল্পচর্চা। ১৯৭১ সালে শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত শিশুদের জন্য তিনি পুতুলনাট্য পরিবেশন করেন। যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেও শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের মানসিক শক্তি জোগাতে শিল্পকে ব্যবহার করেছিলেন তিনি।

শিশুদের প্রিয় মানুষ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার নির্মিত শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’। বাংলাদেশ টেলিভিশনে শুক্রবার প্রচার হতো অনুষ্ঠানটি। একসময় দেশের শিশুদের অন্যতম প্রিয় অনুষ্ঠান ছিল এটি। পুতুলের মাধ্যমে গল্প বলা, আনন্দ দেয়া এবং একই সঙ্গে শিক্ষামূলক বার্তা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে এ অনুষ্ঠান নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। এছাড়া শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র অন্যতম রূপকার হিসেবেও তার অবদান স্মরণীয়। দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এ মঞ্চে।

১৯৬০ সালে পিটিভির ঢাকা স্টুডিওতে ‘ছোটদের আসর’ অনুষ্ঠানের শুটিংয়ে। ছবি: মুস্তাফা মনোয়ার (ফেসবুক)

মুস্তাফা মনোয়ারের আরেকটি পরিচয়, তিনি চিত্রশিল্পী। সেখানেও তিনি স্বতন্ত্র। তার শিল্পকর্মে যেমন লোকজ ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে আধুনিক শিল্পভাবনার সংমিশ্রণ। রঙ, রেখা ও আঙ্গিকের সৃজনশীল ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি নিজস্ব এক শিল্পভাষা নির্মাণ করেছিলেন। একই সঙ্গে নাট্যনির্মাণ ও টেলিভিশন প্রযোজনার ক্ষেত্রেও তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন।

বিটিভির ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানে মুস্তাফা মনোয়ার

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদকসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত মানুষের ভালোবাসা। কয়েক প্রজন্মের বাংলাদেশীর শৈশব, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও শিল্পবোধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তার নাম।

মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিল্প কেবল গ্যালারির দেয়ালে বন্দি কোনো বিষয় নয়; শিল্প মানুষের জন্য, বিশেষত শিশুদের জন্য আনন্দ, স্বপ্ন ও মানবিক বিকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম। সে বিশ্বাস নিয়েই তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন।

আরও