চলছে ভালোবাসার মাস। বাস্তব জীবনে যুগে যুগে যেমন ভালোবাসার ভাষা, ভাব-ভঙ্গি বদলেছে, পর্দায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সিনেমা প্রেমকে আবিষ্কার করেনি, কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের জীবনে প্রেমকে প্রভাবিত করেছে বটে। নির্বাক যুগের প্রেমিক–প্রেমিকার কাঁপতে থাকা হাত থেকে শুরু করে আজকের সংযত আবেগে মোড়া, সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর প্রেম, পর্দায় ভালোবাসার ভাষা কখনোই স্থির ছিল না। সমাজ, নৈতিকতা, প্রযুক্তি ও ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই ভাষা বদলেছে।
নির্বাক যুগ ও সিনেমাটিক রোম্যান্সের জন্ম
সিনেমার একেবারে প্রারম্ভিক পর্বে প্রেমের কোনো ভাষা ছিল না, ছিল না শব্দ, ছিল না সংলাপ। শুরুর নির্বাক চলচ্চিত্রগুলো পুরোপুরি নির্ভর করত অঙ্গভঙ্গি, দূরত্ব, দৃষ্টির আদান–প্রদান এবং প্রতীকী গতিবিধির ওপর। সেখানে প্রেম সরাসরি প্রকাশ পেত না, প্রকাশ পেত ইঙ্গিতে। নায়িকার দৃষ্টি যদি একটু বেশি সময় থেমে থাকত, একটি হাত যদি অন্য একটি হাত ছুঁয়ে আবার সরে যেত, সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোই তখন ছিল প্রেমের অভিব্যক্তি।
‘দ্য কিস (১৮৯৬)’-এর মতো চলচ্চিত্র ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য দেখিয়ে দর্শকদের বিস্মিত ও আলোড়িত করেছিল। হলিউডে প্রেমকে তখন উপস্থাপন করা হতো আদর্শিক, নিয়তিনির্ধারিত, প্রায় পৌরাণিক এক অভিজ্ঞতা হিসেবে। প্রমথেস বড়ুয়া নির্মিত ভারতীয় সিনেমা ‘দেবদাস (১৯৩৫)’-এর মতো চলচ্চিত্র, প্রেমকে তুলে ধরেছিল অনিবার্যভাবে বিপর্যস্ত এক অনুভূতি হিসেবে, যা সামাজিক স্তরবিন্যাস ও নৈতিক সংযমের বেড়াজালে আবদ্ধ। বাংলা সিনেমায় পি. সি. বড়ুয়ার ‘দেবদাস’ রূপান্তর এবং সাহিত্যনির্ভর প্রাথমিক চলচ্চিত্রগুলোতে প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আকুলতা, আত্মত্যাগ এবং আবেগঘন যন্ত্রণা।
রোম্যান্সের স্বর্ণযুগ
চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে সিনেমা শব্দ পেল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে প্রেম পেল নৈতিক কাঠামো। হলিউডের স্বর্ণযুগে প্রেম মানে ছিল সংযম, দায়িত্ব আর ত্যাগ। ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা (১৯৪২)’ দেখিয়ে দিল, সব প্রেম পূর্ণতা পায় না, কিন্তু সব প্রেমই মহৎ হতে পারে। ভালোবাসা এখানে ব্যক্তিগত সুখের চেয়েও হয়ে উঠল নৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ।
কাছাকাছি সময়েই বলিউডে ‘মুঘল-ই-আজম (১৯৬০)’-এর মতো চলচ্চিত্রে প্রেম রাজনীতি, ক্ষমতা ও পারিবারিক কর্তব্যের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বাংলা সিনেমায় ‘সপ্তপদী (১৯৬১)’ দেখায় ধর্ম ও সমাজের সীমারেখায় আটকে থাকা এক গভীর প্রেম, যেখানে আবেগ আছে, কিন্তু স্বাধীনতা নেই। এই যুগের সিনেমায় দেখানো হত, প্রেম যত কঠিন, তার মূল্য ততই বেশি।
বিদ্রোহী প্রেম- (ষাট–সত্তরের দশক)
ষাট ও সত্তরের দশকে সমাজ বদলাতে শুরু করে, প্রেমও আর অনুগত থাকে না। সিনেমা প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, বিয়ে কি অপরিহার্য? সমাজের নিয়ম কি প্রেমের চেয়ে বড়? হলিউডের ‘দ্য গ্র্যাজুয়েট (১৯৬৭)’ প্রেমকে দেখাল বিভ্রান্তির ভেতর দিয়ে। ‘লাভ স্টোরি (১৯৭০)’ বলল, প্রেম মানেই সুখ নয়, কখনো কখনো গভীর ক্ষতও। বলিউডে ‘ববি (১৯৭৩)’ শ্রেণিবৈষম্যে আঘাত হানে। বাংলা সিনেমায় ‘মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)’ দেখায়, কীভাবে অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতা প্রেমকে গ্রাস করে। এখানে প্রেম আর পবিত্র স্বপ্ন নয়, প্রেম হয়ে ওঠে সংগ্রাম।
বন্ধুত্ব, হাস্যরস ও দৈনন্দিন অনুভব (আশি–নব্বই দশক)
আশি ও নব্বইয়ের দশকে সিনেমা প্রেমকে গাম্ভীর্য থেকে বের করে আনে। হলিউডের ‘হোয়েন হ্যারি মেট স্যালি (১৯৮৯)’ দেখায়, প্রেম বন্ধুত্ব থেকে জন্ম নিতে পারে। হাসি, কথোপকথন আর সময় কাটানো হয়ে ওঠে প্রেমের ভাষা। এই সময়েই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রেমের সংজ্ঞা আমূল বদলায়। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে (১৯৯৫)’ দেখায় প্রেম মানে পরিবারবিরোধিতা নয়, বরং প্রেম ও ঐতিহ্য একসঙ্গে চলতে পারে। বাংলা সিনেমাও ধীরে ধীরে বিষাদ থেকে সরে এসে শহুরে, তরুণ প্রেমের দিকে এগোতে শুরু করে। এই সময়ের সিনেমা বলেছিল, প্রেম মানে সুখের সম্ভাবনা।
ভ্রমণ, সংগীত ও স্বপ্নের প্রেম (নব্বইয়ের শেষভাগ–২০০০-এর শুরু)
বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রেম হয়ে ওঠে ভ্রমণপ্রবণ। ‘নটিং হিল (১৯৯৯)’, ‘প্রিটি উইম্যান (১৯৯০)’-এর মতো চলচ্চিত্রে প্রেম মানে কাকতালীয় সাক্ষাৎ, সংগীত আর রূপকথার আবহ। বলিউডে ‘হাম দিল দে চুকে সনম (১৯৯৯)’, ‘কাল হো না হো (২০০৩)’- এর মতো সিনেমা প্রেমকে আবেগী উদারতায় রূপ দেয়। বাংলা সিনেমাও এই সময় শহর ও সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা ছুঁতে শুরু করে।
প্রেমের নতুন ভাষা (২০০০–২০১০)
এ সময় সিনেমা নিজের তৈরি রূপকথাকেই ভাঙতে শুরু করে। ‘ব্লু ভ্যালেন্টাইন (২০১০)’ দেখায় প্রেম কীভাবে ক্ষয়ে যায়। ‘বিফোর সানরাইজ’ সিরিজ দেখায়, সময় প্রেমকে বদলায়, গভীর করে, কখনো দূরে সরিয়ে দেয়। বলিউডে ‘তামাশা (২০১৫)’ প্রেমের ভেতর ব্যক্তিসত্তার সংকট নিয়ে কথা বলে। সমসাময়িক বাংলা সিনেমা সম্পর্কের নীরবতা, ক্লান্তি ও শহুরে নিঃসঙ্গতাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এখানে সিনেমা স্বীকার করে, শুধু প্রেম যথেষ্ট নয়, বোঝাপড়াও গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের প্রেম: বহুমুখী, সংযত ও আত্মসচেতন
আজকের সিনেমায় প্রেম আর রূপকথার মত নেই। ‘কল মি বাই ইয়োর নেইম (২০১৭)’, ‘পাস্ট লাইভস (২০২৩)’-এর মতো চলচ্চিত্র প্রেমকে স্মৃতি, পরিচয় ও সম্ভাবনার আলোকে দেখে। বলিউড ও বাংলা সিনেমাতেও প্রেম এখন সম্মতি, সমতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। বলিউডে ‘থাপ্পার (২০২০)’ হোক কিংবা ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রাক্তন’ হোক, সব সিমেনাতেই প্রেমের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানসিক স্বাস্থ্য, সম্পর্কে বোঝাপোড়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আজ সিনেমায় প্রেম কেবল আবেগ নয়, প্রেম একটা প্রশ্ন।
সিনেমার প্রেম বদলেছে, নিয়তি থেকে পছন্দে। ত্যাগ থেকে আত্মপরিচয়ে, রূপকথা থেকে বাস্তবতায়। সিনেমা আর আমাদের শেখায় না কীভাবে প্রেমে পড়তে হয়। সিনেমা এখন জিজ্ঞেস করে, আমরা কেন প্রেম করি।