মঞ্চে ‘দ্য পাইড পাইপার অব হ্যামেলিন’

সুখের আসল মাপকাঠি অর্থ নাকি স্বাধীনতা?

মো. আহ্‌নাফ আলম

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ ইংরেজি নাটক ‘দ্য পাইড পাইপার অব হ্যামেলিন’। নাটকের মূল চরিত্র বংশীবাদকের ছুড়ে দেয়া এ প্রশ্নই ছিল পুরো প্রযোজনাটির প্রাণবিন্দু।

‘হ্যামেলিনের সবাই কি ধনী? তোমরা হয়তো অনেক ধনী, কিন্তু তোমরা কি সবাই সত্যিই সুখী?’

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ ইংরেজি নাটক ‘দ্য পাইড পাইপার অব হ্যামেলিন’। নাটকের মূল চরিত্র বংশীবাদকের ছুড়ে দেয়া এ প্রশ্নই ছিল পুরো প্রযোজনাটির প্রাণবিন্দু। উইলিয়াম গ্লেননের নাট্যরূপের নির্দেশনা দিয়েছেন আশীষ খন্দকার। নাটকটি জার্মানির কাল্পনিক ও কালজয়ী পটভূমির সে পরিচিত গল্পটি উঠে এসেছে ঢাকার মঞ্চে এবং তুলে ধরেছে কীভাবে একসময় কালো ইঁদুরের প্রাদুর্ভাব এক ভয়াবহ মহামারীতে রূপ নিয়েছিল।

আমাদের পরিচিত জার্মান লোকগাঁথায় দেখা যায় বংশীবাদক সুরের মায়ায় হ্যামেলিনের শিশুদের নিয়ে যায় এবং তারা আর কখনো ফিরে আসে না। তবে ইংরেজিতে পরিবেশিত নাটকটি কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি, গল্পের দ্বিতীয় ও সুদূরপ্রসারী পর্বটিকে চমৎকার নাট্যভাষায় উন্মোচন করেছে। এখানে শিশুদের এমন এক মুক্ত ও সুন্দর আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তারা পূর্ণ স্বাধীনতা পায়—যেখানে সোনার ঝলকানি বা অর্থসম্পদ আনন্দের মাপকাঠি নয়। এখানকার শিশুরা তাদের হৃদয়ের কথা শোনে এবং কোনো কঠোর নিয়মকানুনের জাঁতাকলে তাদের পিষ্ট হতে হয় না।

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এ নাটক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী। স্থান-কাল-পাত্রভেদে আজ প্রতিটি মানুষ অর্থ ও সম্পদ অর্জনের অন্ধ প্রতিযোগিতায় মত্ত, যা দিয়ে অনেকেই এখন জীবনের সাফল্য ও সুখ পরিমাপ করতে চান। তবে নাটকটি সেই প্রচলিত ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন বার্তার জন্ম দিয়েছে—সম্পদ নয়, বরং ভালোবাসাময় স্বাধীনতাই হলো প্রকৃত সুখের একমাত্র মূলমন্ত্র।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার প্রযোজনায় এবং ‘ফ্রাইডে থিয়েটার স্কুল’-এর ১০-১৮ বছর বয়সী খুদে ও তরুণ শিল্পীদের সংলাপ প্রক্ষেপণ, স্পষ্ট ও নিখুঁত ইংরেজি উচ্চারণ এবং প্রাণবন্ত ভাবভঙ্গি ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। নগরপ্রধান, বংশীবাদক ও নাগরিকদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে তরুণ শিল্পীরা অসাধারণ দক্ষতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে প্রতিটি চরিত্রে মিশে গিয়ে নিখুঁত এক নাট্য-আবহ তৈরি করে।

নাটকের চমৎকার মঞ্চসজ্জা, নিপুণ আলোকের ব্যবহার এবং আবহাওয়া ফুটিয়ে তোলার পেছনের সুর সংযোজন ছিল বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। হ্যামেলিন শহরের বিষাদময় ও রুগ্‌ণ পরিবেশ থেকে শিশুদের মুক্ত পৃথিবীর প্রাণবন্ত রূপান্তরটি মঞ্চের আলোর সূক্ষ্ম বিচ্ছুরণে অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটে ওঠে।

নাটকটির সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় দিক ছিল দেয়া কথা রাখা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব। পুরো নাটকের চরম পরিণতি গড়ে উঠেছে একটি কথা না রাখার খেসারত ও তার কঠিন পরিণতিকে কেন্দ্র করে। হ্যামেলিনের এ কাহিনী কেবল তৎকালীন সমাজকেই ফুটিয়ে তোলে না, বরং তা বর্তমান বিশ্বের যেকোনো সমাজের নৈতিক সংকটের আয়না হিসেবে কাজ করে।

এর আগে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকায় সফলভাবে মঞ্চস্থ হলেও এবার জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চে এ প্রাঞ্জল ইংরেজি নাটকের পরিবেশনা এক নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করল ৩ ও ৪ অক্টোবর। তরুণ প্রজন্মের এ অসাধারণ সাংস্কৃতিক উদ্যোগটি দর্শকের মনে এক গভীর নৈতিক চেতনা জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি ঢাকার নাট্যমঞ্চে এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে থাকবে।

আরও