রিভিউ

দুই প্রজন্মের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব যুদ্ধ

গল্পটা বাবা ও ছেলের, যেমন অনেক না বলা গল্প ঝুলে থাকে আমাদের সিলিংয়ে। একজন পিতাকে তো কত কথাই বলার থাকে পুত্রের।

গল্পটা বাবা ও ছেলের, যেমন অনেক না বলা গল্প ঝুলে থাকে আমাদের সিলিংয়ে। একজন পিতাকে তো কত কথাই বলার থাকে পুত্রের। কখনো জীবনের বাস্তবতা, কখনো অভিমান, কখনোবা আবেগের আতিশয্যে বাবাদের বলা হয় না আমাদের কথা। অথচ রক্তে রক্তে বয়ে যায় বহু স্রোত৷

মনোলগ অর্থাৎ একক অভিব্যক্তি কিংবা স্বগতোক্তি। সহজ বাংলায় বলা যায়, একা একা নিজের সঙ্গে বলা কথা। কিংবা সেখানে অন্য কেউ উপস্থিত থাকলেও বক্তা নিজের জন্যই কথা বলে। উত্তরের আশা থাকে না বা আশা সে করে না। মোটের ওপর কমবেশি আমরা সবাই নিজের সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু নিঃসঙ্গ যুবক ও তার শয্যাশায়ী পিতার এ গল্পে মনোলগ মূলত পুত্রের।

পরিচালক এমিন আফেন্দিয়েভ এ সিনেমায় যুদ্ধের প্রভাবকে একটি ফ্যামিলি ড্রামার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। আজারবাইজানের কারাবাখ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাবা (মাহির দারবিশ) ও ছেলের (এলসান আজগারভ) মধ্যকার জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতির গল্প বলে ‘তানহা ইনসানিয়ান মনোলকু’ (আ লোনলি পারসনস মনোলগ)।

সিনেমার গল্প আবর্তিত হয় মাত্র একদিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গল্পের বাবাটি প্রথম কারাবাখ যুদ্ধফেরত একজন প্রবীণ সৈনিক। যুদ্ধের দরুন বাকশক্তি হারিয়েছেন। যুদ্ধের সময় মাথায় আঘাত এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধবন্দি থাকায় তার স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবশেষে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। আর তার ছেলে এবার যাচ্ছে দ্বিতীয় কারাবাখ যুদ্ধে। বাবা সবসময় চাইত এ ছেলে যেন যুদ্ধে যায়, যেন নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।

যুদ্ধের ট্রমা বাবার ব্যক্তিত্বকে বদলে দিয়। সন্তানের কাছে পিতা পরিণত হয় এক স্বৈরাচারী ও নিষ্ঠুর মানুষে। ছেলের মনোলগে আমরা জানতে পারি, বড় ভাইকে শহরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল বাবা। ভাই এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। মা পুত্রশোকে রোগে ভুগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। সংসারে একমাত্র জীবিত ও সুস্থ প্রাণী সেই, যে পিতার আদেশ মানতে গিয়ে নিজের প্রেমিকাকেও হারায়।

ছবিটিতে সংলাপ নেই বললেই চলে। যেন সংলাপের চেয়ে নীরবতা আর অঙ্গভঙ্গির ভারই এখানে অনেক বেশি। ছেলে যখন তার বাবার প্রাত্যহিক কাজগুলো করে (গোসল করানো, খাওয়ানো বা দাড়ি কামিয়ে দেয়া), তখন ঠিক প্রতিটি কাজের সঙ্গে তাদের অতীতের একটি করে স্মৃতির জড়িয়ে থাকে। টুকরো টুকরো স্মৃতির সংযোগে পুরো পারিবারিক ট্র্যাজেডিটি উন্মোচন হয়। যুদ্ধোত্তর ট্রমা কীভাবে একটি প্রজন্মের পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস করে দেয়, তার যথার্থ উদাহরণ এ চলচ্চিত্র।

ছেলে তার বাবার সেবা করলেও তার মনে জমে আছে একরাশ ঘৃণা ও দীর্ঘশ্বাস। অদ্ভুত এক দৃশ্যের অবতারণা হয় যখন ছেলে বাবাকে জানায়, জীবনের বেশ কয়েকটা ধাপে তার ইচ্ছে করেছে বাবাকে মেরে ফেলতে। তবুও সে অত্যন্ত মমতার সঙ্গে বাবার সেবা চালিয়ে যায়, কারণ বাবা তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পর তার সমস্ত ঘৃণা মুছে গেছে। ছেলে বাবাকে ভালোবেসেছে আরো বহুগুণ।

সিনেমাটি আমাদের বলে আরো এক গল্প বা জানায় দুই প্রজন্মের দর্শন। সিনেমা দেখতে গিয়ে দর্শক বুঝবে বাবা ও ছেলে উভয়ই যুদ্ধের শিকার, আলাদা শুধুই প্রজন্ম। বাবা দেশের জন্য স্বাস্থ্য হারিয়েছে আর ছেলে হারিয়েছে তার স্বাভাবিক জীবন ও মানসিক প্রশান্তি।

চলচ্চিত্রের শেষার্ধে বাবা নিজের মনে সিদ্ধান্ত নেয়, সে আর বেঁচে থাকবে না। খাবার, ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করে দেয় নীরবে। আদতে বাবা ভাবে, ছেলে যুদ্ধের সময় যেন তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পায়। মূলত দেশের জন্য এবং ছেলের জন্য এটা ছিল বাবার দ্বিতীয়বার আত্মত্যাগ।

গল্প যখন ক্ষতবিক্ষত করে, এমিন আফেন্দিয়েভের সিনেমাটোগ্রাফি তখন চোখে শান্তি দেয়। সিনেমার শুটিং হয়েছে প্রত্যন্ত এলাকায়। দীর্ঘ গাছের সারি ও পাহাড় আর তার গাঢ় সবুজ দর্শককে প্রশান্তি দেয়। গাছের সারি, বিস্তৃত মাঠ, শূন্য পাহাড় ও শিয়ালের ডাক মনে করিয়ে দেয় কতটা একা এ পিতা-পুত্র।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে বলতে হয়, মাহির দারবিশ শুধু চোখের চাহনি দিয়ে রাগ, ঘৃণা, ভালোবাসা কিংবা প্রতিবাদ প্রকাশে অনন্য কাজ করেছেন। এলসান আজগারভ তার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বাস্তব জীবনের দোটানা ফুটিয়ে তুলেছেন দুর্দান্তভাবে। সিনেমাটি নন-ভার্বাল কমিউনিকেশনের অসাধারণ উপস্থাপন।

সংলাপহীনতা ও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য যেন বাবা ও ছেলের ধ্রুপদী দ্বন্দ্বকে অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণার রূপে প্রকাশ করল। যদিও বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চলছে তবুও এ পরিবারের ভেতরের লড়াই শেষ হয়নি। কারাবাখ যুদ্ধের ওপর জোর না দিয়ে বরং সর্বজনীন রূপক হিসেবে ইন্টারজেনারেশনাল ট্রমা কীভাবে একটা পরিবারকে নিঃস্ব করে দিল, এ সিনেমায় তার ওপরই ফোকাস করা হয়েছে।

এমিন এমনভাবে এ সিনেমা নির্মাণ করেছেন, যা দর্শককে পিতা-পুত্রের জায়গায় বসিয়ে দেবে। সংবেদনশীল দর্শক নিজেকে যুক্ত করবে পিতা কিংবা পুত্রের সঙ্গে। পাশাপাশি সিনেমাপ্রেমীরা হয়তো পিতা-পুত্রের সম্পর্কের এ সিনেমার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে আসগর ফরহাদির ‘আ সেপারেশন’ (২০১১) কিংবা ফ্লোরিন জেলারের ‘দ্য ফাদার’কে (২০২০)। কিন্তু ‘তানহা ইনসানিয়ান মনোলকু’ বিষয়বস্তুর সাদৃশ্য বাদে স্বতন্ত্র এক সিনেমা। ক্ষেত্র বিশেষে সিনেমাটি দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে যে পিতা কী সিদ্ধান্ত নেবে, পুত্রের সিদ্ধান্তইবা কী হবে।

সিনেমার শেষে পিতা আবারো নিজেকে উৎসর্গ করে। পুত্র নিজ হাতে পিতার সৎকার শেষে তাকে কবরে শুইয়ে তবেই ঘর ছাড়ে। সিনেমার প্রথম দৃশ্যে ছেলেটি ঘরে ফিরছিল আর শেষ দৃশ্যে সেই একই পথে ঘর ছেড়ে যায়। আজারবাইজানের এ সিনেমা দেখে বাঙালি দর্শকের মনের নেপথ্যে বেজে উঠেতই পারে—তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা, তোমায়-আমায় মিলে এমনি বহে ধারা।

আরও