আমরা নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা ‘মার্ভেল’ ভক্তরা স্পাইডার-ম্যানকে শুধু একজন সুপারহিরো হিসেবে দেখিনি। তার সঙ্গে বেড়ে উঠেছি। তার প্রেমে পড়েছি, তার পরাজয় মেনে নিয়েছি, আবার প্রতিবার ভেঙে পড়ার পর তার সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছি। তাই টম হলান্ডের পিটার পারকারকে এবার যখন দেখি একা একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে নিজের একাকিত্বের সঙ্গে লড়ছে, তখন একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা অনুভব হয়।
মার্ভেলের স্পাইডার-ম্যান বরাবরই ছিল ‘ফ্রেন্ডলি নেইবারহুড সুপারহিরো’। অর্থাৎ মহাবিশ্ব বাঁচানোর আগে পাশের বাড়ির মানুষটিকে বাঁচানো ছেলেটি। কিন্তু ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ সেই ‘ফ্রেন্ডলি’কে সরিয়ে ‘নেইবারহুড’-এর নিঃসঙ্গতাটাকে সামনে আনে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ স্পাইডার-ম্যানকে ভালোবাসে অথচ পিটার পারকারের সঙ্গে কথা বলার মতো একজন মানুষও নেই।
এ কারণেই টম হলান্ডের অভিনয় এবার অন্যরকম ছিল। আগের তিন সিনেমায় পিটারের আবেগ ছিল অনেক বেশি বাহ্যিক-উচ্ছ্বাস, ভয়, বিস্ময়, কান্না, অপরাধবোধ। এবার তার অভিনয় অনেকটাই নীরব। তার মুখ, অঙ্গভঙ্গি সবকিছুতেই একটা ক্লান্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ছাপ। যেন সে আর কাঁদতে চায় না, কারণ অনেক বেশি কেঁদে ফেলেছে। পর্দায় এভাবে পিটারকে দেখে একটা কথাই মনে হয়েছে—আমরা আর ছোট নেই পিটার, আমরা বড় হয়ে গেছি। মানুষের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিঃসঙ্গতাও বাড়ে।
সিনেমাটির সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় ‘এমজে’কে হারানো নয়, বরং পিটারের নিজের পুরনো জীবনকে আঁকড়ে থাকা। সে নতুন জীবন পেয়েছে, কিন্তু নতুন করে বাঁচতে পারেনি। সে সামনে এগিয়েছে, কিন্তু ভেতরে কোথাও আটকে আছে। নিজের দায়িত্বকে সে এমন এক আবরণ বানিয়েছে, যার আড়ালে নিজের শূন্যতার দিকে তাকাতে হয় না। মানুষকে বাঁচানো তার কাছে যেমন হিরোইজম, তেমনই এক ধরনের ‘পালিয়ে বাঁচা’। যতক্ষণ সে স্পাইডার-ম্যান, ততক্ষণ তাকে পিটার পারকার হয়ে নিজের একাকিত্বের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না।
এমজের উপস্থিতি সিনেমাটিকে আরো আবেগপ্রবণ করে তোলে। সে পিটারের অতীতের মানুষ, বর্তমান। পিটার তার সঙ্গে ভাগ করে নেয়া প্রতিটি স্মৃতি মনে রেখেছে, কিন্তু এমজে সব বেমালুম ভুলে গেছে। ভালোবাসার এর চেয়ে নির্মম সংজ্ঞা আর কী হতে পারে? একজন মানুষ তোমাকে ভুলে গেছে, কিন্তু তুমি তাকে ভুলতে পারোনি। এ কারণেই নেডের সঙ্গে পিটারের সম্পর্কটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সিনেমাটি প্রেমের চেয়েও গভীরে গিয়ে স্মৃতি এবং সংযোগের পার্থক্য নিয়ে কথা বলে। এ জায়গায় সিনেমাটি ‘সুপারহিরো মিথলজি’কে মানবিক এক প্রশ্নে নামিয়ে আনে—আমরা কি মানুষকে তার গল্প দিয়ে চিনি, নাকি তার উপস্থিতি দিয়ে?
ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটনের পরিচালনায় সিনেমাটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও এখানেই। যে সিনেমাটি পিটারের একাকিত্বকে এত গভীরভাবে ধরতে পারে, সেটিই আবার মাঝে মাঝে নিজের আবেগের প্রাণকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত মিথলজি চাপিয়ে দেয়। নতুন চরিত্র, পুরনো চরিত্র, একাধিক দ্বন্দ্ব সব মিলিয়ে ১৪৫ মিনিটের সিনেমাটি কোথাও কোথাও যেন আরো একটু শ্বাস নিতে চেয়েছে।
এ সিনেমায় ব্রেট পাভলাকের চিত্রগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্ককে এখানে শুধু ‘সুপারহিরো প্লেগ্রাউন্ড’ নয়, বরং পৃথিবীর সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ শহরের নিঃসঙ্গতা দেখিয়েছে। উঁচু ভবন, নিয়ন আলো, ফাঁকা অ্যাপার্টমেন্ট, শহরের অসংখ্য জানালা—সবকিছুর মাঝখানে মানুষকে কখনো খুব ছোট, কখনো খুব একা মনে হয়েছে ব্রেটের ক্যামেরার জাদুতে। মাইকেল জিয়াকিনোর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সে অনুভূতিগুলোকে আরো গভীর করে তুলেছে। এবারের সিনেমায় ‘স্পাইডার-ম্যান থিম’-এর পরিচিত উচ্ছ্বাসের সঙ্গে একটা বিষণ্ন পরিণতিও মিশে যায়।
সেডি সিঙ্কও এ সিনেমায় আলাদা আলোচনার দাবি রাখেন। তার চরিত্রটি শুধু পিটারের নতুন জটিলতা তৈরি করেনি, তার নিজের পরিচয়, ক্ষমতা ও দ্বন্দ্ব সিনেমার বৃহত্তর ‘থিম’—‘নিজের ভেতরের পরিবর্তনকে মেনে নেয়া’-এর সঙ্গেও যুক্ত।
সবশেষে এসে মনে হয়, নতুন দিন মানেই পুরনো মানুষটিকে ফিরে পাওয়া নয়। নতুন দিন মানে কখনো কখনো স্বীকার করা যাদের নিয়ে তুমি এতদিনের জীবন কল্পনা করেছিলে, তারা হয়তো আর তোমার জীবনে ফিরবে না। তার পরও সকালে উঠে দরজা খুলতে হয়। কাজে যেতে হয়। কাউকে বাঁচাতে হয়। নিজের জন্যও বাঁচতে হয়।