আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরা হয়। ঘটনাগুলো হয় মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্র বা দর্শককে বিনোদন দেয়ার জন্য। এছাড়া চলচ্চিত্র মানুষের মত প্রকাশের সর্বাধিক শক্তিশালী মাধ্যম। ইতিহাস-ঐতিহ্যকে দর্শকের সামনে তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন সময় নির্মাতারা বিভিন্ন সিনেমা নির্মাণ করেছে। ১৯৭১ সালে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও অনেক সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বেড়াজাল ছিন্ন করে মুক্তিপাগল বীর বাঙালি ছিনিয়ে আনে নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে। অভ্যুদয় হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। বাঙালি জাতির ইতিহাসের এ অসাধারণ অধ্যায় নিয়ে নির্মাণ হয় বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। যেগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বলে পরিচয় দেয়া হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকগুলো সিনেমা নির্মাণ হলেও আলোচিত সিনেমা হাতেগোনা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘ওরা ১১ জন’, ‘আলোর মিছিল’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘জয়যাত্রা’, ‘গেরিলা’।
এগুলো ছাড়া আরো কিছু সিনেমা আছে যেগুলোয় মুক্তিযুদ্ধের চিত্র সুন্দরভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা। কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে আমাদের চলচ্চিত্রের অধঃপতন শুরু হয়, যা অব্যাহত থাকে পুরো নব্বই দশক পর্যন্ত। এরপর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ আলোচিত কোনো সিনেমা চোখে পড়েনি।
মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি কতখানি তা নিয়ে কথা হয় তিনজন চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গে, যারা মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ করেছেন।
চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াৎ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিল। তখন অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু টেকনিক্যাল ও অর্থনৈতিক সাপোর্ট না থাকায় মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেননি। এটা আমাদের জাতীয় দুর্ভাগ্য যে আমরা একটা গরিব দেশ ছিলাম। তার পরও চলচ্চিত্রকাররা বসে ছিলেন এমনটা নয়। তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তার মধ্যে একটি বলা যায়, ওরা ১১ জন। সিনেমাটি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা হিসেবে চলচ্চিত্রের খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরবর্তী সময়েও বেশ মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো ভালো সিনেমা নির্মাণের বিষয়ে কাজী হায়াৎ বলেন, ‘বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য সিনেমায় তুলে আনা কষ্টসাধ্য। কারণ গ্রামে এখন আর টিনের ঘর নাই। প্রায় অধিকাংশ গ্রামেই পাকা ঘর নির্মাণ হয়ে গেছে। দৃশ্যধারণের জন্য একটা নৌকা চাইলেও পাওয়া যায় না। সে সময়কে তুলে ধরতে হলে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন, এটা সাধারণত পাওয়া যায় না।
মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা ‘ওরা ৭ জন’ নির্মাণ করে প্রশংসা পেয়েছিলেন সিনেমাটির নির্মাতা খিজির হায়াত খান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের শুরুটা ভালো ছিল। কারণ স্বাধীনতার পরের প্রথম সিনেমা ওরা ১১ জন। বাংলাদেশের যাত্রাই শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দিয়ে। এ সিনেমায় মুক্তিযোদ্ধারা অভিনয় করেছেন। পরবর্তী কয়েকটি সিনেমাও ভালো ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে সিনেমার পতন শুরু হয়।
কিছু অসাধু সিনেমার পরিচালক ও প্রযোজক সিনেমাকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। তখন যে অধঃপতন হয়েছে, তা আজও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বারবার বিকৃত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজের মতো ইতিহাস রচনা করার চেষ্টা করেছে। যার কারণে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নিয়ে আমাদের প্রাপ্তিটা অনেক কম। কিন্তু প্রত্যাশা অবশ্যই অনেক বেশি ছিল।’
প্রাপ্তি কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের সিনেমার যে অবস্থা, এখানে মুক্তিযু্দ্ধ বা ঐতিহাসিক সিনেমা তৈরি করা অনেক কঠিন। কারণ বাজেট নাই, মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করতে হলে যেসব সামগ্রী দরকার, তা আমাদের এখানে নেই। মুক্তিযুদ্ধকে দেখাতে হলে সরকারি যে সহযোগিতা দরকার, তাও আমরা পাই না।
‘ঠিকানা বাংলাদেশ’ নামে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি সিনেমা নির্মাণ করছেন চলচ্চিত্র পরিচালক অনম বিশ্বাস। এ বছর সিনেমাটি মুক্তি দেয়া হবে বলে জানান তিনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার জন্য যে বাজেট দরকার, তা কখনই ছিল না। যার কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রত্যাশিত সিনেমা হয়নি। আমার জায়গা থেকে আমি বলব, আমার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কারণ পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ছিল না। তবে চাষী নজরুল ইসলামের ওরা ১১ জন, সংগ্রাম ছাড়াও আগুনের পরশমণি—এ রকম কিছু সিনেমা আছে, যেগুলো ভালো হয়েছে। আমি বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাকে তুলে ধরার জন্য যে বাজেট দরকার, সে বাজেট না থাকায় সিনেমায় অ্যাকশন যুদ্ধের যে অপারেশনগুলো হয়েছে, সেগুলো আমরা শুট করতে পারিনি ঠিকমতো। এ কারণে কিছু সিনেমা ছাড়া মু্ক্তিযুদ্ধের সিনেমায় প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।’