দেশভাগের ইতিহাসে ‘দুই দুনিয়ার বৃত্তান্ত’

নাটকটিতে হ্যামলেটের রোজেনক্রান্টজ ও গিল্ডেনস্টার্ন চরিত্র দুটিকে নতুন রূপ দিয়ে রজব ও গণেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’ অবলম্বনে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, দেশভাগ ও প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মাণ হয়েছে নাটক ‘দুই দুনিয়ার বৃত্তান্ত’। নাটকটি লিখেছেন ও নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. শাহমান মৈশান। ৬ অক্টোবর বার্মিংহামের ম্যাকে (মিডল্যান্ডস আর্টস সেন্টার) এ নাটকের প্রিমিয়ার হবে।

নাটকটির ভাবনা সম্পর্কে ড. শাহমান মৈশান বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় ঔপনিবেশিক সূত্রে কীভাবে শেকসপিয়র চর্চিত হয়েছে এবং তাকে আমাদের অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কীভাবে নতুন করে বোঝা যায়, সেটিই ছিল আমার গবেষণার মূল জায়গা। সে চিন্তার ধারাবাহিকতায় এবার আমরা শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’কে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছি।’

নাটকটিতে হ্যামলেটের রোজেনক্রান্টজ ও গিল্ডেনস্টার্ন চরিত্র দুটিকে নতুন রূপ দিয়ে রজব ও গণেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের শিকার হয়ে তাদের পরিবার স্থানচ্যুত হয়। পরে ভাগ্যান্বেষণে ইংল্যান্ডে গিয়ে তারা অভিনেতা হিসেবে একটি থিয়েটার কোম্পানিতে যুক্ত হয়। রিহার্সালের একপর্যায়ে রজব ও গণেশ নিজেদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মূল নাটকের প্রধান চরিত্রগুলো সম্মান পেলেও তাদের কোনো নিজস্ব পরিচয় বা স্থায়ী সমাধি মেলেনি। নিজেদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিকটিম হিসেবে উপলব্ধির পর তারা থিয়েটার কোম্পানির আরোপিত চরিত্র প্রত্যাখ্যান করে। নিজেদের জীবন, অনুভূতি ও নীরবতার গল্প মঞ্চে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তারা বিদ্রোহ করে। নাটকটিতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি আধুনিক ব্রিটেনে দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের পরিচয়, স্মৃতি, বাস্তুচ্যুতি ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।

রোজেনক্রান্টজ ও গিল্ডেনস্টার্ন চরিত্র দুটোকে কেন নতুনভাবে নির্মাণ করা হলো, সে প্রসঙ্গে নির্দেশক বলেন, ‘হ্যামলেটের বিখ্যাত ক্যানভাসে রোজেনক্রান্টজ ও গিল্ডেনস্টার্ন অত্যন্ত গৌণ ও প্রান্তিক দুটি চরিত্র, যারা পলিটিক্যাল সিস্টেমের শিকার হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ চরিত্র দুটিকেই আমরা নতুন রূপ দিয়ে তৈরি করেছি রজব ও গণেশ হিসেবে।’

নাটকটির বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে শাহমান মৈশান আরো বলেন, ‘এটি মূলত আমাদেরই স্থানচ্যুত মানুষের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও ইতিহাসের কথা। থিয়েটার কেবল স্থানীয় কোনো বিষয় নয়, এটি একটি গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ। এর মাধ্যমে আমরা দেশজ ভাষা, পুঁথির ছন্দ ও ইতিহাসকে শেকসপিয়রের সঙ্গে মিলিয়ে বৈশ্বিক দর্শকের সামনে একটি নতুন রাজনৈতিক ও নান্দনিক সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করতে চেয়েছি।’

নাটকটির নাট্য পরামর্শক হিসেবে রয়েছেন বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শেকসপিয়র ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও শেকসপিয়র বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাইকেল ডবসন। ডিজিটাল দৃশ্যায়ন ও শব্দ পরিকল্পনার পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশী চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ভিজুয়াল শিল্পী মকবুল চৌধুরী। নাটকটিতে অভিনয় করেছেন অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ও তারেক চৌধুরী। ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় বার্মিংহামের ম্যাক (মিডল্যান্ডস আর্টস সেন্টার), ক্যানন হিল পার্কে নাটকটির প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হবে।

আরও