যে গল্প বন্ধুত্ব ও দায়িত্বশীলতার

যেকোনো দেশের সিনেমায়ই বন্ধুত্বের গল্প থাকে। এর মধ্যে কোনো কোনো সিনেমা বেশ জনপ্রিয় হয়। তবে বন্ধুত্বের গল্পের আবার আছে নানা ধাঁচ।

যেকোনো দেশের সিনেমায়ই বন্ধুত্বের গল্প থাকে। এর মধ্যে কোনো কোনো সিনেমা বেশ জনপ্রিয় হয়। তবে বন্ধুত্বের গল্পের আবার আছে নানা ধাঁচ। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সিনেমার ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের গল্পের একটা স্টেরিওটাইপ আছে, তিন বন্ধুর গল্প। বিশেষত ‘দিল চাহতা হ্যায়’, ‘থ্রি ইডিয়টস’ এমনকি ‘কাই পো চে’ এ ধারার গল্প। তিনটি সিনেমাই জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল। কিন্তু এর বাইরেও বন্ধুত্বের নানা গল্প আছে। তেমনই একটি গল্প নিয়ে এসেছে মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রি। নিছক গল্প নয়, সত্য ঘটনা থেকেই নির্মাণ হয়েছে এটি। কয়েকজন বন্ধুর একটি ট্যুর ও সেখানে ঘটা একটি দুর্ঘটনা থেকে সিনেমাটি নির্মিত।

সিনেমার নাম ‘মানজুম্মেল বয়জ’। এরা কোচির কাছে ছোট একটি গ্রাম মানজুম্মেলের বাসিন্দা। একেক জন একেক বয়সের, কিন্তু তাদের মধ্যে একটা দারুণ বন্ধুত্ব আছে। সেই বন্ধুত্বের কথা সিনেমার শুরুতেই তেমন বোঝা যায় না। মনে হয়, কিছু বেকার ছেলে হুড়-হাঙ্গামা করে বেড়ায়। একটি বিয়ের অনুষ্ঠান দিয়ে সিনেমা শুরু। বিয়ের অনুষ্ঠানের মধ্যেই একটা ছোট দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এবং দেখা যায়, সেটা দড়ি টানার খেলায় গড়াচ্ছে। খেলা তো শুধু খেলা নয়, এ তাদের মর্যাদার লড়াই। এরপর আমরা দেখি, দড়ি টানার খেলায় আরো ভালো করার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণও শুরু হয়। এর মধ্যে আসে এদের ভ্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা। ঠিক হয়, সবাই যাবে কোডাইকানালে। তারপর সেখানেই দুর্ঘটনা আর দুর্ঘটনা নিয়েই এগোয় সিনেমার গল্প।

মানজুম্মেল বয়জ শুরু থেকেই দর্শকের আগ্রহ জাগায়। সিনেমার শুরুতে আমরা শুনি কমল হাসান অভিনীত ‘গুনা’ সিনেমার ‘কানমানি আনবোডা কাদালান’ গানটি। সেই সঙ্গে এ গানের সিচুয়েশনের গ্রাফিক প্রেজেন্টেশন। কিন্তু তখন বোঝা যায় না কেন এ গান এল। মনে হতে পারে নিছকই একটি ট্রিবিউট। তবে গল্প এগোলে বোঝা যায়, কোডাইকানালের সঙ্গে গুনার যোগাযোগ আছে। কেননা সেখানেই শুটিং হয়েছিল সিনেমাটির এবং এ কারণে কয়েকটি গুহার নাম হয়েছে ‘গুনা কেভস’। এ গল্প শোনে কোডাইকানালে যাওয়া বন্ধুরা।

২০০৬ সালে সত্যিই ১০ জন বন্ধু গিয়েছিল কোডাইকানালে। সেখানে ট্যুরিস্ট গাইড ডমিনিকের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। ডমিনিক সবাইকে নিষেধ করেন কেভের আশপাশে নিষিদ্ধ এলাকায় যাওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু তারা না শুনে সেখানে গেলে বন্ধুদের একজন (সুভাষ) পড়ে যায় গভীর খাদে। গভীর সে খাদ অনেকটাই টানেলের মতো। সেখানে যেমন অক্সিজেনের অভাব, তেমনি সরু এ খাদে নেমে তাকে উদ্ধার করাও সম্ভব নয়। কিন্তু বন্ধুদেরই একজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে উদ্ধার করেছিলেন সুভাষকে।

অভিনেতা সৌবিন সাহির এ সিনেমার প্রযোজকদের একজন। তার সঙ্গে আছেন বাবু সাহির ও শন অ্যান্টনি। পারাভা ফিল্মসের ব্যানারে সিনেমাটিতে সৌবিন অভিনয় করেছেন সিজু ডেভিড তথা কুট্টান চরিত্রে। এছাড়া শ্রীনাথ ভাসি আছেন সুভাষের চরিত্রে। অন্যান্য বন্ধুদের চরিত্রে আছেন বালু ভার্গিস, গণপতি, লাল জুনিয়র, দীপক পরমবোল, অরুণ কুরিয়ান, খালিদ রহমান প্রমুখ। এই সবক’টি মানুষের চরিত্রই বাস্তব থেকে অনুপ্রাণিত।

সিনেমাটি খুবই সাদামাটাভাবে নির্মিত। কোনো বাহুল্যের বালাই নেই। তবে চিদাম্বরম বাস্তব ঘটনাটিকে ভালো করে আত্মস্থ করেছিলেন। সিনেমায় একটা দৃশ্য আছে যেখানে মানজুম্মেলের এ বন্ধুরা একটি গাছে চড়ে ছবি তোলে। সেই ছবিটিও ২০০৬ সালের সত্যিকার বন্ধুরা তুলেছিলেন। রিল আর রিয়েল পাশাপাশি রাখলে আলাদা করা কঠিন। এ কারণেই দর্শক সিনেমাটি পছন্দ করেছেন। কিন্তু সাদামাটা এ ভাবের কারণে সিনেমা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে। যেমন সিনেমায় যতক্ষণ সুভাষ বন্দি অবস্থায় থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত একটা সাসপেন্স থাকে। বন্ধুরা মিলে ফরেস্ট গার্ডের কাছে যাওয়া, পুলিশে খবর দেয়া ও তাদের আচরণ পর্যন্ত একটা ’কী হয়? কী হয়?’ ভাব ছিল। এরপর সিনেমা সে সাসপেন্স হারায়।

সৌবিন সাহির এ সিনেমার অন্যতম প্রধান চরিত্র। মানজুম্মেল বয়জের মধ্যে তিনিই বয়স্ক। শেষ পর্যন্ত সুভাষকে বাঁচানোর দায়িত্ব কুট্টানই নেয়। তার আগে কয়েকটি দৃশ্য, যেমন গুহায় বৃষ্টির পানি নামা বন্ধ করার চেষ্টা, বন্ধুর জন্য পুলিশ ও উদ্ধার কর্মীদের বারবার বলা এবং শেষ পর্যন্ত লেগে থাকার বিষয়টি একদিক দিয়ে যেমন বন্ধুত্বের পরিচয় দেয়, তেমনি দেয় কুট্টানের দায়িত্বশীলতার পরিচয়ও। কিন্তু সিনেমাটি এ সময় লিনিয়ার হয়ে ওঠে এবং একটু বোরিংও।

তবে এতে দর্শকের খুব একটা অভিযোগ ছিল না। সে কারণেই সিনেমাটি প্রায় ২০০ কোটি রুপি আয় করেছে বক্স অফিসে। মূলত এ ধরনের সিনেমার একটা আবেদন তৈরি হয়েছে গত কয়েক বছরে। মানজুম্মেল বয়জ তার ধাতটি ধরতে পেরেছে। সিনেমা হিসেবে অসাধারণ কিছু না হলেও দর্শকের মন ছুঁতে পেরেছে বন্ধুত্বের এ গল্প।

আরও