লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের দুনিয়ায় মেকআপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মেকআপ মানে কিন্তু কেবল অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মুখশ্রী বর্ধন নয়। এমন অনেক সিনেমা রয়েছে যেখানে চরিত্রগুলো ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য নিতে হয় আলাদা ধাঁচের মেকআপের। সে লক্ষ্য পূরণে আসে স্পেশাল মেকআপ ইফেক্টস, যা সাধারণত প্রস্থেটিক মেকআপ বলে পরিচিত। প্রায় ১০০ বছর ধরে হলিউড, বলিউডে হরহামেশাই ব্যবহার হচ্ছে এ মেকআপ। সম্প্রতি বাংলাদেশেও প্রস্থেটিক মেকআপ ব্যবহার শুরু হয়েছে।
আমাদের দেশে প্রস্থেটিক নিয়ে কাজ হচ্ছে। এর সূচনা হয়েছে প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট স্বর্ণা ভৌমিকের হাত ধরে। বণিক বার্তার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন স্বর্ণা। এ মেকআপ নিয়ে স্বর্ণা বলেন, ‘সাধারণ মেকআপ দিয়ে যে কাজ করা যায় না, স্পেশাল মেকআপ বা প্রস্থেটিক মেকআপ দিয়ে তা করা সম্ভব। গল্পের প্রয়োজনে এমন কিছু জিনিস আসে, যা দেখানো প্রয়োজন কিন্তু সরাসরি দেখানো সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে অন্যকিছু দিয়েই কাজটা করে নিতে হয়। যেমন ধরা যাক, গল্পের প্রয়োজনে হাঁস প্রয়োজন। তবে হাঁস না পেলে রোবটিক প্রস্থেটিকের মাধ্যমে একদম জীবন্ত হাঁস তৈরি করা সম্ভব।’ প্রস্থেটিক দিয়ে বিস্তর কাজ করা যায়। যেমন রোবটিক প্রস্থেটিক, ডাই প্রস্থেটিক, ব্লাড প্রস্থেটিক এমন অনেক ধরনের প্রস্থেটিক রয়েছে। স্বর্ণা বলেন, ‘প্রস্থেটিকের মাধ্যমে একটা ফেক জিনিসকে বাস্তবে আনা সম্ভব, কেবল সেটায় জীবন থাকবে না।’
হলিউডে প্রস্থেটিক মেকআপ শেখার অনেক ইনস্টিটিউশন রয়েছে। এমনকি পাশের দেশ ভারতেও এ নিয়ে চর্চা চালাচ্ছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তবে আমাদের দেশে প্রস্থেটিক মেকআপ শেখায় এমন সুযোগ নেই। তাহলে এ কাজের সঙ্গে স্বর্ণা কীভাবে নিজেকে যুক্ত করলেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে ভূত সাজার জন্য হ্যালোইন মেকআপ করতে গিয়ে খেয়াল করলাম আমাকে নকল ভূত লাগছে। একে কীভাবে আরো বাস্তব করা যায় এ নিয়ে জানতে গিয়েই আমার পরিচয় প্রস্থেটিক মেকআপের সঙ্গে। এ নিয়ে আমি অনেক বই পড়েছি। বইগুলো এক্সপেনসিভ বলে পিডিএফের দ্বারস্থ হতে হতো। এভাবেই আমার হাতেখড়ি। আর এখন আমি অনলাইনের কোর্স করছি স্টেন উইন্সটন স্কুল অব ক্যারেক্টার আর্ট থেকে। বিশ্বের জনপ্রিয় প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট স্টেন উইন্সটন মারা গেলেও ওনার ছাত্ররা এখন স্কুলটা পরিচালনা করছেন।’
গত মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওটিটি প্লাটফর্ম ‘হুলু’য় মুক্তি পায় নুহাশ হুমায়ূনের ইংরেজি ভাষার শর্টফিল্ম ‘ফরেনারস অনলি’। টোয়েন্টিন্থ ডিজিটালের অ্যান্থলজি সিরিজ ‘বাইট সাইজ হ্যালোইন’-এর তৃতীয় সিজনে দেখানো হয়েছে এটি। ফরেনারস অনলিতে প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট ছিলেন স্বর্ণা। পর্দায় অভিনেতা মোস্তফা মনওয়ারের ভয়াবহ রূপ আমরা দেখেছি এই প্রস্থেটিক মেকআপের জোরেই। আমাদের দেশে প্রস্থেটিক মেকআপের চাহিদা কেমন আর কাজে সন্তুষ্ট কিনা, এমনটা জানতে চাইলে স্বর্ণা বলেন, ‘বাংলাদেশে আগেও প্রস্থেটিক মেকআপ নিয়ে কাজ হতো। তবে এখন মানুষ এটা নিয়ে আরো বেশি জানে, তাই কাজ বাড়ছে। প্রস্থেটিক নিয়ে আমি ভালো সাড়া পাচ্ছি। বলা যায় এ মেকআপ নিয়ে আমি আশাবাদী। ২০১৪ সালের দিকে আমি যখন শুরু করেছিলাম, তখন খুব একটা সাড়া না পেলেও এখন পাচ্ছি। নুহাশ ভাইয়ার ফরেনারস অনলিতে যে প্রস্থেটিকের কাজটা করা হয়েছে, এটা বাংলাদেশের প্রথম প্রস্থেটিক, যেটা হলিউড স্টাইলে করা হয়েছে। এরপর থেকে অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে।’
এ মেকআপের জন্য ব্যবহার করা হয় আলাদা মেকআপ পণ্য। আমাদের দেশে এসব পণ্য সহজলভ্য নয়। আর প্রস্থেটিক মেকাআপে ব্যবহৃত পণ্যের দামও আকাশছোঁয়া। এ সমস্যা নিয়ে স্বর্ণা বলেন, ‘তিন থেকে চার বছর সময় লেগেছে প্রস্থেটিক মেকআপ বানানোর বিষয়টা জানতে। যে পণ্যটা আমার কাছে নেই কিংবা যেটা দেশের বাইরে থেকে আনা যাবে না, সেটা কীভাবে নিজেই বানানো যায়, এটা আমি আগে শিখে নিয়েছি। খুব বেশি সমস্যা হয়নি। তবে এখন প্রায় ৬০ শতাংশ প্রস্থেটিক মেকআপের পণ্যসামগ্রী দেশের বাইরে থেকে আনাই। আর বাকি যেটা কোনোভাবেই আনা যায় না, সেটা আমি তৈরি করি আর এগুলো কোনোভাবেই ত্বকের ক্ষতি করে না।’
প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্টদের কদর সারা বিশ্বজুড়েই। হরর, সায়েন্স ফিকশন বা ভিন্ন জনরার কাজে অনেকেই এ মেকআপ ব্যবহার করেন। হলিউড বা বলিউডের অনেক প্রজেক্টেই দেশের বাইরের প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্টদের দিয়ে কাজ করানো হয়। তরুণ প্রস্থেটিক আর্টিস্ট স্বর্ণা দেশের বাইরে থেকে এরই মধ্যে কিছু কাজের প্রস্তাব পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘২০২১-এ আমি অনলাইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রস্থেটিক মেকআপ প্রতিযোগিতা গ্রেপ রিভিউয়ে অংশ নিই। এর আয়োজন করা হয় নিউইয়র্ক থেকে। এর মাধ্যমেই আসলে দেশের বাইরে আমার যোগাযোগটা বেড়েছে। টেরর ভিশন ও এএফআপ এ দুই প্রডাকশন হাউজ থেকে আমি প্রথমে প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে গিয়ে কাজ করে পারিশ্রমিক নিতে গেলে বাজেট অনেক বেড়ে যাবে, এসব মিলিয়ে আর কাজটা করা হয়নি। সম্প্রতি আমি একটা আন্তর্জাতিক কাজ করছি, যদিও এটা নিয়ে খুব বেশি বলা যাবে না। আরো কয়েকটা প্রজেক্টের কাজ করছি যেগুলো সামনে দর্শক দেখতে পাবে।’
স্বর্ণা ছাড়াও বর্তমানে অনেকেই প্রস্থেটিক মেকআপ নিয়ে কাজ করছেন। এখন দেশেই তৈরি হয়েছে এর চাহিদা। আশা করা যেতেই পারে মেকআপ সামগ্রী নিয়ে তৈরি হতে পারে একটি ইন্ডাস্ট্রি এবং প্রস্থেটিক মেকআপ আর্ট হতে পারে নতুন একটি পেশা।