‘ওয়ান্টেড লিস্ট’ থেকে সিনেমার পর্দা

পঙ্কজ ত্রিপাঠীর অপেক্ষা ও যাত্রা

তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, কাস্টিংয়ের জটিল পথ পেরোনোও ছিল কঠিন। অভিনেতাদের ছবি জমা হতো বাক্সে।

একসময় তার মুখ চিনত না কেউ। নাম তো নয়ই। মুম্বাইয়ের একের পর এক কাস্টিং অফিসে গিয়ে তিনি নিজের ছবি রেখে আসতেন। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, কাস্টিংয়ের জটিল পথ পেরোনোও ছিল কঠিন। অভিনেতাদের ছবি জমা হতো বাক্সে। সেখান থেকেই কোনো সহকারী হয়তো একদিন কাউকে খুঁজে নিতেন। তেমনই এক বাক্সে পঙ্কজ ত্রিপাঠির ছবিও জমা পড়েছিল। পরে একটি অপরাধভিত্তিক অনুষ্ঠানের সেটে পুলিশ স্টেশনের দৃশ্যের জন্য যখন ‘ওয়ান্টেড’ বোর্ড বানানো হচ্ছিল, তার ছবিটিও সেখানে ব্যবহার করা হয়। বন্ধুর ফোনে খবর পেয়ে পঙ্কজ জানতে পারেন, তিনি পর্দায় এসেছেন। তবে অভিনেতা হিসেবে নয়, একজন ‘ওয়ান্টেড’ অপরাধী হিসেবে।

ঘটনাটি শুনতে মজার। কিন্তু পঙ্কজ ত্রিপাঠীর জীবনের দিকে তাকালে এটিই যেন তার সবচেয়ে নিখুঁত প্রতীক। তিনি মুম্বাই এসেছিলেন অভিনেতা হতে। অথচ দীর্ঘদিন তার ছবি এদিক-সেদিক ঘুরছিল। তার নাম ছিল না, উপস্থিতি ছিল, পরিচয়ও ছিল না। ছিল একটা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অপেক্ষা।

এ অপেক্ষার সূচনা অবশ্য মুম্বাইয়ে নয়। বিহারের বেলসান্দ গ্রামের ছেলে পঙ্কজ বড় হয়েছেন কৃষক পরিবারে। গ্রামের রাস্তাঘাট ও বিদ্যুতের অভাব, সংবাদপত্র না আসার মতো সীমাবদ্ধতাই তার কল্পনাশক্তিকে অন্যভাবে তৈরি করেছিল। গল্পকে চোখে দেখার সুযোগ কম ছিল, তাই গল্প কল্পনা করার জায়গা ছিল বেশি।

পাটনায় উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি ১৯৯৫ সাল থেকে থিয়েটার শুরু করেন তিনি। অভিনয়ের টান এতটাই গভীর ছিল যে চাকরির সঙ্গে নাটক চালিয়ে যেতে থাকেন। হোটেলে কাজ করতেন, আবার থিয়েটারও করতেন। পরে বুঝলেন, জীবিকা আর জীবনের মধ্যে পার্থক্য আছে। চাকরিটি তাকে বাঁচিয়ে রাখছে, কিন্তু অভিনয় তাকে জীবন্ত রাখছে। অভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়ার সামর্থ্যও ছিল না তার। তাই ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’ই হয়ে উঠল স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে কাছাকাছি পথ। তিনবার পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর চতুর্থবার ২০০১ সালে তিনি এনএসডিতে সুযোগ পান।

এনএসডি তাকে শুধু অভিনয় শেখায়নি, একজন ভালো অভিনেতার পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিয়েছে। তার অভিনয়দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘সংবেদনশীলতা’, মানুষকে অনুভব করার ক্ষমতা। তার বিশ্বাস, নিজের ভেতরের সংবেদনশীলতা ও সরলতা যতদিন অটুট থাকবে, অভিনয় ততদিন বেঁচে থাকবে। অন্য চরিত্রকে বুঝতে হলে আগে নিজের ভেতরই ডুব দিতে হবে। এ বিশ্বাসগুলোই ছিল তার পুঁজি।

এরপর মুম্বাই-পর্ব। ২০০৪ সালে সেখানে গিয়ে শুরু হয় আরেক দীর্ঘ অপেক্ষা। পঙ্কজ ছোট ছোট চরিত্র করেছেন। পরিচালক, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে ঘুরছেন। প্রত্যাখ্যাতও হচ্ছেন। সাফল্য পাওয়ার পর ওই সময়কে ইতিবাচকভাবেই দেখেছেন তিনি। কৃষক পরিবার থেকে আসা পঙ্কজ একে তুলনা করেছেন বীজ বোনার সঙ্গে। মাটিতে বীজ ফেলার পর যেমন পরদিনই তার ফল পাওয়া যায় না, তেমনই অভিনয়ের সে বছরগুলোও ছিল প্রস্তুতির সময়।

‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তারপর একে একে ‘নিউটন’, ‘স্ত্রী’, ‘মিমি’, ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’, ‘মির্জাপুর’। চরিত্র বদলেছে, পরিসর বদলেছে, দর্শক বেড়েছে। কিন্তু পঙ্কজ ত্রিপাঠীর অভিনয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি বদলায়নি। তিনি চরিত্রকে নিজের ওপর চাপিয়ে দেন না, বরং চরিত্রটির ভেতরে ঢুকে তার মানুষটিকে খুঁজে নেন।

অদ্ভুত ব্যাপার, খ্যাতি আসার পরও তার অপেক্ষা শেষ হয়নি। শুধু অপেক্ষার অর্থ বদলে গেছে। ২০২৩ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি এক বছর কোনো নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হননি। নিজের জন্য সময় রেখেছিলেন—ভ্রমণ করেছেন, শরীর ও মন নিয়ে কাজ করেছেন, নিজেকে সময় দিয়েছেন। ফিরে এসে তার কাছে কাজের অর্থও বদলে যায়—শুধু অর্থের জন্য নয়, এখন তিনি এমন কাজ করতে চান, যার জন্য অপেক্ষা করা যায়।

একসময় তিনি অপেক্ষা করতেন, কেউ যেন তাকে একটি চরিত্র দেয়। তারপর অপেক্ষা করেছেন পরিচিতির জন্য। শেষ পর্যন্ত যখন পরিচিতি, সাফল্য, অসংখ্য চিত্রনাট্য তার দরজায় এসে দাঁড়াল, তখন তিনি শিখলেন, অন্য রকম অপেক্ষা—সব কাজের জন্য নয়, সঠিক কাজের জন্য অপেক্ষা করা।

হয়তো এ কারণেই পঙ্কজ ত্রিপাঠীর গল্পকে শুধু সংগ্রাম থেকে সাফল্যের গল্প বলা যায় না। তার গল্পে সংগ্রাম আছে, প্রত্যাখ্যান আছে, দারিদ্র্য আছে, দীর্ঘ অদৃশ্য সময় আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে আছে একটি কৃষক পরিবারের শিক্ষা—বীজ বুনে প্রতিদিন মাটি খুঁড়ে দেখা যায় না, গাছ উঠল কিনা। কিছু জিনিসকে সময় দিতে হয়। পঙ্কজ ত্রিপাঠীও নিজেকে সে সময়টুকু দিয়েছেন।

আরও