বড় পর্দায় অভিষেক হচ্ছে ‘‌এআই অভিনেত্রী’ টিলি নরউডের

উন্নয়ন পর্যায়ে থাকা এ চলচ্চিত্র সম্পর্কে নির্মাতারা জানান, সিনেমাটির পুরো গল্পই সাজানো হয়েছে ইন্টারনেটের অবাস্তব এক ডিজিটাল জগৎ নিয়ে। রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং একটি ‘এআই’ চরিত্র কীভাবে নিজের পরিচয় নিয়ে মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বড় হয়—সেটিই উঠে আসবে এ চলচ্চিত্রে

বিনোদন দুনিয়ার সব বিতর্ক আর সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ‘ডিজিটাল’ অভিনেত্রী টিলি নরউডের। এক সময় বিনোদন জগৎ থেকে তার কথিত অবসরের গুঞ্জন উঠলেও, এবার ব্রিটিশ স্টুডিও ‘পার্টিকেল সিক্স’র নতুন চলচ্চিত্র ‘মিসঅ্যালাইনড’-এ কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা যাবে এ ডিজিটাল অভিনয়শিল্পীকে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিনোদন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পার্টিকেল সিক্স নিজেদের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘এআই-ফার্স্ট’ এবং ‘এআই-হাইব্রিড’ ডেভেলপার হিসেবে দাবি করে। সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বিজ্ঞানসম্মতভাবে কোনো বাস্তব চেতনা বা অনুভূতি না থাকা সত্ত্বেও টিলি নরউড এ চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করবেন।

বৈশ্বিক বিনোদন জগতে টিলির যাত্রা শুরু ২০২৫ সালে, পার্টিকেল সিক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক অভিনেত্রী এলিন ভ্যান ডার ভেল্ডেনের হাত ধরে। মূলত নিজের অঙ্গভঙ্গি ও অবয়ব ব্যবহার করে তিনি টিলিকে রূপ দিয়েছেন। উন্নয়ন পর্যায়ে থাকা এ চলচ্চিত্র সম্পর্কে নির্মাতারা জানান, সিনেমাটির পুরো গল্পই সাজানো হয়েছে ইন্টারনেটের অবাস্তব এক ডিজিটাল জগৎ নিয়ে। রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং একটি ‘এআই’ চরিত্র কীভাবে নিজের পরিচয় নিয়ে মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বড় হয়—সেটিই উঠে আসবে এ চলচ্চিত্রে।

সিনেমার প্লটটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক ও আত্ম-প্রতিফলনমূলক। এখানে টিলি এমন এক এআই সত্তার চরিত্রে অভিনয় করবে, যার নিজস্ব কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই, কিন্তু মানুষের শৈশব আর পেছনের গল্পগুলো সে অনায়াসে দেখতে ও বুঝতে পারে।

এক বিবৃতিতে ভ্যান ডার ভেল্ডেন বলেন, ‘চলচ্চিত্রটি একই সঙ্গে মজার, বিশৃঙ্খল ও আত্মসচেতন হবে—ঠিক টিলি নিজে যেমন। তবে এর গভীরে লুকিয়ে আছে মানুষের পরিচয়, অভিনয় এবং এআই নিয়ে আমাদের ভেতরের এক মনস্তাত্ত্বিক ভয়।’

টিলি নরউডের এ আগমন অবশ্য চলচ্চিত্র পাড়ায় মোটেও সহজভাবে নেয়া হয়নি। প্রথমবার যখন পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিল, তখনই তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছিল এ প্রযুক্তি। বিনোদন জগতের পেশাদারদের দাবি—অভিনয়ের জায়গাটি শুধু মানুষের জন্যই সংরক্ষিত থাকা উচিৎ, কোনো সিন্থেটিক বা কৃত্রিম পারফর্মারের জন্য নয়।

এমনকি হলিউডের প্রভাবশালী ইউনিয়ন ‘সাগ-আফট্রা’ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা টিলিকে কোনো ‘অভিনেত্রী’ মনে করে না এবং সৃজনশীলতা সবসময়ই মানবকেন্দ্রিক হওয়া উচিত। অন্যদিকে একাডেমি অব মোশন পিকচার্স (অস্কার কর্তৃপক্ষ) আরো এক ধাপ এগিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এআইয়ের তৈরি কোনো অভিনেতা বা চলচ্চিত্রকে তারা পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করবে না।

তবে ভ্যান ডের ভেল্ডেন এ প্রযুক্তিকে নেতিবাচকভাবে দেখতে নারাজ। তিনি জানান, চলচ্চিত্র শিল্প ও সাধারণ মানুষের কাছে এআই-এর সক্ষমতা তুলে ধরাই তাদের লক্ষ্য। আর এ সিনেমা তৈরিতে শুধু এআই বিশেষজ্ঞরাই নন, বরং প্রথাগত পরিচালক, লেখক ও সম্পাদকদের মতো রক্ত-মাংসের পেশাদাররাও সমানভাবে কাজ করছেন।

ভ্যান ডের ভেল্ডেনের ভাষায়, ‘‌আমরা প্রমাণ করতে চাই, মানসম্মত সিনেমা নির্মাণে এআই দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন মানুষের সর্বোচ্চ দক্ষতা, বিচারবুদ্ধি এবং সময়। এটা প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটাই আসল সত্য।’

এদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ আগ্রাসন প্রথাগত চলচ্চিত্র শিল্পে তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিনোদন খাতের পেশাদাররা শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন।

গত সেপ্টেম্বরে হলিউডের প্রভাবশালী সংগঠন ‘স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড-আমেরিকান ফেডারেশন অব টেলিভিশন অ্যান্ড রেডিও আর্টিস্টস’ এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দেয়, তারা টিলি নরউডকে কোনো অভিনয়শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। সংগঠনটির মতে, সৃজনশীলতা সবসময়ই মানবকেন্দ্রিক হওয়া উচিৎ।

অন্যদিকে, অস্কার প্রদানকারী সংস্থা ‘একাডেমি অব মোশন পিকচার্স’ আরো কঠোর অবস্থান নিয়ে জানিয়েছে, এআই-দ্বারা তৈরি কোনো অভিনেতা বা চলচ্চিত্রকে তারা কোনো পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করবে না।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, হলিউডের কঠোর বিরোধিতার মুখেও বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষা হিসেবে টিলি নরউডের অভিষেক বিশ্ব চলচ্চিত্র বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। জনপ্রিয় টকশো ‘গ্রাহাম নর্টন শো’-এর কাউচে বসে এ ভার্চুয়াল অভিনেত্রীর অশ্রু বিসর্জনের যে চটকদার প্রচারণা চালানো হয়েছিল, তা হয়তো এবার ব্যবসায়িক স্বার্থেই কাজে লাগাতে চাইছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি।

আরও