বাংলাদেশের জন্য সঞ্জয় সমদ্দার পরিচালিত প্রথম সিনেমা ‘ইনসাফ’। ছোট পর্দা ও ওয়েবে বেশকিছু কাজ আর ওপার বাংলার জিতের সঙ্গে প্রথম সিনেমা ‘মানুষ’ পরিচালনার পর তাকে নিয়ে সিনেমাপাড়ায় কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। আগ্রহ যে দর্শকেরও ছিল, তা সিনেপ্লেক্সের হাউজফুল শো দেখেই অনুমান করা যায়। শরীফুল রাজকে মারকাটারি গ্যাংলিডার আর লাস্যময়ী ফারিণকে পুলিশ হিসেবে সিনেমার ‘ওয়ার্নিং’-এ দেখে প্রত্যাশার পারদ বেশ ওপরে উঠে যায়। কিন্তু সে প্রত্যাশা খুব একটা মেটাতে পারল না ইনসাফ!
সিনেমার শুরুতেই ঢাকার ভেতর শুরু হওয়া হঠাৎ অরাজকতা, চাঁদাবাজি, খুন, গুম আর ছিনতাইয়ের খবর। পুলিশ ধারণা করল, একসময়ের ত্রাস ইউসুফ আবার ফিরে এসেছে! কিন্তু এ ধারণার যে ভিত্তি নেই পুলিশের কাছেই, তারাই তো মৃত ইউসুফের পোড়া লাশ শনাক্ত করেছে। তাহলে এ নতুন গ্যাংলিডার কে, সে কি ইউসুফের নাম করে ত্রাস ছড়াতে চায়! সে রহস্য ভেদ করতে কেসটা আবার নতুন করে খুলতে চায় এএসপি জাহান। এ ইউসুফের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত হিসাবও বাকি আছে। প্রশ্ন থেকে যায়, ইউসুফ কোথায়, সে কি জীবিত না মৃত! এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চায় আরো একজন—একসময়ে ইউসুফের প্রতিদ্বন্দ্বী সুশীল শাহিন। পুলিশ আর গ্যাংয়ের এ রহস্যভেদে এগিয়ে যায় গল্প।
সিনেমা শেষ করে একলাইনে সবাই বলবে, এ চিরাচরিত প্রতিশোধের গল্প সেই জসিম, ওয়াসিম, মান্না কিংবা শাকিবের ছবিতেও ছিল। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে নির্মাতা সে শোধ নেয়া কিংবা ন্যায়বিচার পাওয়ার গল্প দেখাতে চেয়েছেন, তবে চেষ্টাটা সে নতুন বোতলে পুরনো মদ রাখার মতোই লাগল। এটা ঠিক, মিশাকে রম্য ডায়ালগ আর অঙ্গভঙ্গিতে নতুনভাবে আনার চেষ্টা ছিল। তবে অতি অভিনয় আর রাজের সঙ্গে ডায়ালগবাজি ব্যাপারটাকে বিরক্তিতে পরিণত করেছে। গল্পের প্রথমার্ধ যায় ইউসুফের রহস্য উন্মোচনে। গল্পে এগোতে দেয়া পর্যাপ্ত সময় ইউসুফকে উন্মোচন করেছে খুব সহজেই। অনেক কষ্টে পাখির পেছনে ছুটলে যদি পাখি নিজেই ধরা দেয় তাহলে জমে না বিষয়টা।
ফারিণ এ ঘরানার নায়িকা না, তবে চরিত্রটা উপযোগী ছিল। বিশেষ করে রাগী গোয়েন্দা পুলিশ হিসেবে খুব ভালো। কিন্তু সে ফারিণই দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় পুরোটা সময় হাসপাতালের বেডে বসে বসে ফ্ল্যাশব্যাক শুনলেন। ফ্ল্যাশব্যাক দর্শককে দারুণভাবে ঘটনার গভীরে নেয়। তবে এটা যে বর্তমানকে আটকে রেখে যায়, সেটা ভুলে যাওয়াটা সমস্যা হয়েছে।
ইনসাফে রাজকে কাল্পনিক একটা অবতারে খুব ভয়ানকভাবে সামনে আনা হয়েছে। রাজের অভিনয়দক্ষতা বারবার সে প্রমাণ করে এসেছে, তবে তাকে ভিন্নভাবে একই সিনেমায় দেখাতে যে যুক্তি ও সময় দরকার ছিল সেটা দেয়া হয়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে আনা, সততার বিচার ও মেডিকেল সিন্ডিকেটের কবলে দেশের অসংখ্য রোগীদের যে ভোগান্তি তার প্রতিরোধ দেখানো হয়েছে ভালোভাবেই।
নেতিবাচক দিক নিয়ে বলতে গেলে ‘ভায়োলেন্স’ প্রসঙ্গ আসবে। অনেকে বলবেন, ‘সিনেমা দেখে কেউ ভায়োলেন্ট হয় না!’ কিন্তু গল্পে ভায়োলেন্স যখন বিনোদন আর হিরোগিরির একমাত্র মাধ্যম হয়ে যায়, সমস্যাটা শুরু হয় তখন। বিরতির পর টানা ফ্ল্যাশব্যাক গল্পের গতিও কমিয়ে দিয়েছে।
ইনসাফে রাজ, ফারিণ, মিশা ছাড়াও আছেন গুণি অভিনেতা মোশাররফ করিম। দারুণভাবে পর্দায় তার আগমন হলেও তার সম্পর্কে একটা আরোপিত ফ্ল্যাশব্যাক ছাড়া আর কিছু পাইনি। সিনেমায় তার প্রভাব ছিল গভীর, হয়তো পরের ছবিতেও থাকবে। করিমের শর্টগানের গুলি আর দেদারসে গুণে গুণে কুড়ালের কোপ কতটা ভয় ধরালো জানি না, তবে তার দাড়ি খুলে পড়ার ভয় ছিল অনেকটাই। ‘বিশ টাকার ডাক্তার’ মোশাররফ করিম যেন থেকেও নেই। কোথা থেকে আসলেন, আবার কোথায় যেন হারিয়েও গেলেন। অথচ সিনেমা শেষে যে কেউ বলবে, এ বিশ টাকার ডাক্তারের ভুমিকাটাই মেন্টরের।
হাবিবের গানটা ভালো, তবে সীমাবদ্ধ জায়গা আর কস্টিউমে গানটা আলাদা মাত্রা পায়নি। গানের পাশাপাশি জেফারকে আইটেম হিসেবে দেখানোটা মজার ছিল। সিনেমার শেষ দিকে আরেকজন বেহালা বাজিয়ে দর্শককে চমকে দিয়েছেন, এ পর্বে তার পরিচয় দেয়ার সময়ও পাননি নির্মাতা, লেখক। নির্মাতার পাশাপাশি লেখক নাজিম উদ দৌলা ফর্মুলা মেনেই এগিয়েছেন, তবে দক্ষিণ ভারতের ফর্মুলা দর্শককে কতটা নতুনত্ব দিল, সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।