ভেতরে প্রস্তুতি চলছে এক ঐতিহাসিক আয়োজনের। মঞ্চে উঠবেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত কিছু সংগীতশিল্পী। সেই কনসার্টের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এমন একটি দেশ, যার নাম তখনো বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না-‘বাংলাদেশ।’
সেদিন জর্জ হ্যারিসন কনসার্টে গেয়েছিলেন, বাজিয়েছিলেন, অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশে তার সেই উদ্যোগ শুধু জীবন বাঁচাবে না, একদিন একটি নতুন সংগীত সংস্কৃতির জন্মকেও প্রভাবিত করবে। সেই গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নাম আজম খান।
আজম খানকে আমরা সাধারণত বাংলাদেশের প্রথম পপ তারকা হিসেবে জানি। কিন্তু তার গল্পকে যদি শুধু ঢাকা, বাংলাদেশ কিংবা বাংলা গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে গল্পের অর্ধেকই বলা হয়। কারণ আজম খান এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সংগীতের নতুন দরজাও খুলতে দেখেছিল।
সত্তর দশকের শুরুতে পশ্চিমা বিশ্বে এক সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ ঘটছে। রক সংগীত বদলে যাচ্ছে। ‘বিটলস’ পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যান্ডে পরিণত হয়েছে সে সময়ে। তরুণরা গিটার হাতে নিজেদের ভাষায় কথা বলতে শিখছে। সংগীত আর শুধু বিনোদন নয়, এটি হয়ে উঠছিল পরিচয়, প্রতিবাদ ও আত্মপ্রকাশের ভাষা।
বাংলাদেশ তখন সদ্য স্বাধীন। যুদ্ধবিধ্বস্ত। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক নতুন পরিচয়ের খোঁজে। এ দুই পৃথিবী একটি লিভারপুলের, অন্যটি ঢাকার অদ্ভুতভাবে এসে মিলিত হয়। আজম খান ছিলেন সেই মিলনের সন্তান।
তিনি পশ্চিমা সংগীত শুনতেন। ‘বিটলস’ তাকে ভীষণ প্রভাবিত করেছিল। শুনতেন ‘রোলিং স্টোনস’। বিশেষ করে জর্জ হ্যারিসনের প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। এটি নিছক সংগীতগত পছন্দ ছিল না। বাংলাদেশের জন্য জর্জ হ্যারিসন ছিলেন এক ভিন্ন ধরনের নায়ক। যখন বিশ্বের বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানের মানবিক বিপর্যয় সম্পর্কে জানত না, তখন হ্যারিসন বাংলাদেশের জন্য কণ্ঠ তুলেছিলেন। একজন ব্রিটিশ রকস্টার ও এক নবজাতক দেশের মধ্যে এমন সম্পর্ক ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। আজম খানের প্রজন্ম এ ঘটনাকে শুধু সংবাদ হিসেবে দেখেনি। তারা এটিকে অনুভব করেছিল।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা তৈরি হয়। অনেকে মনে করেন, পশ্চিমা সংগীতের প্রভাবে আজম খান পশ্চিমা ধাঁচের গান বানিয়েছিলেন। বাস্তবতা ঠিক উল্টো। তিনি পশ্চিমা সুরের কাঠামো নিয়েছিলেন, কিন্তু গল্পগুলো রেখেছিলেন একেবারে বাংলাদেশের। এটাই তাকে অনন্য করে তোলে। ‘বিটলস’ কখনো ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ লিখতে পারত না। কারণ সেই গল্প লন্ডনের নয়। সেই গল্প ঢাকার বস্তির, রেললাইনের, শহরের অদৃশ্য মানুষের। আজম খান গিটার নিয়েছিলেন পশ্চিম থেকে। কিন্তু আত্মা নিয়েছিলেন বাংলাদেশের মাটি থেকে। এ কারণেই তার গানগুলো নকল পশ্চিমা সংগীত হয়ে ওঠেনি। বরং একটি নতুন ভাষা তৈরি করেছিল। এক ধরনের ‘বাংলাদেশী পপ’। যেখানে রক গিটারের পাশে বেঁচে থাকে আমাদের ভাষা। ড্রামের পাশে বেঁচে থাকে আমাদের শহরের ধুলো। পশ্চিমা কর্ড প্রগ্রেশনের ভেতরে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের বাস্তবতা।
সম্ভবত আজম খানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এখানেই। তিনি পশ্চিমকে অনুকরণ করেননি। তিনি পশ্চিমকে অনুবাদও করেননি। তিনি পশ্চিমা সংগীতের শক্তিকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের নিজস্ব কণ্ঠ তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের এক বিরল উদাহরণ।
আজ যখন আমরা ‘বাংলা ব্যান্ড সংগীত’ বলি, তখন বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু কোনো একসময় ধারাটির অস্তিত্বই ছিল না। কেউ না কেউ প্রথমবারের মতো গিটার হাতে দাঁড়িয়ে ভেবেছিল ‘আমি বাংলা ভাষায়, আমার নিজের মানুষের গল্প বলব।’ আজম খান ছিলেন সেই মানুষের একজন।
জর্জ হ্যারিসন কখনো আজম খানের সঙ্গে মঞ্চ শেয়ার করেননি। তাদের দেখা হয়েছিল বলেও কোনো প্রমাণ নেই। তবু ইতিহাসের গভীরে কোথাও দুজন মানুষের মধ্যে একটি অদৃশ্য সংযোগ রয়ে গেছে। একজন পৃথিবীকে বাংলাদেশের কথা শুনিয়েছিলেন। আরেকজন বাংলাদেশকে নিজের কণ্ঠে কথা বলতে শিখিয়েছিলেন। একজন কনসার্ট আয়োজন করেছিলেন বাংলাদেশের জন্য। আরেকজন বাংলাদেশের সংগীতকে নতুন যুগে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের গল্প দুটি আলাদা। কিন্তু মাঝখানে যে সেতুটি রয়েছে, তার নাম সংগীত। সেই সেতুর ওপর দিয়েই হেঁটে বাংলাদেশ একদিন পৌঁছে গিয়েছিল আধুনিক পপ সংস্কৃতির যুগে।