প্রায় চার দশক ধরে নিজের সৌন্দর্যে দর্শককে মোহিত করে রেখেছেন ইতালির মনিকা বেলুচি। মডেল হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে এক পর্যায়ে তিনি হয়েছেন সবচেয়ে বয়স্ক বন্ড গার্ল। একের পর এক সিনেমায় অভিনয় ও সৌন্দর্যে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন তিনি। ২০০৪ সালে এক সাক্ষাত্কারগ্রহীতা বলেছিলেন, ইতালিয়ান সব পারফেকশনের যোগফল হচ্ছেন মনিকা বেলুচি। গার্ডিয়ানের রিপোর্টার যখন প্যারিসের একটি হোটেলের বারে মনিকার সঙ্গে বসেছিলেন, তখন সাধারণ মানুষের মতোই কফি পান করছিলেন। এমকি লরা ক্যাপেল নামের সাংবাদিক নিজে কফি অর্ডার না করায় মনিকা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ তিনি সামনের মানুষটির ব্যাপারে সতর্ক ও সহানুভূতিশীল।
মনিকা বেলুচির ক্যারিয়ারে ইতালিয়ান ও ফ্রেঞ্চ আর্ট ঘরানার সিনেমার পাশাপাশি ম্যাট্রিক্সের সিকুয়েলের মতো ব্লকবাস্টার রয়েছে। ম্যালেনা আজও সারা বিশ্বে তুমুল প্রশংসিত, আলোচিত। ৫০ পেরিয়ে নিজের সাফল্যের মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত করছেন তিনি। একটি স্টেজ ড্রামায় অভিনয় করেছেন মনিকা। টম ভল্ফের পরিচালনায় নাটকটির নাম মারিয়া কাল্লাস: লেটারস অ্যান্ড মেমোয়ারস। প্যারিসে ওপেনিং হয়ে নাটকটি ইতালি, গ্রিস ও তুরস্কে মঞ্চস্থ হয়েছে। গত ডিসেম্বরে লন্ডনে হার ম্যাজেস্টিস থিয়েটারে নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার কথা থাকলেও ওমিক্রনের কারণে পিছিয়ে এপ্রিলে করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ভল্ফের নাটকটি তার ২০১৯ সালের বই অবলম্বনে তৈরি। নাটকটি কাল্লাসের (আমেরিকান-গ্রিক অপেরা গায়িকা) ৩৫০টি চিঠি ও অসমাপ্ত স্মৃতিকথার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।
কাল্লাসের লেখার ওপর কাজ করার ইচ্ছা মনিকার বহুদিনের। কিন্তু মঞ্চে কাজ করার ব্যাপারে তার মধ্যে ভীতি কাজ করত। এতদিন মঞ্চে কাজ করার জন্য অনেক প্রস্তাব এলেও মনিকা তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। বহুদিনের চেষ্টায় তিনি মঞ্চভীতি কাটিয়ে উঠেছেন। এখন শেষ পর্যন্ত মঞ্চে উঠে কেমন লাগে সে প্রশ্ন করা হলে মনিকা বলেন, ‘মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’
এতদিন যাদের ফিরিয়ে দিতেন, দর্শক সারিতে তাদের কেউ কেউ উপস্থিতও থাকেন। সে কথা মনে করে লাজুক হেসে বলেন, ‘ব্যাপারটা অস্বস্তিকর। সে মানুষগুলো সামনে বসে থাকে এবং পুরো বিষয়টা সামলে নিতে হয় নিজেকে। আসলে আমার মধ্যে এখনো কিছু ভীতি কিন্তু ঠিকই কাজ করে।’
ভল্ফের সঙ্গে মনিকাকে ভল্ফের এক বন্ধু পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কাল্লাসের লেখা পড়ার পর মনিকার অনুভূতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভল্ফ বলেন, ‘কাল্লাসের চিঠিগুলো পড়ে তার আবেগ পুরোটাই ধরতে পেরেছিলেন মনিকা। জানালা দিয়ে খানিকটা আলো এসে মনিকার গালে পড়ছিল এবং আমার মনে হচ্ছিল, এখানে কাল্লাসই বসে আছেন।’
কাল্লাসের জীবন, অপেরায় তার গান ও অন্যান্য টানাপড়েন নিয়ে সাজানো গল্পটি। মাঝে মাঝে এসেছে অ্যারিস্টটল ওনাসিসের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কের কথা। সব মিলিয়ে কাল্লাসের জীবন জটিলতার সম্পর্কে মনিকা বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এসে মনে হয় তার জীবনে কেবল সংগীতই ছিল। বাকি সব হারিয়ে গিয়েছিল।’
মূলত মনিকার মঞ্চভীতি কাটার পেছনে কিছু বিষয় কাজ করেছে। এখানে কাল্লাসের ওয়ার্ড্রোব থেকে ১৯৬০ সালের মিলান কালেকশনের একটি কালো পোশাকের ভূমিকা আছে। ‘পোশাকটি একদম ঠিকঠাক হয়েছিল আমার গায়ে’—যেন কোনো রহস্য করছেন, এমন করে ফিসফিসিয়ে বলেন মনিকা। স্বাভাবিকভাবেই একটি রেপ্লিকা তৈরি করে অভিনয়ে ব্যবহার করা হয়। তবে মনিকা ঠিক কাল্লাসের ব্যবহার করা পোশাকটিই পরতে চেয়েছিলেন। মনিকা বলেন, ‘পোশাকটি ছাড়া অভিনয় করতে আমি ভয় পাচ্ছিলাম।’
নাটকটি কোথায় মঞ্চায়িত হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে মনিকা ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ বা ইংরেজিতে কথা বলেন। এখানে আরেকটি বিষয় হলো কাল্লাসও তিনটি ভাষা জানতেন। মনিকা এমনিতেও নিজের ডাবিং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজেই করেন। কাল্লাসের নিজের একটি ভিন্ন টান ছিল। সেটা কেমন করে আনেন, এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘যখন কোনোকিছু প্রকাশ করার সময় আপনি গভীরে ঢুকে যান, তখন তা আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে।’
কাল্লাসের চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে মনিকা হয়তো নিজের জীবনের সঙ্গেও বিষয়টি জুড়তে পারেন। মনিকার জন্ম ইতালির আম্ব্রিয়ায় এবং তিনি আইনের ছাত্রী ছিলেন। ফরাসি অভিনেতা ভিনসেন্ট ক্যাসালের সঙ্গে তার দাম্পত্য সম্পর্কে জনসমক্ষে কমই কথা বলেন। তাদের বিয়ে ১৯৯৯-২০১৩ পর্যন্ত টিকেছিল। ফরাসি সিনেমা দি অ্যাপার্টমেন্ট করার সময় ক্যাসেলের সঙ্গে মনিকার দেখা হয়। এরপর তারা একত্রে বেশকিছু কাজও করেছিলেন। তারপর এক সময় বিচ্ছেদ। কাল্লাসের জীবনেও এমন ঘটনা ছিল। তবে কাল্লাস ছিলেন গভীরভাবে আবেগী। কাল্লাস যে তীব্র আবেগ নিয়ে জীবনযাপন করতেন, মনিকাও তেমনি আবেগী জীবনে বিশ্বাসী কিনা তা জিজ্ঞেস করা হলে মনিকা বলেন, ‘ততটা নয়। আমার দুটো সন্তান আছে। আমি আমার আবেগকে সংযত করতে শিখেছি।’
অতিমারীর মধ্যে বেশ জটিল সময় পার করে এসেছেন মনিকা। এখন সন্তানদের খেয়াল রাখার পাশাপাশি মঞ্চ ও সিনেমায় সময় দিচ্ছেন। নিজের কথা বলতে গিয়ে মনিকা বলেন, ‘একটা সময় মডেলিং ও অভিনয় আলাদা করে দেখা হতো। এখন সময়টা আর তেমন নেই।’
মনিকা মনে করেন আগে অনেকে অপরিণত বয়সে কাজে চলে আসত। সে তুলনায় এখন পরিণত বয়সে আসে এবং তারা দায়িত্ববান। বিশেষত মনিকার বিশ্বাস নিজেকে গড়ে তোলা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তার সৌন্দর্য নিয়ে যে চর্চা হয় তা তিনি জানেন। তবে তিনি কাজকে গুরুত্ব দেন। মনিকা বলেন, ‘আমরা ইমেজের জগতে কাজ করি। সৌন্দর্যটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কাজটা কেবল সৌন্দর্য দিয়ে হয় না। কেউ কেবল সৌন্দর্য নিয়ে এলে ৫ মিনিটও টিকতে পারবে না।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান