কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তা মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে জীবনের এমন কোনো অধ্যায়ে, যার দিকে সচরাচর কেউ ফিরে তাকাতে চায় না। প্রতিদিনের গতানুগতিক জীবনের হিসেবি ব্যস্ততা থেকে আমাদের টেনে বের করে নিজের গভীরে তাকানোর যে বিরল অনুভূতি, একটি সিনেমা কখনো কখনো সেটিই জীবন্ত করে তুলতে পারে।
বাস্তব জীবনেও এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় কাউকে। এমনই একজন ৩২ বছর বয়সী মাধবী হাসান। তার ডিভোর্স হয়েছে চার বছর আগে। এরপর প্রাক্তনের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। একটি সিনেমা দেখে এত বছর পর তাকে ফোন করেছিলাম। খুব অদ্ভুত একটা অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছেন তিনি। সিনেমাটি কৌশিক গাঙ্গুলী পরিচালিত ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’। সিনেমাটি ১০ জুলাই মুক্তি পায়। এটি ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অর্ধাঙ্গিনী’র সিকুয়াল।
সিনেমায় শুভ্রা চরিত্রে অভিনয় করেছেন চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়। ‘অর্ধাঙ্গিনী’ প্রসঙ্গে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘প্রাক্তন কখনো ক্লোজড চ্যাপ্টার হয় না।’ সম্ভবত এ একটি বাক্যেই ‘অর্ধাঙ্গিনী’ এবং ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ দুটি চলচ্চিত্রের দর্শনকে ধারণ করা যায়।
আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের হয়ে প্রেমপত্র লিখে দিচ্ছে। পৃথিবী দ্রুততর হচ্ছে, সম্পর্কও হয়ে উঠছে ক্ষণস্থায়ী। ভালোবাসার চেয়ে মানুষকে এখন বেশি প্রাধান্য দেয় ‘মুভ অন’কে। বিচ্ছেদের পর কীভাবে দ্রুত ভুলে যেতে হবে, তার অসংখ্য পরামর্শ চারপাশে। এ সময়েই অর্ধাঙ্গিনী দর্শকের সামনে এক গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—একজন মানুষকে কি সত্যিই কখনো একজন মানুষ সম্পূর্ণভাবে ভুলে যেতে পারে?
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র সুমনের অসুস্থতা যেন কেবল একটি উপলক্ষ। প্রকৃত গল্পটি আবর্তিত হয় তার চারপাশের মানুষকে ঘিরে। বর্তমান স্ত্রী মেঘনা ও প্রাক্তন স্ত্রী শুভ্রা একসময় উপলব্ধি করেন, তারা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নন। তারা একই মানুষকে ভালোবেসেছেন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন অভিজ্ঞতায়। একজনের কাছে মানুষটি বর্তমান, অন্যজনের কাছে স্মৃতি।
আর একজন মানুষের ‘বর্তমান’-কে একজন ‘প্রাক্তন’ এত নির্মলভাবে গ্রহণ করতে পারেন এ উপলব্ধিই চলচ্চিত্রটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। বাস্তব জীবন হোক কিংবা সিনেমা, আমরা বরাবরই একটি পরিচিত চিত্র দেখে এসেছি। একজন পুরুষ, দুজন নারী, তারপর শুরু হয় প্রতিযোগিতা। ঈর্ষা, অপমান, প্রতিশোধ, চোখের জল, একে অন্যকে হারিয়ে দেয়ার লড়াই। যেন একজন পুরুষকে কেন্দ্র করেই দুই নারীর অস্তিত্ব। অর্ধাঙ্গিনী ঠিক এ জায়গায়ই প্রচলিত গল্পের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এ চলচ্চিত্র দুই নারীকে একজন পুরুষের জন্য লড়তে শেখায় না, বরং একই মানুষকে ভালোবাসার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা কীভাবে একে অন্যকে বুঝতে শেখেন, সেটিই দেখায়।
সিনেমাটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। আমাদের সমাজে নারীর শক্তিকে প্রায়ই সংজ্ঞায়িত করা হয় ভিন্নভাবে। শক্তিশালী নারী মানেই তিনি কখনো কাঁদবেন না, ভেঙে পড়বেন না কিংবা কাউকে ক্ষমা করবেন না। কিন্তু অর্ধাঙ্গিনী শক্তির এক ভিন্ন সংজ্ঞা দেয়। এখানে শক্তি মানে নিজের কষ্টকে অস্বীকার করা নয়। শক্তি মানে অন্যের কষ্টকে উপলব্ধি করতে পারা। শক্তি মানে নিজের অহংকারকে অতিক্রম করে আরো মানবিক হয়ে ওঠা। শক্তি মানে ভালোবাসাকে মুছে ফেলতে না চেয়ে, তাকে সম্মান করতে শেখা।
মেঘনা ও শুভ্রা কোনো অতিমানব নন। তারা কাঁদেন, রাগ করেন, অভিমান করেন, ভেঙে পড়েন। তবু তারা ঘৃণাকে নিজেদের পরিচয় হতে দেন না। বরং সহমর্মিতা, গ্রহণযোগ্যতা ও আত্মমর্যাদার মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের শক্তিকে প্রকাশ করেন। সেখানেই তাদের প্রকৃত মানসিক দৃঢ়তা।
ভালোবাসার এ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো গভীর করে তুলেছে অনুপম রায়ের গান ‘আলাদা আলাদা’ ও ‘তুমি মনে হয় চলে যাবে’। দুটি গানই যেন চলচ্চিত্রের আবেগকে ভাষা দিয়েছে। অন্যদিকে মেঘনা চরিত্রে জয়া আহসানের সংযত অথচ গভীর অভিনয় শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, দুই বাংলার দর্শক-সমালোচকদের কাছেই প্রশংসিত হয়েছে।
অর্ধাঙ্গিনী কেবল একটি সম্পর্কের গল্প নয়। এটি ভালোবাসাকে নতুন করে ভাবার গল্প। এমন চলচ্চিত্রই আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রযুক্তি হয়তো মানুষের ভাষা শিখতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর অভিধানটি এখনো মানুষের হৃদয়েই লেখা থাকে।