বলিউডের অন্যতম প্রতিভাবান চলচ্চিত্র পরিচালক সঞ্জয় গুপ্ত। অপরাধনির্ভর সিনেমা ও অ্যাকশন থ্রিলারের জগতে স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলীর জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি। গ্যাংস্টারদের জীবন, অপরাধজগতের সংঘাত, প্রতিশোধ আর ক্ষমতার লড়াই পর্দায় তুলে ধরতেন তিনি। এভাবেই তৈরি হয়েছিল তার নিজস্ব এক চলচ্চিত্রভাষা। ‘আতিশ’, ‘কাঁটে’, ‘শুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’, ‘শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা’ কিংবা ‘কাবিল’-এর নির্মাতা সঞ্জয় গুপ্ত আর নেই। ৩০ অক্টোবর মুম্বাইয়ে মারা গেলেন তিনি। নিজের বাসায় পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান তিনি। পরে তার মৃত্যু হয়। সঞ্জয়ের বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর।
সঞ্জয় গুপ্তের মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান চলচ্চিত্র নির্মাতা অশোক পণ্ডিত। শোক প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘এটা সত্যিই মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। এইমাত্র খবর পেলাম, আমাদের প্রিয় বন্ধু, মেধাবী পরিচালক সঞ্জয় গুপ্ত আর নেই। বাসায় মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।’
সঞ্জয়কে প্রাণবন্ত মানুষ, অসাধারণ গল্পকার এবং চলচ্চিত্রের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ নির্মাতা হিসেবে স্মরণ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এটাই অবশ্য সঞ্জয়ের জীবনের প্রথম দুর্ঘটনা ছিল না। কয়েক বছর আগে পুনে থেকে মুম্বাই যাওয়ার পথে এক গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। সে সময় শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পেয়েছিলেন। তবে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছিলেন। সেই দুর্ঘটনা কাটিয়ে উঠলেও এবার আর ফেরা হলো না তার।
১৯৯৪ সালে ‘আতিশ: ফিল দ্য ফায়ার’ দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক ঘটে সঞ্জয় গুপ্তর। সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সঞ্জয় দত্ত, আদিত্য পাঞ্চোলি ও রাভিনা ট্যান্ডন। শুরু থেকেই অপরাধজগতের গল্প, দ্রুতগতির দৃশ্যায়ন এবং তীব্র আবেগের প্রতি তার আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ‘কাঁটে’ তাকে আরও পরিচিতি এনে দেয়। সিনেমায় একদল অপরাধীর গল্পকে হলিউডি হাইস্ট সিনেমার আবহে উপস্থাপন করেছিলেন। একাধিক তারকার উপস্থিতি, টানটান উত্তেজনা ও স্টাইলিশ অ্যাকশন ছিল সিনেমাটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
তবে সঞ্জয় গুপ্তের নির্মাণজীবনের অন্যতম আলোচিত কাজ ‘শুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি মুম্বাইয়ের অপরাধজগতের এক বাস্তব ঘটনার প্রেক্ষাপটে নির্মিত। বিবেক ওবেরয়, অমিতাভ বচ্চন ও সঞ্জয় দত্ত অভিনয় করেছিলেন এতে। সিনেমার প্রযোজনা ও চিত্রনাট্য রচনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। সিনেমাটি বক্স অফিসে সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি গ্যাংস্টার সিনেমার নির্মাণশৈলীতে তার অবস্থান আরও দৃঢ় করে।
‘শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা’য় জন আব্রাহাম। ছবি: রটেন টমেটোজ
এরপর ‘শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা’ দিয়ে একই ধারার গল্পে ফিরে যান সঞ্জয়। জন আব্রাহাম, অনিল কাপুর ও কঙ্গনা রনৌত অভিনীত সিনেমাটিও ছিল অপরাধজগতের সংঘাত ও সহিংসতার গল্প। অন্যদিকে ‘কাবিল’-এ হৃতিক রোশন ও ইয়ামি গৌতমকে নিয়ে নির্মাণ করেন প্রতিশোধের কাহিনি। ফলে শুধু গ্যাংস্টার সিনেমা নয়, অ্যাকশন থ্রিলারের নানা ধরনের গল্পেও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি।
সঞ্জয় গুপ্তের সিনেমায় চরিত্রগুলো খুব একটা সহজ সরল ছিল না। অপরাধী, পুলিশ কিংবা প্রতিশোধপরায়ণ মানুষ প্রত্যেকের মধ্যেই ছিল দ্বন্দ্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক জটিলতা। স্টাইলিশ অ্যাকশন, একাধিক তারকার সমাবেশ এবং তীব্র বর্ণনাভঙ্গি তার সিনেমাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছিল। বলিউডের মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় অপরাধজগতের গল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তার অবদান তাই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে তার চলে যাওয়া ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য এক অকাল ক্ষতি।
সূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস