পাঞ্জাবের গন্ধ মিশে আছে গুলজারের গানে

মুম্বাইয়ে সাফল্য পেলেও পাঞ্জাব কখনই পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি। তার কবিতা, ছোটগল্প ও চলচ্চিত্রের গানের কথায় বারবার ফিরে এসেছে সেই শেকড়ের টান।

জন্মের পর নাম রাখা হয়েছিল সম্পূরণ সিং কালরা। পাঞ্জাবের আলো বাতাস মেখেই বড় হয়েছেন। তারপর ঘর ছাড়েন। ১৬ বছর বয়সে বর্তমান পাকিস্তানের ঝিলম জেলার দিনা শহর থেকে দিল্লি হয়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। সেখানেই ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। একসময় হয়ে উঠেছেন বলিউডের অন্যতম খুঁটি। তবে কেবল সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিই নয়, সাহিত্যেও তার অবদান গভীর। এ বহুমুখী প্রতিভাকে সবাই গুলজার নামেই চেনেন। মুম্বাইয়ে সাফল্য পেলেও পাঞ্জাব কখনই পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি। তার কবিতা, ছোটগল্প ও চলচ্চিত্রের গানের কথায় বারবার ফিরে এসেছে সেই শেকড়ের টান।

সম্প্রতি ৯২তম জন্মদিন উদযাপন করেছেন গুলজার। প্রধানত উর্দু কবি হিসেবে তার খ্যাতি হলেও ছোটগল্প, চিত্রনাট্য ও চলচ্চিত্রের গীতিকার হিসেবেও তার অবদান অনস্বীকার্য। তার ছদ্মনাম ‘গুলজার’ শব্দটির অর্থই উর্দুতে ‘বাগান’। তবে তার লেখায় পাঞ্জাবি উত্তরাধিকারও টিকে আছে নানাভাবে। এমনকি তার শুরুর দিকের লেখা ও চলচ্চিত্রের কৃতিত্বের তালিকায় নাম লেখা হতো ‘গুলজার দিনভি’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্ন কবি ও লেখকের কাছ থেকে গুলজার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তবে তার চলচ্চিত্রের গানের কথায় ‘পাঞ্জাবিয়াত’ (পাঞ্জাবের সংস্কৃতি অর্থে) স্পষ্ট। সুফি সাধক ও কবি ওয়ারিস শাহ, বুল্লে শাহ, বাবা ফরিদ ও শাহবাজ কালান্দারের শব্দ ও ভাবনা গুলজারের গানে বারবার ফিরে এসেছে। কখনো তা খুবই প্রত্যাশিত ও স্পষ্টভাবে, আবার কখনো এতটাই বিস্ময়কর ও অপ্রত্যাশিতভাবে যে শ্রোতাকে চমকে দেয়।

জে পি দত্তের ‘গোলামি’ (১৯৮৫) সিনেমায় আমির খসরুর ‘জেহাল-এ মিসিকন’ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে গুলজার সেটিকে মরুভূমির মানুষের গাওয়া প্রেম ও বিরহের গানে রূপ দেন। গুলজারের পাঞ্জাবিয়াত সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে তার চলচ্চিত্রের গানের কথায়। মায়ি (মা), মাহি (প্রিয়তম) কিংবা ইয়ারি (প্রেমের সম্পর্ক)—এ ধরনের শব্দ তার আগে থেকেই হিন্দি চলচ্চিত্রের গানে জনপ্রিয় ছিল। তার পূর্বসূরিদের মধ্যে ছিলেন সাহির লুধিয়ানভি, আর সমসাময়িকদের মধ্যে আনন্দ বকশি।

হিন্দি চলচ্চিত্রের গানের শব্দভাণ্ডারকে পাঞ্জাবের মাটির গন্ধ, প্রকৃতির দৃশ্য, শব্দ ও অনুভূতিতে সমৃদ্ধ করেছেন মূলত গুলজার। অবিভক্ত পাঞ্জাবের আধা-শহুরে ও গ্রামীণ জীবনের ধীরস্থির ছন্দ তার লেখায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিকট অতীতে যাওয়া যাক। ২০০৭ সালে ‘‌ঝুম বরাবর ঝুম’ সিনেমার ‘‌ঝুম’ গানে লিখেছেন ‘ইয়েহি কাহি শাব কাটেঙ্গে, চিল্লাম চাটাই বাটেঙ্গে’ অর্থাৎ, এখানেই কোথাও এক চাটাইয়ে শুয়ে একসঙ্গে ধূমপান করে রাত কাটাব সবাই। পাঞ্জাবি সংস্কৃতির চাটাই পেতে শোয়া ও ভ্রাতৃত্ববোধের স্বরূপ আছে এ কথায়।

নব্বইয়ের দশক ছিল পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের জন্য অস্থির একসময়। গুলজারের পরিচালনায় ১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় মাচিস। সংগীত করেছিলেন বিশাল ভরদ্বাজ। এ সিনেমায় ‘চাপ্পা চাপ্পা’ গানে পাঞ্জাবি কথ্য শব্দে ছন্দে লেখেন, ‘অওনি পওনি ইয়ারিয়া তেরি, বওনি বওনি বেরিও তলে’; অর্থ: ছোট ছোট বের গাছের নিচে তোমার সঙ্গে ক্ষণিকের প্রেম। বিপজ্জনক এক যাত্রায় বেরিয়ে পড়া তরুণদের মুখে উচ্চারিত হয়ে তাদের ফেলে আসা সুখী ও সরল জীবনের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।

এমন বহু গানের উদাহরণ দেয়া যাবে। তার মধ্যে মণি রত্নমের ‘দিল সে’ (১৯৯৮) সিনেমায় গুলজারের লেখা অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘ছাইয়া ছাইয়া’ মূলত পাঞ্জাবি সাধক-কবি বুল্লে শাহর ‘কার থাইয়া থাইয়া, তেরা ইশক নাচায়া’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা।

চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদীর ‘পিঞ্জর’ (২০০৩) নির্মিত হয় অমৃতা প্রীতমের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে। দেশভাগের যন্ত্রণা নিজের জীবনে অনুভব করা দিনার সেই ছেলে গুলজার এ সিনেমার জন্য লিখেছেন আনন্দ প্রকাশে ‘মার উদারি’ ও বেদনা প্রকাশে ‘ভাটনা ভে’, ‘দারদা মারে’ ও ‘হাত ছুটে’। পাঞ্জাবি লোকগানের অনুপ্রেরণায় তৈরি মার উদারি—প্রকৃতি, প্রেম ও বন্ধুত্বের উদযাপন।

সিনেমার প্রয়োজনে গীতিকারদের নানা ধরনের গান লিখতে হয়। গুলজারও লিখেছেন। কিন্তু সেইসব গানেও রেখেছেন নিজস্ব সিগনেচার। ‘‌বিড়ি জ্বালাইলে’র মতো লিরিকেও ‘‌লিহাফ’ ও ‘‌গিলাফ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন। উর্দু বা পাঞ্জাবি শব্দ আগে থেকেই অনেক গীতিকার ব্যবহার করেন, তবে পাঞ্জাবি শেকড় সবচেয়ে বেশি আছে গুলজারের গীতিতেই। তিনি পাঞ্জাবের কথ্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুর ব্যবহার করেছেন লোকজ গানের। সংস্কৃতির ছাপও আছে। এক্ষেত্রে ‘ঝুম’-এর গীতিতে আরেকবার চোখ রাখা যায়। গানটি পাঞ্জাবের উৎসব, সংস্কৃতি ও বেপরোয়া উদযাপনের কথাও বলে। ‘মাক্কে কি রোটি দূর রাখকে, মিসরি সে মিঠে লাব চাখকে, তান্দুর জ্বালাকে ঝুম ঝুম, মকাইয়ের রুটি সরিয়ে রেখে, মিছরির মতো মিষ্টি ঠোঁট চেখে তন্দুর জ্বালিয়ে নাচো। গোটা পাঞ্জাবই যেন নেচে ওঠে এ গীতিতে।

আরও