অর্ধেক নয়, যে গল্প নারীর পূর্ণাঙ্গ রূপের

‘অর্ধাঙ্গিনী’র (২০২৩) তিন বছর পর মূল গল্পের প্রত্যক্ষ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলী নিয়ে এসেছেন ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’। সুতরাং এটি কোনো পৃথক বা স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র নয়। আগের সিনেমায় গল্প যেখানে থেমেছিল, সেখান থেকেই শুরু হয়। তার এগিয়ে যায় নিজস্ব নিয়মে। তিন বছরের বিরতিতে খেই হারায় না

‘তুই যেই অফিসে এখন চাকরি করিস, সেখানকার ভলান্টারি রিটায়ারমেন্টের কর্মচারী আমি। তোর যে ভোগান্তিটা হচ্ছে এটা তোর মাইনে। আর আমার এই অপমান-অস্বস্তি আমার পেনশন।’

জীবনের এই জটিল, বন্ধুর পথ একা পেরিয়ে যাবো—এমন কথা আমরা কেউই সহজে ভাবিনা; অন্তত যতক্ষণ পাশে ভরসার কাঁধ থাকে। কিন্তু কখনো সেই কাঁধ থাকার পরও সরে যায়। তখন সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। আর আচমকা ঝড়ে যার ১৭ বছরের সংসার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ে, তার অপমান আসমান সমান। শুভ্রার কথা মনে পড়ে? যার ঘর পুড়ে গেছে অকাল অনলে।

‘অর্ধাঙ্গিনী’র (২০২৩) তিন বছর পর মূল গল্পের প্রত্যক্ষ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলী নিয়ে এসেছেন ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’। সুতরাং এটি কোনো পৃথক বা স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র নয়। আগের সিনেমায় গল্প যেখানে থেমেছিল, সেখান থেকেই শুরু হয়। তার এগিয়ে যায় নিজস্ব নিয়মে। তিন বছরের বিরতিতে খেই হারায় না।

সিক্যুয়েলে সম্পূর্ণ নতুন কোনো দ্বন্দ্ব তুলে ধরার পরিবর্তে শুভ্রা (চূর্ণী গাঙ্গুলী), মেঘনা (জয়া আহসান) ও সুমন (কৌশিক সেন)—এই তিন চরিত্রের বয়ে বেড়ানো পুরনো আবেগের বোঝাই নতুন করে উঠে এসেছে। এর সঙ্গে তাদের ভঙ্গুর সম্পর্কের মধ্যে যোগ হয়েছে নতুন কিছু জটিলতা।

সিনেমার দৃশ্যে কৌশিক সেন ও চূর্ণী গাঙ্গুলি

মাঝের দশ বছরে সুমন ও মেঘনার সংসার যখন কেবল গুছিয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই এক অপ্রিয় সত্য সামনে এসে দাঁড়ায়। মেঘনা জানতে পারে সে সন্তানসম্ভবা। কিন্তু সমস্যা হলো, সে জানে যে শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সুমনের পক্ষে বাবা হওয়া অসম্ভব। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুমনের মনে সন্দেহের বীজ দানা বাঁধে এবং মেঘনার প্রাক্তন প্রেমিক রঞ্জনের (ইন্দ্রাশীষ রায়) দিকে আঙ্গুল তোলে সে। মেঘনা রাগের মাথায় সুমনের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তীতে জীবনের এক কঠিন সংকটের মুখে মেঘনা আবার পাশে পায় সুমনের প্রাক্তন স্ত্রী শুভ্রাকে। অতীত আর বর্তমানের এই সংমিশ্রণে ভালোবাসা, ক্ষমা, অপরাধবোধ ও সম্পর্কের অধিকারের এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হয়।

কৌশিক গাঙ্গুলী কেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা গল্পকার, তা তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন এই সিনেমা দিয়ে। অর্ধাঙ্গিনীর গল্প ছিল জটিল, কয়েকটি স্তরে ভাগ করা। আবেগের ওঠাপড়ার ভেতর দিয়ে গল্প এগিয়েছিল। ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ সেভাবে না এগিয়ে বেশ অনুমেয় পথ অনুসরণ করেছে। চিত্রনাট্য কিছুটা লিনিয়ার। আবেগের গভীরতা থাকলেও মেলড্রামার উপাদানগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বছরের পর বছর ধরে সম্পর্কগুলো ঠিক কীভাবে বদলে গেছে তা দর্শককে স্বাভাবিকভাবে অনুধাবন করবার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয়নি, মুখের কথায় সকল অনুভূতির তর্জমা করা যায় না। কিছু আবেগীয় রূপান্তর পর্দায় আরো একটু জায়গা পেতে পারতো। তিন চরিত্রের সমীকরণগুলো প্রাসঙ্গিক হলেও গল্প বলার ধরনে মাঝে মাঝে পুনরাবৃত্তি দেখা যায়।

পোস্টারে কৌশিক গাঙ্গুলি ও কৌশিক সেন

গল্পের চেয়ে অনেক সময় অভিনয়, একজন অভিনেতার পারফরম্যান্স বড় হয়ে ওঠে। ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ দেখার মতো যদি একটিমাত্র কারণ থেকে থাকে, তবে তা চূর্ণী গাঙ্গুলী। শুভ্রা চরিত্রে তিনি আবারো সেরা অভিনয় উপহার দিয়েছেন। এমন একজন নারী যিনি জীবনে হতাশা সহ্য করেছেন কিন্তু নিজের আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। চরিত্রের যেমন, অভিনয়েও প্রকাশ পেয়েছে তার অসাধারণ সংযম। এমনকি চিত্রনাট্য যেখানে থমকে গেছে, সেখানে চূর্ণী জাগিয়ে রাখলেন।

এদিকে সিনেমাটি দর্শককে দেখায়, সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয়,যখন কাছাকাছি থেকেও হৃদয়ের সংযোগ হারিয়ে যায়। শারীরিক দূরত্ব নয়, মানসিক দূরত্বই হয়তো নিঃস্ব করে দেয়। শুভ্রা যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়—একজন নারী নিজের পূর্ণতা নিয়ে বাঁচতে পারেন। পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে কারো অর্ধাঙ্গিনী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। সংসার, সন্তান বা দাম্পত্য—সবই জীবনের অংশ হতে পারে কিন্তু নিজের আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তির চেয়ে বড় কিছু নেই।

মেঘনা চরিত্রে জয়া আহসান ছিলেন অনবদ্য। একদিকে ভালোবাসা, অপরাধবোধ অন্যদিকে মানসিক বিভ্রান্তি এবং নিরাপত্তাহীনতার মাঝে কোণঠাসা হয়ে আটকে থাকা এক নারীকে তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। চিত্রনাট্যে কিছু জায়গায় মেঘনার চরিত্রায়ন একটু বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। তা সত্ত্বেও আবেগের জায়গায় জয়ার কাজ প্রশংসনীয়। তবে মেঘনা চরিত্রটি সবচেয়ে বাস্তব। তিনি নিখুঁত নন, আবার সম্পূর্ণ ভুলও নন। নিরাপত্তার জন্য যে বারবার কারো না কারো ওপর নির্ভর করতে চেয়েছে। আর এখানেই বোঝা যায়—সব মানুষের শক্তি ও দুর্বলতা এক নয়।

সুমন চ্যাটার্জির চরিত্র কৌশিক সেনের থেকে কেউ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারত বলে মনে হয় না। নিজের মিথ্যে পুরুষত্বের জালে জড়িয়ে সর্বহারা হওয়ার যন্ত্রণা, অভিব্যক্তি এত সাবলীলভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন যে দর্শক তার প্রতি ঘৃণার থেকে বেশি অসহায়তা অনুভব করেছে। তিনি সুমনকে পুরোপুরি খলনায়ক বানিয়ে ফেলাটাকে সতর্কভাবে এড়িয়ে চরিত্রের ত্রুটি আর দুর্বলতাগুলোকে পাশাপাশি রাখলেন। সুমনের ভেতরের লুকিয়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিক অহং এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে কোনো রূপক দিয়েই ঠিক প্রকাশ করা যায় না । সুমনের অহংকারী, ম্যানিপুলেটিভ অথচ অসহায় চরিত্রটিতে তিনি এমনভাবে প্রাণ সঞ্চার করেছেন যে একইসঙ্গে ক্রোধ, বিরক্তি এবং ঘৃণা জাগে।

চূর্ণী এবং কৌশিককে তাদের চরিত্রে এভাবে অভিনয় করতে দেখে মনে পড়ে যায়, ২০০৫ সালে কৌশিক গাঙ্গুলী পরিচালিত তাদের প্রথম ছবি ‘শূন্য এ বুকে’র পর আজ তারা দুজন কতটা পথ পেরিয়ে এসেছেন। এ যেন রিল লাইফে আরেকটি রিল লাইফের পরিণতি।

বাংলাদেশ থেকে আসা মেঘনার বন্ধু রঞ্জন চরিত্রে অভিনয় করা ইন্দ্রাশীষ রায়কে দেখতে একদম শান্ত-সংযত ভদ্রলোকের মতো লেগেছে। অম্বারীশ ভট্টাচার্য পর্দায় অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যেই নিজের অভিনয়ের ছাপ রেখেছেন। লিলি চক্রবর্তী হলেন সেই মা, যিনি তার বৌমা এবং ভুলপথে যাওয়া ছেলের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে কোথাও আটকে পড়েছেন।

কৌশিক গাঙ্গুলি, চূর্ণী গাঙ্গুলি ও লিলি চক্রবর্তী

অনুপম রায়ের সুরে ইমন চক্রবর্তী এবং লগ্নজিতা চক্রবর্তীর কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো সম্পর্কের নানা উত্থান-পতনের কথা বলে গেল।

প্রথম সিনেমাটির মতোই ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ নারীর পরিচয়, বিবাহে তার এজেন্সি এবং সম্পর্কে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ সিনেমা ‘অর্ধাঙ্গিনী’ বা ‘অর্ধেক’ শব্দে নারীকে সীমাবদ্ধ করে ফেলার প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। আর তাই কোথাও গিয়ে শুভ্রা ও মেঘনা এক হয়ে যায়। কখনো পিতৃতন্ত্র আর মেইল টক্সিক ইগোর বলিদান হওয়া শুভ্রা তিরস্কার করে জানায়,

‘যুগে যুগে মেয়েদের যত্ন করে কেটে কেটে অর্ধেক করে অর্ধাঙ্গিনীর সম্মান দিয়েছে সমাজ। বিয়ের পর তোমার পদবী, তোমার পরিচয়, তোমাদের বাড়িতে এসে থাকা। জন্ম থেকে বিয়ে অবধি ২১-২২ বছরকে প্রায় অস্বীকার করে অর্ধেক হয়ে বাঁচার যে চুক্তি, যার নাম বিয়ে।’

কখনো মেঘনার দুর্দিনে শুভ্রা আবারও বলে ওঠে, ‘নারী নাকি অর্ধাঙ্গিনী, মানে আমরা মেয়েরা সবাই নাকি অর্ধেক। চল দেখি, এই দুই অর্ধেক জুড়ে একটা সম্পূর্ণ নারী হওয়া যায় কিনা!’

কে কার প্রাক্তন, কে বর্তমান, কে অর্ধেক আর অর্ধাঙ্গিনী—সে ভাবনার বাইরে গিয়ে শুভ্রা কিংবা মেঘনা চায় একলা একটা আকাশ। তারা নিজেদের শেষ স্বাধীনতাটুকু আর কোনো পুরুষের হাতে তুলে দিতে চায়না। নিজের ঘরে নিজের জীবনে হয়তো ওরাও চায় পরিপূর্ণ হতে, পূর্ণাঙ্গিনী হতে।

আরও