দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ভক্ত বেড়েই চলেছে। গত কয়েক বছরে দক্ষিণের বেশকিছু সিনেমা ব্লকবাস্টার হিট করার পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও পেয়েছে। ভারত পেরিয়ে বাংলাদেশেও রয়েছে তামিল, তেলেগু সিনেমার ভক্তরা। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের ভক্তি মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং তারা কোনো যুক্তির ধার ধারেন না। দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব অনেক। এদিকে খোদ দক্ষিণ ভারতেই দক্ষিণের সিনেমা নিয়ে রয়েছে ভক্তদের নানা ধরনের উন্মাদনা। ফলে ঘটেছে বেশকিছু অপ্রীতিকর ঘটনা।
গত জানুয়ারিতে অজিত কুমারের ‘থুনিভু’র মুক্তিকে কেন্দ্র করে তার এক ভক্ত লরির ওপর উঠে নাচতে শুরু করে। চলন্ত লড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৯ বছর বয়সী ভরক কুমারের, মারা যায় সে। ২০২০ সালের এপ্রিলে ‘রজনীকান্ত বড় না বিজয় (থালাপতি) বড়’ এ নিয়ে মারামারিতে বিজয়ের ভক্ত মারা যায়। একই বছর সেপ্টেম্বরে পবন কল্যাণের তিন ভক্ত তার ব্যানার টাঙাতে গিয়ে তড়িতাহত হয়ে মারা যায়। এমন ঘটনা নতুন তো নয়ই, এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এমন আরো ঘটনা পাওয়া যাবে। এর বাইরে সম্প্রতি বলিউডের ‘পড়তি দশা’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিক্ততা (টক্সিসিটি) ছড়িয়ে থাকেন তারা। উন্মত্ত আচরণে এগিয়ে আছে মূলত তামিল সিনেমার ভক্তরা। এ নিয়ে চিন্তিত তারকা, সিনেমা বিশেষজ্ঞরাও।
তামিল সিনেমার অন্যতম সমালোচক চারু নিবেদিতা। তিনি সবসময়ই সোজাসুজি কথা বলে থাকেন। এ বিষয়ে চারু বলেন, ‘এখানে (তামিলনাড়ু) এ রকমই হবে। বেরেনোর কোনো উপায় নেই।’ তামিল সিনেমার ভক্তদের এ ধরনের আচরণ অনেক পুরনো। সে সূত্র ধরেই তিনি এ কথা বলেছেন। তার মতে, সিনেমা নিয়ে মাতামাতি করে এখানকার মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। মূলত তাদের অনেকেরই করার কিছু নেই। চারু বলেন, ‘আমরা মানুষেরা নানা সময়ই আলস্যে বিরক্ত হয়ে যাই। আমার মতে, সে জায়গায় স্বস্তি দিতে পারে সাহিত্য। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে জায়গাটা নিয়েছে সিনেমা। আমাদের তরুণদের কিছু একটা নিয়ে মেতে থাকতে হবে। তারা সিনেমা নিয়ে মাতামাতি করে।’
সিনেমা নিয়ে আগ্রহ থাকা খারাপ কিছু নয়, কিন্তু সেটাকে সহিংসতায় নিয়ে যাওয়ায় চারুর আপত্তি। তিনি সরাসরিই বলেন, ‘এ তথাকথিত ভক্তরা অন্য সবকিছুর ওপরে নিয়ে যায় সিনেমাকে। এক্ষেত্রে সংস্কৃতি পরিবর্তন ও অশিক্ষার প্রভাব আছে বলেও তিনি মনে করেন। পোনিয়িন সেলভানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আমাদের একসময় কল্কির মতো লেখক ছিল। আর এখন আমরা রিল বানানো প্রজন্ম দেখছি। তারা সিনেমার বাইরে কিছু ভাবতে পারে না।’ ভক্তরা সিনেমার নায়কদের বসিয়ে দেয় দেবতার আসনে। রজনীকান্ত, বিজয়, পবন কল্যাণদের ঘিরে গড়ে উঠেছে অদ্ভুত এক ভক্তিবাদ। কোনো কোনো জায়গায় তাদের পূজাও করা হয়।
চেন্নাইয়ের ডা. মিনি রাও বহুদিন ধরে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি প্র্যাকটিস করছেন। এ বিষয়ও তিনি লক্ষ করেছেন। তার পর্যবেক্ষণ থেকে বলেন, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দেখে অন্ধভাবে তাদের অনুসরণ করা এক ধরনের অসুস্থ চর্চা। মূলত তারা অনুসরণ করার মতো একটি মানুষ, চরিত্র খোঁজে সবসময়। কিন্তু সমস্যা হলো শেষ পর্যন্ত তারা ভুল বাছাই করে। কারো জন্য একজন নায়ক ফিটনেস বা কাজের জন্য আদর্শ হতে পারে, কিন্তু তার জন্য লরির ওপর উঠে নিজেকে বিপদের মধ্যে ফেলা বোকামি।’ মিনি আরো জানান, এক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্বও একটি কারণ।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ‘ফ্যানডম’কে আরো বিষাক্ত করে তুলছে বলে মনে করেন নির্মাতা সিএস আমুধান। তিনি বলেন, ‘একটা সময় ভক্ত হওয়ার ব্যাপারটা ব্যক্তিগত ছিল। তখন ভক্তরা পোস্টার সংগ্রহ করত, কখনো পোশাকে বা চলনে অনুসরণ করত স্টারকে। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে একটা সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে, যারা নিজেদের জাহির করতে চায়। বিষয়টি অনেক সময়ই ভিন্ন ভিন্ন তারকার ভক্তদের মধ্যে তিক্ততা বাড়ায়।’ অবশ্য একটি বিষয় এরা কেউ উল্লেখ করেননি। মূলধারার তামিল সিনেমার সব নায়কই কমবেশি মারদাঙ্গা। তারা এক ঘুষিতে দশজনকে উড়িয়ে দেন। তামিল সিনেমার ভক্তরাও মনে করে তারাও অন্য ইন্ডাস্ট্রি, অন্য তারকাদের উড়িয়ে দেবে। এ বিষাক্ত ভক্তি থেকে তামিল সিনেমা ও ভক্তদের বের করে আনার কাজটি তারকারাই করতে পারেন কেবল। তামিল সিনেমার বহু তারকাই সামাজিক নানা উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তাই ভক্তদের বিষাক্ত আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করার কাজটিও তাদেরই শুরু করা উচিত।
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান