মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর মুকুট জিতেছেন মডেল ও অভিনেত্রী সামিরা খান মাহি। এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন তিনি। ২৪ নভেম্বর ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চল পুয়ের্তো রিকোতে বসবে মিস ইউনিভার্সের ৭৫তম আসর। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়বেন সামিরা। মিস ইউনিভার্সের যাত্রা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এ অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান
মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশের মুকুট জয় করলেন। এ মুহূর্তে আপনার অনুভূতি কেমন?
সত্যি বলতে, অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এটা শুধু একটা মুকুট পাওয়ার আনন্দ নয়, বরং বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার মতো একটি বড় দায়িত্ব। আমি অনেক কৃতজ্ঞ এবং ভীষণ অনুপ্রাণিত। আমার বিশ্বাস, এ অর্জন আমার জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু।
এ অর্জনের পেছনে আপনার সবচেয়ে বড় ত্যাগ কোনটি ছিল?
আমার সবচেয়ে বড় ত্যাগ ছিল নিজের সময়, স্বাচ্ছন্দ্য এবং অনেক ব্যক্তিগত বিষয়কে পেছনে রেখে এ লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেয়া। একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমার কাজ, ব্যক্তিগত জীবন এবং মিস ইউনিভার্সের জন্য প্রস্তুতি—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ ছিল না। আমার বিশ্বাস, বড় কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে হলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়।
এ স্বপ্নপূরণের যাত্রায় কখনো কি এমন সময় এসেছে, যখন মনে হয়েছে আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়?
অবশ্যই এসেছে। জীবনে এমন সময় সবারই আসে, যখন নিজের ওপর সন্দেহ তৈরি হয়। আমারও হয়েছে। কিন্তু আমি কখনো হাল ছেড়ে দিতে চাইনি। আমি সবসময় নিজেকে একটা কথা বলেছি—আমি যদি নিজের স্বপ্নের প্রতি সৎ থাকি, তাহলে একদিন না একদিন ঠিকই সফল হব। আমার পরিবার, কাছের সব মানুষের ভালোবাসা এবং আত্মবিশ্বাস আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় আপনার কোন বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্য আপনাকে মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশের মুকুট এনে দিয়েছে বলে মনে করেন?
আমি অন্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে চাই না। প্রত্যেকেরই নিজস্ব সৌন্দর্য, যোগ্যতা ও গল্প রয়েছে। আমি মনে করি, আমার আত্মবিশ্বাস, বাস্তব অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা এবং নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করার আন্তরিক ইচ্ছা আমাকে আলাদা করেছে। আমি সবসময় নিজের মতো থাকতে পছন্দ করি। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের পরিচয় ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
অভিনয় ও মডেলিংয়ের অভিজ্ঞতা মিস ইউনিভার্সের আন্তর্জাতিক মঞ্চে আপনাকে কতটা এগিয়ে রাখবে?
অভিনয় ও মডেলিং আমাকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেকে উপস্থাপন করতে শিখিয়েছে। একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমি অনেক ধরনের চরিত্রে কাজ করেছি, অনেক মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতা কাছ থেকে বোঝার সুযোগ পেয়েছি। আমার মনে হয়, এ অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাকে অবশ্যই সাহায্য করবে। মিস ইউনিভার্স শুধু সৌন্দর্য বা পারফরম্যান্সের জায়গা নয়, এখানে চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্বও তুলে ধরতে হয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য আপনার প্রস্তুতি কীভাবে এগোচ্ছে?
প্রস্তুতি চলছে বেশ কয়েকটি দিক থেকে। ফিটনেস, গ্রুমিং, কমিউনিকেশন স্কিল, পাবলিক স্পিকিং ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও আমাদের দেশের ইতিবাচক দিকগুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা যায়, সেটিও নিয়ে কাজ করছি। আমি শুধু একজন প্রতিযোগী হিসেবে নয়, একজন আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশী নারী হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে উপস্থাপন করতে চাই।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে আপনার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি বলে মনে হচ্ছে?
আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিভিন্ন দেশের মেধাবী নারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা এবং একই সঙ্গে নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখা। ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তাভাবনার ভিন্নতা থাকবে। আমি এটাকে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি শেখার একটি বড় সুযোগ হিসেবেও দেখছি। আমি চাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে, যেন মানুষ আমাদের দেশকে নতুনভাবে জানতে পারে।
আপনার দৃষ্টিতে একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য কোন বিষয়টির মধ্যে নিহিত?
আমার কাছে একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য তার আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাভাবনার মধ্যে নিহিত। বাহ্যিক সৌন্দর্য অবশ্যই একজন মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ, কিন্তু সেটাই সবকিছু নয়। একজন নারী কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন, কীভাবে অন্যকে সম্মান করেন এবং নিজের অবস্থান থেকে সমাজে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন, সেটাই তাকে সত্যিকারের সুন্দর করে তোলে। আমি বিশ্বাস করি, সৌন্দর্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সঙ্গে বুদ্ধিমত্তা, মানবিকতা ও আত্মসম্মান যুক্ত হয়।
বাংলাদেশের সুন্দরী প্রতিযোগিতার বর্তমান অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সাফল্যের সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?
আমি মনে করি, বাংলাদেশে সুন্দরী প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আমাদের দেশে অসাধারণ মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিভাবান নারী রয়েছেন। প্রয়োজন শুধু সঠিক সুযোগ, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিক সহযোগিতা। আমি চাই, মিস ইউনিভার্সের মতো আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠুক। আমরা যেন শুধু অংশগ্রহণই না করি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতা ও সক্ষমতা দিয়ে বাংলাদেশের জন্য সাফল্য নিয়ে আসতে পারি।
বাংলাদেশের কোন সামাজিক সমস্যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরতে চান এবং কেন?
আমি বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন ও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনসংগ্রামকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরতে চাই। আমাদের দেশে প্রতি বছর বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং শিক্ষার সুযোগ হারায়। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আছি। আমার Beyond the Crown উদ্যোগের মাধ্যমে আমি এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টিকে আরো বড় পরিসরে তুলে ধরতে চাই। আমার কাছে মুকুটের প্রকৃত অর্থ হলো মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা।