মহেশ মাঞ্জরেকরের ‘নটসম্রাট’-এর শেষ দিকের দৃশ্যগুলো মনে পড়ছে। জীবনভর অন্যের লেখা সংলাপ আউড়ে গেছেন মঞ্চের কিংবদন্তি অভিনেতা গণপত বেলওয়ালকর। অন্যের লেখা চরিত্রে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। একসময় নিজের জীবনেই যেন এক চরিত্র হয়ে দাঁড়ান। আনন্দ, অহংকার, প্রেম, অভিমান, পরাজয়, নিঃসঙ্গতা সবকিছু মিলিয়ে মানুষটির ভেতরে তখন যে শূন্যতা, সেটিও যেন অভিনয়ের অংশ হয়ে ওঠে। সেই চরিত্রে নানা পাটেকরকে দেখলে মনে হয়, তিনি অভিনয় করছেন না; তিনি যেন গণপত বেলওয়ালকর হয়ে বেঁচে আছেন।
‘নটসম্রাট’ ছিল নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের এক চূড়ান্ত প্রকাশ। অথচ তার প্রায় পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এ একটি চরিত্র দিয়েই তাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। নানা পাটেকর এমন এক অভিনেতা ছিলেন, যাকে নির্দিষ্ট একটি ঘরানায়, একই ধরনের চরিত্র, এমনকি নির্দিষ্ট একটি ভাষার সিনেমায়ও আটকে রাখা যায়নি। তিনি ছিলেন সত্যিকারের ‘ভার্সেটাইল অভিনেতা’। ৭৫ বছর বয়সে আজ তার মৃত্যু ভারতীয় সিনেমার এমন এক অধ্যায়ের সমাপ্তি, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অভিনয়; তারকা হওয়া নয়।
নানা পাটেকর শুরু করেছিলেন থিয়েটার দিয়ে। বড় পর্দায় অভিষেক ‘গমন’ সিনেমায়, ১৯৭৮ সালে। কিন্তু পর্দায় আসার আগেই মঞ্চ তাকে শিখিয়েছিল অভিনেতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ—অভিনেতা চরিত্রকে শুধু উপস্থাপন করেন না, তিনিই হয়ে ওঠেন ওই চরিত্র। এ শিক্ষা পরবর্তী পাঁচ দশক ধরে তার অভিনয়ের ভিত হয়ে থেকেছে।
মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’ (১৯৮৮)। নানা পাটেকরের উপস্থিতি ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্মরণীয়। ১৯৮৯ সালে বিদু বিনোদ চোপড়ার ‘পরিন্দা’ তাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করে। আন্না ছিল অন্ধকার জগতের এক নিষ্ঠুর অপরাধী। এ চরিত্রকে নানা এমন ভীতিকর করে তুলেছিলেন, যা কেবল সংলাপে তৈরি হয় না। তার চোখ, শরীরী ভাষা, থেমে থেমে কথা বলা, সব মিলিয়ে আন্না হয়ে উঠেছিল ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় খলচরিত্র। এ অভিনয়ের জন্যই তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
কিন্তু নানা পাটেকরের বিশেষত্ব ছিল, তিনি কখনই ‘ভিলেন’ হয়ে আটকে থাকেননি। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ একটি উদাহরণ। নানা একই সঙ্গে চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা। একজন সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে তার কঠোরতা ছিল বিশ্বাসযোগ্য। আবার সে কঠোরতার আড়ালে মানবিকতাও ছিল স্পষ্ট। তার অভিনীত চরিত্রগুলোয় প্রায়ই এ দ্বন্দ্ব দেখা যেত—বাইরে শক্ত, ভেতরে ক্ষতবিক্ষত।
‘ক্রান্তিবীর’ তার ক্যারিয়ারের আরেক মাইলফলক। ১৯৯৪ সালের সিনেমাটিতে প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে নানা পাটেকর শুধু অভিনয় করেননি; যেন পুরো সময়টাকেই নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। তার কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ভঙ্গি, ক্রোধ মিলিয়ে চরিত্রটি সে সময়ের ভারতীয় দর্শকের কাছে এক ধরনের সামাজিক ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এখনো দর্শক এ সিনেমার নানাকে প্রশংসা করে। এ সিনেমার জন্য আবারো পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
তারপর ‘অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৯৬)। আবার জাতীয় পুরস্কার। এরপর ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘যশবন্ত’, ‘আভ তক ছাপ্পান’, ‘অপরাধ’, ‘রাজনীতি’—প্রতিটি সিনেমায় নিজেকে ভেঙেছেন, তৈরি করেছেন। প্রমাণ করেছেন, একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার মুখ নয়, তার উপস্থিতি। একটি দৃশ্যে তিনি থাকলে দৃশ্যটির ভার বদলে যেত।
বলিউডে দীর্ঘ সময় প্রথাগত সুন্দর চেহারার নায়করা সিনেমার কেন্দ্র ধরে রাখতেন। নানা প্রমাণ করেন একজন চরিত্রাভিনেতাও একটি সিনেমার কেন্দ্র হতে পারেন। এমনকি অনেক সময় চরিত্রাভিনেতাই হয়ে উঠতে পারেন সিনেমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। সে কারণেই কমেডি চরিত্রে ওয়েলকামের উদয় শেঠি দর্শকের কাছে কমেডিয়ান নন, অভিনেতা।
নানা পাটেকরের অভিনয়ের আরেকটি বিস্ময়কর দিক ছিল তার কণ্ঠ। তার সংলাপ উচ্চারণে একটা খসখসে স্বর, একটা অস্থিরতা, কখনো বিস্ফোরণের আগে জমে থাকা নীরবতা কাজ করত। তিনি চিৎকার করলেও তা শুধু চিৎকার হয়ে থাকত না; মনে হতো সে কণ্ঠের ভেতরে বহু বছরের ক্ষোভ, অপমান, বেদনা জমে আছে। আবার সে একই মানুষ ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠি হয়ে দর্শককে হাসিয়েছেন।
‘নটসম্রাট’-এর উদাহরণ আবারো ফিরে আসে। মারাঠি সাহিত্যের কিংবদন্তি চরিত্র গণপত বেলওয়ালকর। কুসুমাগ্রজ ছদ্মনামে ‘নটসম্রাট’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন বিষ্ণুবর্মণ সিরওয়াড়কর। বেলওয়ালকরের চরিত্রটি যাপন করেছিলেন নানা। এ সিনেমায় এ চরিত্র অভিনয় নানার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের এক পরিণত মুহূর্ত। এখানে আর সেই ক্রুদ্ধ নানা নেই, নেই ‘পরিন্দা’র আন্না, নেই ‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতাপ। আছেন এক বৃদ্ধ অভিনেতা। যিনি সারা জীবন অন্যের জীবন অভিনয় করেছেন, কিন্তু শেষ বয়সে নিজের জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায়। চরিত্রটির নিঃসঙ্গতা, আত্মমর্যাদা ও ভাঙনের মধ্যে নানা নিজের অভিনয়জীবনেরও যেন একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছিলেন।
তার অভিনয়ের এ বিস্তৃতিই ভারতীয় সিনেমায় নানা পাটেকরের প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তিনি দেখিয়েছেন, অভিনয় মানে নায়ক হওয়া নয়। একজন অভিনেতা তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, কণ্ঠ, শরীর ও অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি চরিত্রকে এমনভাবে নির্মাণ করতে পারেন যে চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত অভিনেতাকেও ছাড়িয়ে যায়। হিন্দি মূলধারার সিনেমা ও প্যারালাল সিনেমায় তিনি সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন।
নানা ঝুঁকি নেয়ার সাহস দেখিয়েছেন। পরিচালকের ভূমিকায়ও তিনি কাজ করেছেন। ‘প্রহার’-এর মতো ছবিতে তিনি যুদ্ধ, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বের প্রশ্নকে নিজের মতো করে দেখেছেন। আবার পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক সিনেমায় এসে এমন চরিত্র করেছেন, যেগুলো দর্শককে নিছক বিনোদন দিয়েছে। একই অভিনেতার মধ্যে এতগুলো বিপরীত সত্তার সহাবস্থান খুব বেশি দেখা যায় না।
পর্দার বাইরে নানা পাটেকরের জীবনও তার অভিনয়ের মতোই সরল কোনো রেখায় এগোয়নি। ২০১৫ সালে মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি নাম ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষক ও তাদের পরিবারকে সহায়তা, জলসংরক্ষণ এবং গ্রামীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়ে ওঠে এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। নিজের জনপ্রিয়তাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন এমন মানুষের জন্য, যাদের কাছে সিনেমাও পৌঁছায় না। কার্গিল যুদ্ধের সময়ও তিনি সেনাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। সমাজ, কৃষক, সৈনিক; বিভিন্ন বাস্তবতার সঙ্গে তার এক ধরনের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা পাটেকরকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হবে অভিনেতা হিসেবেই। এমন একজন অভিনেতা হিসেবে, যিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে অভিনয়কে আর অভিনয় বলে মনে হতে দিতেন না। সব সত্য বলে মনে হতো।
একবার নানা বলেছিলেন, শিল্পীর জীবন অনেকটা মঞ্চের সামনে থাকা অন্ধকারের মতো। সে অন্ধকারের মধ্যেই শিল্পীকে নিজের আনন্দ খুঁজে নিতে হয়। আর দর্শকের হাততালির শব্দ একসময় নেশায় পরিণত হয়। যতদিন সে শব্দ থাকে, শিল্পী বেঁচে থাকেন।
আজ নানা পাটেকর নেই। কিন্তু সে হাততালির শব্দ থামেনি। তিনি সত্যিকারের নটসম্রাট।