গান শোনার মাধ্যম বদলানোর সঙ্গে বদলে গেছে গান জনপ্রিয় হওয়ার হিসাবও। একসময় একটি গান কত মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, রেডিওতে কতবার বেজেছে কিংবা কত ক্যাসেট বিক্রি হয়েছে, সেসব ছিল জনপ্রিয়তার বড় মাপকাঠি। এখন সে হিসাবের বড় একটি অংশ পাওয়া যায় ইউটিউবের ভিউয়ে।
একসময় একটি গান এক কোটি ভিউ পেলেই সেটিকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হতো। এখন ১০-৪০ কোটির বেশি ভিউ পাচ্ছে বাংলাদেশের গান। তবে প্রশ্ন উঠছে, বেশি ভিউ পাওয়া কি একটি গান ভালো বা জনপ্রিয় হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ?
গীতিকার রবিউল ইসলাম জীবন মনে করেন, বিষয়টি এত সরল নয়। ভিউ ও গানের বাজার বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। তিনি বলেন, ‘বেশি ভিউ পাওয়া মানেই একটি গান ভালো বা জনপ্রিয়, এমন নয়। একটি ভালো গান কম ভিউ পেতে পারে, আবার কোনো গান খুব ভালো না হলেও নানা কারণে তার ভিউ বেশি হতে পারে। একটি গানের মান, গভীরতা, আবেদন ও ওজন আলাদা বিষয়। ভালো গান কম ভিউ পেলেও ভালো গানই থাকে।’
তাহলে কি বেশি ভিউ পাওয়া গানে কিছুই নেই বা কেন ভিউ পায়? এ নিয়ে জীবন বলেন, ‘কোনো গান বেশি ভিউ পেলে তার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো এক্স-ফ্যাক্টর থাকে, যার কারণে মানুষ সেটি বারবার শুনছে। কখনো গানের বিষয়, সুর, বিশেষ কোনো সময় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কারণেও একটি গান জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।’
কিন্তু বাজারে এখন ভিউই প্রভাব ফেলছে। ইউটিউব এখন গান শোনা ও শ্রোতাদের কাছে গান পৌঁছনোর মাধ্যম। যে গানের ভিউ বেশি হয়, সে ভিউ ধরে গানের বিপরীতে আসে অর্থ। জনপ্রিয় হন শিল্পীও। সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদের মতে, ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার আগেও কিছু ধারার গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের দশক কিংবা দুই হাজার দশকেও অনেক লোকসংগীতশিল্পীর গান ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। তখন কে কতবার একটি গান শুনছেন বা দেখছেন, তা ডিজিটালি গণনার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখন ইউটিউব, রিলস ও নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটি সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ জনপ্রিয়তার প্রবণতা আগেও ছিল, এখন শুধু তা নথিভুক্ত হচ্ছে।’
আগে একটি গানের জনপ্রিয়তা বোঝা যেত মানুষের মুখে মুখে ফেরার মধ্য দিয়ে, রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারের মাধ্যমে কিংবা ক্যাসেট বিক্রির হিসাব থেকে। এখন সে জায়গায় যুক্ত হয়েছে ভিউ, শেয়ার, রিলস ও অন্যান্য ডিজিটাল পরিসংখ্যান। ফলে একটি গানের বিস্তার ও শ্রোতার আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং দৃশ্যমানভাবে বোঝা যাচ্ছে।
আবার গানের ভিউ হওয়ার ক্ষেত্রে তারকাদের প্রভাবও থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে গানের জনপ্রিয়তার সঙ্গে জোরালোভাবে যুক্ত হয়েছে সিনেমা ও তারকাখ্যাতি। ‘তুফান’ সিনেমার ‘লাগে উরা ধুরা’ গানে শাকিব খান ও মিমি চক্রবর্তীর উপস্থিতি শুরুতেই দর্শকের আগ্রহ তৈরি করে। কিন্তু গানটি শুধু সিনেমার প্রচারণার অংশ হয়ে থাকেনি। প্রকাশের পর নিজস্ব জনপ্রিয়তাও তৈরি করে। মাত্র দুই মাসে চরকির ইউটিউব চ্যানেলে গানটি ১০ কোটি ভিউ পার করে।
ভিউ নিয়ে নানা মতের ক্ষেত্রে আসে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকের প্রসঙ্গ। বাংলা গানের কোটি কোটি ভিউ পাওয়াকে ইতিবাচক বা নেতিবাচক—কোনোটিকেই সরলভাবে দেখার পক্ষপাতী নন হাবিব ওয়াহিদ। তার মতে, বিষয়টি প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে। এসব মূলত বাণিজ্যিক ও বিশুদ্ধ বিনোদনের কনটেন্ট। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের দিকই থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যিক কনটেন্টের ভিউয়ারশিপ আগেও ছিল। কারণ এসব কনটেন্ট মানুষকে বিনোদন দেয়। তবে সামাজিক দিক থেকে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও থাকতে পারে। মানুষ সবকিছু থেকেই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়। ব্যাপকভাবে এর প্রভাব কীভাবে পড়ছে, তা নিয়ে মন্তব্য করার মতো অবস্থানে নেই তিনি। ব্যক্তিগতভাবে একটি কনটেন্ট তাকে কতটা প্রভাবিত করছে, সেটি প্রত্যেকে নিজের মতো করে বিচার করতে পারেন।’
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ‘অপরাধী’, ‘দুষ্টু কোকিল’ ও ‘লাগে উরা ধুরা’র মতো বাংলা গান কোটি কোটি ভিউ পাওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন রবিউল ইসলাম জীবন। কারণ এগুলো বাংলা গান এবং মানুষ গানগুলো শুনেছে, উপভোগ করেছে বলেই এত ভিউ হয়েছে। ‘দুষ্টু কোকিল’ ও ‘লাগে উরা ধুরা’ মূলত বিনোদনধর্মী গান, ‘অপরাধী’ একটি আবেগনির্ভর গান।
তিনি বলেন, ‘একটি সংগীতাঙ্গনে নানা ধরনের গান থাকবে—শুধু মেলোডি, দেশাত্মবোধক, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বা উচ্চাঙ্গসংগীত নয়; বিনোদনধর্মী গানও থাকবে। তাই এসব গান দিয়ে পুরো সংগীতশিল্পের মান নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। তার কাছে সমালোচনার চেয়ে আলোচনাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ নিজের আগ্রহেই গানগুলো শুনেছে এবং বারবার শুনেছে বলেই কোটি কোটি ভিউ হয়েছে। ফলে কোনো না কোনোভাবে গানগুলো মানুষকে আনন্দ দিয়েছে, বিনোদন দিয়েছে—এটিও ইতিবাচক দিক।’