ধনীর দুলাল গাড়ি তুলে দিয়েছে ফুটপাতে। মারা গেল পথে ঘুমানো মানুষ। নেতা-ব্যবসায়ী দাদা তার নাতির জন্য নিয়োগ করলেন বড় অ্যাডভোকেট। দিল্লির সেশন কোর্টে পাবলিক প্রসিকিউটর জগদীশ ত্যাগী এক সাধারণ উকিল, তবে লড়ে গেলেন। পরের গল্প লক্ষ্ণৌয়ে। সেখানে টেরোরিস্ট ইকবাল কাদরিকে বন্দুকযুদ্ধে নিহত করে বলে পুলিশ দাবি করে। কিন্তু ইকবাল কাদরি নামে নিহত ইকবাল কাসিমের স্ত্রী দাবি করে তার স্বামী একজন সাধারণ মানুষ এবং পুলিশ তাকে বিয়ের রাতে ধরে নিয়ে যায়। ঘটনাচক্রে এ মামলা ইকবাল কাসিমের পক্ষে লড়তে যান কানপুরের জগদীশ মিশ্র। এ দুই জগদীশের ডাকনাম জলি এবং তাদের দুটি কেসেরই জজ ছিলেন সুন্দরলাল ত্রিপাঠী। ২০১৩ ও ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া জলি এলএলবি সিরিজের তৃতীয় সিনেমা জলি এলএলবি থ্রিতে এবার দুই জলিকে একত্রে দেখা গেল। নতুন একটি মামলায় জড়িত হন তারা দুজনই। কিন্তু কোর্টরুম ও কোর্টরুমের বাইরে আগের দুই পর্বে মামলা ও গল্প যেভাবে জমেছিল এবার তা জমতে জমতেও জমল না।
এবারের সিনেমার গল্পটা এক করপোরেট ডাইনোসরকে নিয়ে। হরিভাই নামের সেই ব্যবসায়ী বিকানেরকে বস্টন বানাতে চান। সে কারণে বিকানেরের কৃষকদের জমি নানাভাবে দখল করেন। ঘুস দিয়ে রাখেন ডিএম, এমপিসহ অন্যদের। ফলে কৃষক রাজারাম তার জমির দাবি নিয়ে আদালতে গেলেও তা ফিরে পান না। এরপর তার স্ত্রী জানকী দিল্লি এসে মামলা করতে যান এবং সেই মামলায় জড়ায় দুই জলি এবং এবারো জজ সুন্দরলাল ত্রিপাঠী।
২০১৩ সালে সুভাষ কাপুর যখন প্রথম জলি নিয়ে আসেন সেখানে অভিনয় করেছিলেন আরশাদ ওয়ার্সি। তার বিপরীতে ছিলেন বোমান ইরানি। সেশন কোর্টের খুবই সাধারণ একটি মামলা অসাধারণ হয়ে উঠেছিল এর বাস্তবতার কারণে। সিনেমায় জলি তার কনক্লুডিং আরগুমেন্টে বলেন, ‘কেস চলতে চলতে রাজপাল সাহেব (আসামি পক্ষের উকিল বোমান ইরানি) প্রমাণ করেছেন ফুটপাতে ল্যান্ড ক্রুজার ওঠেনি, ট্রাক উঠেছে। আর কিছুদিন গেলে তিনি প্রমাণ করে দেবেন ওটা ট্রাকও না বিমান ছিল।’ একই রকম ঘটনা ছিল দ্বিতীয় সিনেমাতেও। সেখানে জলি চরিত্রে অভিনয় করেন অক্ষয় কুমার। জজের সামনে হাত জোড় করার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ উকিলকে চড় দেয়ার দৃশ্যও আছে সে সিনেমায়। মূলত সত্য, সততা, দুর্বলের জন্য ন্যায়বিচারের মতো পরিচিত গল্পের বাইরে এসব বিষয় বিশেষ করে তুলেছিল সিনেমা দুটোকে। কিন্তু এবারের সিনেমায় তেমনটা নেই।
এবারের সিনেমায় দুই জলির মধ্যে সওয়াল জবাব দেখা যাবে এমনটাই মনে হয়েছিল। শুরুর দিকে সে রকম দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা আর থাকে না। কিন্তু যতটা তীব্র তাদের প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা ছিল তা হয় না। অন্যদিকে জলি এলএলবির আরেকটি পছন্দের জায়গা ছিল দর্শকের জন্য, এর হিউমার। সুন্দরলাল ত্রিপাঠীর মজার চরিত্র ও তার সঙ্গে উকিলদের ঘটে যাওয়া নানা বিষয় দর্শককে আমোদিত করেছে। এবার জগদীশ ত্যাগীর সঙ্গে একটা কথোপকথন সে রকম হলেও এর বাইরে তেমন কিছু ছিল না।
জলি এলএলবির প্রথম দুই সিনেমার কোনোটিরই খলচরিত্র খুব ভয়ানক না। দ্বিতীয় সিনেমা অর্থাৎ জলি এলএলবি টুতে পুলিশকে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে দেখা যায়। কিন্তু তারাও কোনো গ্যাংস্টার না কিংবা কথায় কথায় প্রতিপক্ষের ক্ষতি করার মতো কেউ না। কিন্তু দুই সিনেমাতেই তারা ক্ষমতাধর এবং ক্ষমতার সব ধরনের ব্যবহারই তারা করে। বর্তমান সিনেমায় হরিভাই বড় ব্যবসায়ী এবং নিজের অহম ধরে রাখার জন্য যেকোনো কিছুই করতে পারেন, কিন্তু এর পরও তার চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব ভয়ানক হয়ে ওঠে না। তাকে পাতি মাস্তান বা এলাকার ছোট ব্যবসায়ীই মনে হয়। গজরাজ রাওর মতো অভিনেতাকে সুভাষ কাপুর ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেননি কিংবা হরিভাইয়ের চরিত্রটি ঠিকভাবে লিখিতও হয়নি।
আরশাদ ও অক্ষয় তাদের পূর্ববর্তী দুই সিনেমার তুলনায় অনেকটাই নিষ্প্রভ। আরশাদ রীতিমতো ফ্যামিলি ম্যান এবং তিনি ঝুঁকি নিতে চান না। তবু ঝুঁকি নেন এবং মোটামুটি তিনিই মামলাটি শুরু করেন। কিন্তু এরপর কোনো অজ্ঞাত কারণে সিনেমায় স্পটলাইট পান অক্ষয়। একটি নির্দিষ্ট সময় আরশাদ স্ক্রিনেই ছিলেন না। যদিও শেষে তাকে কনক্লুডিং আরগুমেন্ট করতে দিয়ে বিষয়টি ব্যালান্স করার চেষ্টা হয়েছে। তবে তা ভালো লাগে না। অন্যদিকে সুন্দরলাল ত্রিপাঠীর চরিত্রে সৌরভ শুক্লাও আগের দুই পর্বের তুলনায় অতি সাধারণ। তার তেমন কোনো সংলাপ এবার নেই যা দর্শকের মনে থাকবে।
তবু ফ্র্যাঞ্চাইজি ও সিরিজ হিসেবে এবারের সিনেমাটি এগিয়ে গেছে এবং দর্শক গ্রহণও করেছে। আর কৃষি ও উন্নতির সম্পর্ক যে দ্বান্দ্বিক নয় এবং কৃষকের জীবন গুরুত্বপূর্ণ, সেই বার্তাটি রাখার কারণে দর্শক সিনেমাটিকে অন্য অনেক সিনেমার তুলনায় এগিয়ে রাখবেন তা বোঝা গেছে সিনেমার আয় দেখে।