ঘরভর্তি মানুষ। তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে গাইছেন সুদর্শন এক পুরুষ। দুঃখের গান—‘ইয়া দিল কি সুনো দুনিয়াওয়ালো’। ঋষিকেশ মুখার্জির ‘অনুপমা’য় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানটি ছিল ধর্মেন্দ্রর লিপে। ইউটিউবে কমেন্ট সেকশনে একজন লিখেছেন, ‘ঋষিকেশ মুখার্জির পক্ষেই ধর্মেন্দ্রকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব।’ এ কথা লেখার কারণ হলো ধর্মেন্দ্র সে সময়ই ছিলেন অ্যাকশন হিরো। এর আগে-পরে বহু সিনেমায় তাকে অ্যাকশন করতে দেখা গেছে। এমনকি এর আগে-পরেও তিনি অ্যাকশন সিনেমায়ই অভিনয় করেছেন। তবে বাদ যায়নি রোমান্স ও কমেডি। ৮৯ বছরের দীর্ঘ জীবনে ৩০০-এর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন ধর্মেন্দ্র।
গতকাল সকালে মারা গেলেন ধর্মেন্দ্র। এর দুই সপ্তাহ আগে তার মৃত্যুর গুজব উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে পরিবারের তরফ থেকে জানানো হয় ধর্মেন্দ্র সুস্থ আছেন। গতকালও তার মৃত্যুর খবর পরিবারের তরফ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। দুপুরে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। এরপর বিনোদন অঙ্গনের বহু ব্যক্তি তাকে শ্রদ্ধা জানান। তারা ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুকে একটি যুগের সমাপ্তি বলে উল্লেখ করেন।
১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের লুধিয়ানার নাসরালি গ্রামে ধর্মেন্দ্রর জন্ম। তিনি ছিলেন এক স্কুলশিক্ষকের ছেলে। কিন্তু শৈশব থেকেই তার আকাঙ্ক্ষা ছিল রূপালি পর্দার দিকে। ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা এ তরুণের মধ্যে ছিল অদম্য সাহস ও দৃঢ় সংকল্প। দিলীপ কুমারের অভিনয় তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং সে প্রেরণায়ই তিনি স্বপ্ন দেখেন অভিনেতা হওয়ার। সেজন্য তিনি পাড়ি দেন মুম্বাইয়ে (তৎকালীন বোম্বে)।
স্বপ্ন পূরণের বড় সুযোগ আসে ১৯৫৮ সালে। যখন ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিন ও বিমল রায় প্রডাকশনস আয়োজন করেছিল একটি প্রতিযোগিতা। সর্বভারতীয় এ ‘প্রতিভা অন্বেষণ’ প্রতিযোগিতায় তিনি বিজয়ী হন। এ জয়ই তার জীবনের মোড় ঘোরায় এবং তাকে নিয়ে আসে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগতে।
মুম্বাইয়ে এসে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘দিল ভি তেরা, হাম ভি তেরে’ (১৯৬০) বাণিজ্যিকভাবে বিশেষ সাফল্য না পেলেও ধর্মেন্দ্রর জন্য এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। ষাটের দশকেই তিনি সাফল্য পান। অভিনয় করেছেন অ্যাকশন, রোমান্স ও কমেডি সিনেমায়।
ষাটের দশক ছিল ধর্মেন্দ্রর সম্ভাবনাময় সময়। ‘অনুপমা’ ও ‘ফুল অউর পাথর’-এ তার অভিনয় তাকে দ্রুত আলোচনায় নিয়ে আসে। বিশেষ করে ফুল অউর পাথর তাকে প্রথম সারির নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং বলিউডের প্রথম দিককার অ্যাকশন হিরো হিসেবে তার পরিচিতি তৈরি হয়। শারীরিক গড়ন, দৃঢ়তা ও মাচো ব্যক্তিত্ব তাকে এনে দেয় বলিউডের জনপ্রিয় উপাধি—হি-ম্যান।
সত্তরের দশক ছিল তার ক্যারিয়ারের সোনালি অধ্যায়। তিনি একদিকে যেমন রোমান্টিক নায়ক, অন্যদিকে কমেডিতে ছিলেন অতুলনীয়। হৃষিকেশ মুখার্জির ‘চুপকে চুপকে’ (১৯৭৫) সিনেমায় তার স্বতঃস্ফূর্ত হাস্যরস আজও দর্শককে মুগ্ধ করে। পরবর্তী সময়ে ধর্মেন্দ্র অ্যাকশন সিনেমার জন্য বেশি আলোচিত হলেও এ সিনেমা ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছে।
কিন্তু তার সবচেয়ে বিখ্যাত চরিত্র নিঃসন্দেহে ‘শোলে’র (১৯৭৫) ‘বীরু’। এ সিনেমার অনাবিল রসবোধ, বন্ধুত্বের দৃঢ়তা ও প্রাণবন্ত অভিনয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ধর্মেন্দ্রর অভিনীত এ চরিত্র আজও বলিউডের কালজয়ী অভিনয়ের তালিকায় অন্যতম।
তবে অভিনয়ে ধর্মেন্দ্র ছিলেন বহুমাত্রিক। তিনি সব ধারায় সাফল্যের সাক্ষর রেখেছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেছেন রোমান্টিক, কমেডি, গ্রামীণ চরিত্র থেকে শুরু করে তীব্র অ্যাকশনসহ সব ধরনের ভূমিকায়। ‘ইয়াদো কি বারাত’, ‘জুগনু’, ‘হুকুমাত’, ‘রাজা জোশিলা’, ‘বাটওয়ারা’—তার অভিনয় বৈচিত্র্যের প্রমাণ বহন করে।
ধর্মেন্দ্র কেবল জনপ্রিয় ছিলেন না, বক্স অফিসে তিনি ছিলেন একাধিক দশক ধরে সফলতার নিশ্চয়তা। তার উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকের ভিড়, পরিবারের জন্য উপযোগী বিনোদন ও এক অদম্য নায়কোচিত চেতনা। বলিউডে তার এমনই ইমেজ ছিল শেষ দিন পর্যন্ত।
তবে অন্য অনেক বলিউড অভিনেতার মতোই কেবল অভিনয়ে সীমাবব্ধ ছিলেন না ধর্মেন্দ্র। তিনি সিনেমা প্রযোজনার পাশাপাশি রাজনীতিও করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজনায়ও সফল। তার প্রতিষ্ঠিত বিজয়তা ফিল্মস থেকে নির্মিত ‘ঘায়েল’ (১৯৯০) ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে এবং সে সময়ের অন্যতম বড় হিট হয়ে ওঠে। এতে অভিনয় করেছিলেন তার ছেলে সানি দেওল।
২০০৪-০৯ এ পাঁচ বছর তিনি ভারতের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তিনি রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
রাজনীতি, অভিনয় ছাড়াও ধর্মেন্দ্রর ব্যক্তিজীবন সবসময় আলোচনার বিষয় ছিল। তিনি ১৯৫৪ সালে প্রকাশ কৌরকে বিয়ে করেন। পরে ১৯৮০ সালে তিনি বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী হেমা মালিনীকে বিয়ে করেন। কথিত আছে তিনি হেমা মালিনীকে বিয়ে করার জন্য ধর্ম পরিবর্তন করেছিলেন। বিষয়টির বাস্তবতা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। প্রকাশ ও ধর্মেন্দ্রর পুত্র সানি ও ববি দেওল বলিউডের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। ধর্মেন্দ্র-হেমার দুই কন্যা এশা ও অহনা দেওল। এশা কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করলেও অহনা অভিনয়ে আসেননি।
ধর্মেন্দ্র তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অ্যাকশন সিনেমায় থাকলেও পরবর্তী সময়ে রোমান্টিক ও কমেডিতে অভিনয় করেছেন। ক্যারিয়ারের শেষ অংশে তিনি ফ্যামিলি ড্রামায়ও অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ২০০৬ সালে মুক্তি পায় অনীল শর্মা পরিচালিত ‘আপনে’। এতে ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে সানি ও ববিও অভিনয় করেন। তাদের দেখা গিয়েছিল কমেডি সিনেমা ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘ইয়ামলা পাগলা দিওয়ানা’য়। এর প্রথম পর্বটি দারুণ জনপ্রিয় হয়।
হি-ম্যান বলা হলেও ধর্মেন্দ্র কেবল মাসলম্যান ছিলেন না। তিনি ‘স্টাইল’ ও ‘সাবস্ট্যান্স’ উভয়কেই একসঙ্গে ধারণ করেছেন। শক্তি ও সংবেদনশীলতার অনন্য মিশেলে তিনি ভারতীয় পৌরুষের এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছেন। পর্দায় তার উপস্থিতি ছিল এক অন্য রকম কম্পন, যা আজও দর্শক ভুলতে পারেনি।
তার মৃত্যুর মধ্যে এক শূন্যতা তৈরি হলো। বলিউড হারালো এক কিংবদন্তিকে, একজন প্রকৃত নায়ককে। কিন্তু তিনি বলিউডকে যে স্টাইল, স্টারডম, অভিনয় ও পেশাদারত্ব শিখিয়ে গেছেন তা চর্চিত হবে। তার আগে ক্যারিয়ার শুরু করা অনেক জনপ্রিয় অভিনেতা হারিয়ে গেছেন, কিন্তু ধর্মেন্দ্র টিকে ছিলেন। দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন। তার রেখে যাওয়া অসংখ্য চলচ্চিত্র, চরিত্র ও স্মৃতি চিরকাল তাকে জীবিত রাখবে দর্শকের হৃদয়ে।