ভারতীয় সিনেমা তখনো শৈশব পেরোয়নি। সে সময় অভিনয় নারীদের জন্য সম্মানজনক পেশা তো ছিলই না, বরং সামাজিকভাবে এটিকে নিন্দিত কাজ হিসেবেই দেখা হতো। সিনেমার পর্দায় নারীর চরিত্রে অভিনয় করতেন পুরুষেরা। এমন এক সময়ে এক নারী শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সাহসই দেখাননি, নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে অভিনয়কেই করে নিয়েছিলেন বেঁচে থাকার পথ। তিনি দুর্গাবাই কামাত।
১৯১৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে যখন ‘মোহিনী ভস্মাসুর’ নির্মাণে হাত দেন, তখন ভারতীয় সিনেমা মাত্র পথ চলতে শুরু করেছে। এর আগে একই বছর মুক্তি পেয়েছিল ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র ‘রাজা হরিশচন্দ্র’। কিন্তু সিনেমার পর্দায় তখনো নারীর উপস্থিতি ছিল প্রায় অকল্পনীয়। রাজা হরিশচন্দ্র-এ তারামতীর চরিত্রে তাই নারী নয়, অভিনয় করেছিলেন পুরুষ অভিনেতা আন্না সালুনকে। তবে নতুন সিনেমায় ফালকে আর সে পথে হাঁটতে চাননি। তার প্রয়োজন ছিল একজন সত্যিকারের নারী অভিনয়শিল্পীর।
সে সময় নাশিকে এসেছিল চিত্রকর্ষক নাটক কোম্পানি। নাট্যদলটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দুই নারী শিল্পী—দুর্গাবাই কামাত ও তার মেয়ে কমলাবাই গোখলে। ফালকে নিয়মিত নাটক দেখতেন। ফলে তাদের অভিনয় সম্পর্কেও তার ধারণা ছিল। নাট্যদলটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক মাসের জন্য দুর্গাবাই ও কমলাবাইকে সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রস্তাবে সাড়া মিলল। দুর্গাবাই কামাত অভিনয় করলেন পার্বতীর চরিত্রে। আর তার মেয়ে কমলাবাই গোখলে পর্দায় হাজির হলেন মোহিনী হিসেবে। এভাবেই ‘মোহিনী ভস্মাসুর’ শুধু ভারতীয় চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা হয়ে থাকেনি, নারীর চলচ্চিত্রে প্রবেশের ইতিহাসেও হয়ে উঠেছে একটি মাইলফলক। একই সিনেমায় মা-মেয়ের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। আর দুর্গাবাই কামাতের নাম যুক্ত হয় ভারতের প্রথম নারী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে।
তবে দুর্গাবাইয়ের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি ক্যামেরার সামনে নয়, তারও আগে। সিনেমায় আসার পেছনে ছিল এক নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম, সামাজিক প্রত্যাখ্যান ও টিকে থাকার লড়াই।
দুর্গাবাই ছিলেন শিল্পী পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই পেয়েছিলেন শিল্পচর্চার পরিবেশ। কথক শিখেছিলেন তিনি। বাজাতেন বীণা, সেতার ও তবলা। তার বাবা ছিলেন শিক্ষিত ও খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ। মেয়ের শিল্পীসত্তার বড় একটি অংশই বাবার কাছ থেকে পাওয়া—পরে স্মৃতিচারণে এমনটাই জানিয়েছিলেন কমলাবাই।
কিন্তু বিবাহিত জীবন তার জন্য সুখের ছিল না। কমলাবাইয়ের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তার বাবা ছিলেন সহিংস স্বভাবের এবং মাকে নিয়মিত মারধর করতেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দুর্গাবাই আর সেই সংসারে থাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত মেয়েকে নিয়ে তিনি বেরিয়ে আসেন। মা-মেয়ে চলে যান বোম্বেতে। সেখানে নিজেদের জীবন নিজেদেরই গড়ে নিতে হয়। আর জীবিকার পথ হিসেবে দুর্গাবাই বেছে নেন থিয়েটার।
সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। তখন নারীর ঘরের বাইরে কাজ করাই অনেকের চোখে ভালো ছিল না। আর অভিনয় ছিল আরও বিতর্কিত। থিয়েটার ও সিনেমায় নারীদের উপস্থিতিকে ঘিরে ছিল নানা কুসংস্কার ও সামাজিক আপত্তি। ফলে দুর্গাবাইয়ের মঞ্চে ওঠা ছিল শুধু শিল্পের প্রতি ভালোবাসার সিদ্ধান্ত নয়; নিজের ও মেয়ের জীবন চালানোর প্রয়োজনও এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
থিয়েটারে অবশ্য শুরু থেকেই তাকে সবাই স্বাগত জানায়নি। নারী শিল্পীদের নাট্যদলে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন কয়েকজন পুরুষ অভিনেতা। কেউ কেউ দল ছেড়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। তবে নাট্যদলের মালিক রঘুনাথরাও গোখলে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তার সমর্থনেই দুর্গাবাই ও কমলাবাই মঞ্চে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
সিনেমায় আসার সময় দুর্গাবাই আর নতুন কেউ ছিলেন না। এর আগেই মঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি। গদ্যনাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি শেক্সপিয়রের কিং লিয়ার ও ম্যাকবেথ’র অনুবাদ ও রূপান্তরিত নাটকেও কাজ করেছেন। রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট-এ অভিনয় করেছেন নার্সের চরিত্রে। কীচক বধ-এ ছিলেন সুদেশ্নার ভূমিকায়। অর্থাৎ সিনেমার ক্যামেরা তার সামনে আসার আগেই মঞ্চের আলোয় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি।
একটি সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মা-মেয়ে শুধু চলচ্চিত্রের পর্দায় আসেননি, ভারতীয় সিনেমায় নারীদের প্রবেশের পথও আরও একটু প্রশস্ত করেছিলেন। এর পরের গল্পটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কমলাবাই গোখলে অভিনয় করেছেন ছয় দশকেরও বেশি সময়। পরবর্তী সময়ে তার ছেলে চন্দ্রকান্ত গোখলে অভিনয়ে আসেন। এরপর সেই ধারায় যুক্ত হন বিক্রম গোখলে ও মোহন গোখলের মতো অভিনেতারাও। অর্থাৎ দুর্গাবাইয়ের এক সিদ্ধান্ত পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম ধরে একটি অভিনয় পরিবারের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
তবু ইতিহাসের পাতায় দুর্গাবাই কামাতের নাম যতটা উজ্জ্বল হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। তার জীবন নিয়ে তথ্যও খুব বেশি নেই। জন্ম, বিয়ে ও পরবর্তী জীবনের নানা তথ্যের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে তার জন্ম ১৮৭৯ এবং মৃত্যু ১৯৯৭ সালে বলা হলেও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।
তবে তারিখের এই অস্পষ্টতা তার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে মুছে দেয় না। এক শতাব্দীরও বেশি আগে, যখন সিনেমার পর্দায় একজন নারীকে দাঁড় করানোই ছিল সাহসের বিষয়, তখন দুর্গাবাই কামাত সেই সাহস দেখিয়েছিলেন। তার সামনে ছিল সামাজিক বাধা, ব্যক্তিগত সংকট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তবু তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই এক পা-ই পরে ভারতীয় সিনেমায় নারীর জন্য দীর্ঘ পথ তৈরি করেছে।