বলিউডের প্রথম ‘সফট বয়’ শাহরুখ খান

নব্বইয়ের দশকে শাহরুখ খান নায়ককে একেবারে অন্যভাবে হাজির করলেন। তার চরিত্রগুলো অনেক সময়ই শক্তিশালী, কিন্তু সেই শক্তির প্রদর্শন নেই। তারা প্রেমে পড়ে। কাঁদে। ভয় পায়। অপেক্ষা করে। প্রত্যাখ্যাত হলে ভেঙে পড়ে। নারীর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়। প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়। প্রেম পাওয়ার জন্য তারা সবসময় জোর করে না; বরং অনেক সময় অপেক্ষা করে, বোঝানোর চেষ্টা করে।

সত্তর ও আশির দশকের বলিউডের সিনেমাগুলোর প্রধান বিষয় ছিল বিদ্রোহ, বিরোধ ও অ্যাকশন। নায়করা ছিল ‘শক্তিশালী পুরুষ’। দেখতে শক্তিশালী না হলেও তাদেরকে স্ক্রিনে পৌরুষ প্রদর্শন করতে দেখা যেত। অমিতাভ বচ্চন হয়ে উঠেছিলেন 'অ্যাংরি ইয়ং ম্যান'। সিস্টেমের সমস্যার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি লড়াই করতেন। কখনো পুলিশ, কখনো আইন, কখনো সমাজ—সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতেন। তার শরীর, তার কণ্ঠ, তার হাঁটা, তার সংলাপে ছিল পৌরুষের একটা দৃশ্যমান ঘোষণা। অমিতাভ বচ্চন তখন শুধু একজন নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরুষ হয়ে ওঠার একটা মডেল।

দক্ষিণে রজনীকান্ত শুরু করলেন অতিমানবীয় অ্যাকশন সিনেমা। একাই তিনি দশজন, বিশজন, কখনো আরো বেশি মানুষকে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তার সিগারেট ধরানোর স্টাইল, চশমা পরার স্টাইল, হাঁটার স্টাইল হয়ে উঠল পৌরুষের প্রদর্শন। নায়ক মানেই শক্তিশালী। নায়ক মানেই প্রতিশোধ নেবে। নায়ক মানেই তার সামনে কেউ দাঁড়াতে পারবে না। নায়িকারা তখন অনেকটাই শোপিস। তারা নায়কের প্রেমিকা, নায়কের ভালোবাসার মানুষ, কখনো নায়কের জন্য বিপদে পড়া নারী। গল্পের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তাদের খুব বেশি ছিল না।

[যশ চোপড়ার ‘দিওয়ার’-এ নীতু কাপুর, পারভীন বাবির মতো অভিনেত্রীরা ছিলেন। তারা সেই সিনেমায় ছিলেন ‘সালার’-এর শ্রুতির মতোই শোপিস।]

রাজ কাপুর, দেব আনন্দ, রাজেশ খান্নাদের সময়ে প্রেমিক-নায়ক ছিল। কিন্তু তারাও ছিলেন ‘নায়ক’। তাদের প্রেমের মধ্যেও একটা নায়কোচিত উপস্থিতি ছিল। দেব আনন্দের রোমান্টিকতা ছিল পুরুষের আত্মবিশ্বাসে ভরা। রাজেশ খান্নার প্রেমিক চরিত্রগুলোও ছিল নায়কোচিত। কিন্তু সত্তর-আশির দশকে এসে এই পৌরুষ আরো শক্ত, আরো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল। নায়ক কাঁদবেন না, দুর্বল হবেন না। নায়ককে প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। নায়ক প্রেমে ব্যর্থ হলে প্রতিশোধ নেবেন, শত্রুর সঙ্গে লড়বেন, দরজা ভাঙবেন, বন্দুক হাতে নেবেন।

চলমান এই ‘কালচার’-এর মধ্য দিয়ে নব্বইয়ের দশকে শাহরুখ খানের উত্থান। বদলে গেল সিনেমায় নায়কের সংজ্ঞা।

রাজ ও সিমরান

শাহরুখ খান এসে নায়ককে একেবারে অন্যভাবে হাজির করলেন। তার চরিত্রগুলো অনেক সময়ই শক্তিশালী, কিন্তু সেই শক্তির প্রদর্শন নেই। তারা প্রেমে পড়ে। কাঁদে। ভয় পায়। অপেক্ষা করে। প্রত্যাখ্যাত হলে ভেঙে পড়ে। (‘কাভি হা কাভি না’ মনে পড়ে?) নারীর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়। প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়। প্রেম পাওয়ার জন্য তারা সবসময় জোর করে না; বরং অনেক সময় অপেক্ষা করে, বোঝানোর চেষ্টা করে।

এই জায়গাতেই শাহরুখ খান ভিন্ন হয়ে ওঠেন।। তিনি বলিউডে ‘সফট বয়’-এর একটা নতুন জনপ্রিয় চেহারা তৈরি করেছিলেন।

দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে-এর রাজ তেমনই এক চরিত্র। সে কখনোই টক্সিক পুরুষ নয়। ইউরোপে সিমরানের সঙ্গে থাকাকালীন সে তার সঙ্গে মজা করে, দুষ্টুমি করে, প্রেমে পড়ে; কিন্তু তাকে অসম্মান করে না। তার প্রেমে একটা খুনসুটি আছে, কিন্তু অধিকারবোধ নেই। সে সিমরানকে নিজের সম্পত্তি মনে করে না।

রাজ জানে, সিমরান তাকে ভালোবাসে। সেও সিমরানকে ভালোবাসে। কিন্তু পৌরুষ দেখিয়ে সে সিমরানকে তুলে নিয়ে যায় না। বরং ভারতে গিয়ে সে সিমরানের বাবার মন জয় করার চেষ্টা করে। এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগের অনেক সিনেমায় নায়ক প্রেমিকার জন্য লড়াই করতেন। শাহরুখের রাজ প্রেমিকার চয়েজকে গুরুত্ব দিয়ে তার পরিবার, পরিবার প্রধানকে জয় করার জন্য লড়াই করে, নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে। সে মারে না, মার খায়।

সিমরানের বাবা রাজকে প্রত্যাখ্যান করছেন। রাজ চাইলে তাকে অপমান করতে পারে, সিমরানকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সে তা করে না। সে পরিবারের সঙ্গে লড়াই করে, পরিবারকে বাদ দিয়ে নয়। তার পৌরুষ এখানে শক্তি প্রদর্শনে নয়, অপেক্ষা করার ক্ষমতায়।

পরদেশ-এ শাহরুখ খান ও মাহিমা চৌধুরী

পরদেশ-এ শাহরুখ খান আরও একবার সেই রকম চরিত্র নিয়ে এলেন। অর্জুন গঙ্গার প্রেমে পড়ে। কিন্তু গঙ্গার প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশের পথটা দখলদারির নয়। বন্ধুত্ব, দায়িত্ব এবং ভালোবাসার মধ্যে সে নিজের অবস্থান খুঁজে নেয়। গঙ্গার ভালো-মন্দের খেয়াল রাখে। গঙ্গার ওপর যখন কিশোরীলাল ও রাজীবের মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক চাপ তৈরি হয়, তখন অর্জুন গঙ্গার পাশে দাঁড়ায়। সে গঙ্গাকে উদ্ধার করার জন্য কেবল আরেকজন শক্তিশালী পুরুষ হয়ে ওঠে না।

মোহাব্বতের রাজ মালহোত্রার দিকে তাকানো যাক। তাকে ন্যাকা মনে হতে পারে। সে কথা বলে অনেক। গান গায়। ছাত্রদের নিয়ে নাচে। নারায়ণ শঙ্করের সঙ্গে কূটনৈতিক লড়াই করে। নারায়ণের প্রতি ক্ষোভ থাকার যথেষ্ট কারণ তার ছিল। কিন্তু সে কোনো ভায়োলেন্ট পদক্ষেপ নেয় না। এমনকি শেষ অবধি সে নারায়ণকে কষ্ট দিতেও চায় না। কারণ সে জানে, সে যাকে ভালোবাসে, তার সঙ্গে তার বাবার সম্পর্কটাও গুরুত্বপূর্ণ। মেঘা তার বাবাকে ছাড়া পৃথিবীতে খুব বেশি কিছু বুঝত না। মেঘার জন্যই রাজ ফিরে আসে। তার ভালোবাসা তাই জয় করার চেয়ে অপেক্ষা করার গল্প।

শাহরুখের এই পুরুষ চরিত্রগুলোকে আরও ভালোভাবে বুঝতে হলে কভি হ্যাঁ কভি না-এর সুনীলকে মনে করা যায়। সুনীল নায়কোচিত অর্থে আদর্শ পুরুষ নয়। সে ভুল করে, মিথ্যা বলে, ব্যর্থ হয়, প্রেমে হেরে যায়। সে নিখুঁত নয়। বরং তার দুর্বলতাগুলোই তাকে মানুষ করে তোলে। সে প্রেমে জিততে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের পরাজয় মেনে নেওয়ার ক্ষমতাও তার আছে। নব্বইয়ের দশকের বলিউডে এমন নায়ক খুব স্বাভাবিক ছিল না।

কাভি হা কাভি না

ইয়েস বস-এর রাহুলও শক্তির প্রদর্শন করে না। সে একজন সাধারণ চাকরিজীবী। তার সামনে ক্ষমতাবান পুরুষ আছে, অর্থ আছে, সামাজিক অবস্থান আছে। রাহুলের শক্তি তার সততায়। সে যে নারীকে ভালোবাসে, তাকে পাওয়ার জন্য অন্য পুরুষের মতো ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না। তার লড়াইটা তাই অন্যরকম।

তারপর কুছ কুছ হোতা হ্যায়। রাহুল চরিত্রটিকে আজকে অনেকে দ্বিমুখী বলে মনে করে। কিন্তু সে টিনাকে ভালোবেসেছিল। টিনার সঙ্গেই ছিল। অঞ্জলিকে হয়ত ভালোবাসত অন্যভাবে, রাহুল নিজেও জানত না। কিন্তু রাজ, সুনীল, অর্জুনদের ধারাবাহিকতায় রাহুলও এমন এক পুরুষ, যার আবেগ প্রকাশের জায়গা আছে। সে কাঁদে, বন্ধুত্ব হারায়, ভালোবাসা হারায়। পুরুষের আবেগকে লুকিয়ে রাখাকে এখানে নায়কোচিত করা হয়নি।

‘দিওয়ার’ নির্মাতা যশ চোপড়ারই সিনেমা বীর-জারা। সে সিনেমায় শাহরুখের সফটনেস আরও গভীর হয়। বীর প্রতাপ সিংয়ের পৌরুষ কম ছিল না। সে ভারতীয় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা। সাহস আছে, দায়িত্ববোধ আছে, আত্মসম্মান আছে। কিন্তু সে বেছে নেয় প্রেমিকার সম্মান। জারাকে ভালোবাসে বলেই তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য জোর করে না। বরং তার জন্য নিজের জীবন, নিজের যৌবন পর্যন্ত বিসর্জন দেয়। কারাগারে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়া কোনো অ্যাকশন হিরোর পৌরুষ প্রদর্শন নয়। এটি অন্য ধরনের শক্তি।

একই ঘটনা ঘটে ‘যাব তাক হ্যায় জান’-এ। যশ চোপড়ার রোমান্স, নায়কের প্রেম অন্য মাত্রার। তিনিই ‘সিলসিলা’, ‘কাভি কাভি’র মতো সিনেমার নির্মাতা। ‘সিলসিলা’র অমিতকে তার লয়্যালটির জন্য প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু সমর আনন্দকে যায় না। আকিরার প্রতি তার প্রেম হয়ত তৈরি হয়েছিল কিন্তু সে অপেক্ষা করে ছিল মীরার জন্যই।

সুরিন্দর ও তানি

নাইন্টিজেরও অনেক বোদ্ধার কাছে রব নে বানা দি জোড়ি একটা ফালতু সিনেমা। কিন্তু সুরিন্দর সাহনিকে সফট পুরুষের একটা আউট অব দ্য ওয়ার্ল্ড উদাহরণ। তানির জন্য সে নিজের স্বকীয়তাও বদলে ফেলে। নিজের স্ত্রীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সে নিজের মধ্যে আরেকটি মানুষ তৈরি করে। এখানে একজন পুরুষের অহংকার ভেঙে যায়। সে চাইলে বলতে পারত, ‘আমি তোমার স্বামী, আমাকে ভালোবাসতেই হবে।’ কিন্তু সে তা করে না। সুরিন্দরের রাজ হয়ে ওঠাকে নারীবাদী বা পলিটিকাল কারেক্টনেস থেকে প্রশ্ন তোলা যায় কিন্তু সেই প্রশ্নও প্রমাণ করে, শাহরুখের পুরুষ চরিত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করার জায়গাটা অন্যরকম। তার চরিত্রগুলো শুধু ‘পুরুষ কীভাবে নারীকে জয় করবে’ এই প্রশ্নের উত্তর নয়। বরং ‘পুরুষ কীভাবে ভালোবাসবে’ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে।

‘কাভি আলবিদা না ক্যেহনা’র দেব নিশ্চিতভাবেই টক্সিক। কিন্তু সেখানে তাকাতে হবে তার সোশিও-ইকোনমিক অবস্থার দিকে। অন্যদিকে ‘আনজাম’-এর বিজয় অগ্নিহোত্রী, ‘ডর’-এর রাহুল, ‘বাজিগর’-এর অজয় কিন্তু শেষ অবধি ‘জয়ী’ হয় না। তারা হারায়। দেবও হারায়।

রিজওয়ান ও মন্দিরা

রিজওয়ান খানকে একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা উচিত। ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’ হয়েও সে আমাদের অনেকের চেয়ে অনেক বেশি ‘মানুষ’। তাই মাই নেম ইজ খান-এর রিজওয়ান খানকে আরও এক ধাপ এগিয়ে রাখা যায়। অ্যাসপারগার সিনড্রোমে আক্রান্ত রিজওয়ান পুরো আমেরিকা চষে বেড়ায় একা—মন্দিরার জন্য। তার হাতে বন্দুক নেই। সে মারামারি করতে পারে না। তার শরীরী শক্তি কোনো অর্থেই অ্যাকশন হিরোর মতো নয়। কিন্তু ভালোবাসার জায়গায় তার দৃঢ়তা অসাধারণ। সে বারবার বলে, সে খারাপ মানুষ নয়। এই চরিত্রে পৌরুষের সংজ্ঞাটাই বদলে যায়। শক্তিশালী পুরুষ মানে যে অন্যকে পরাজিত করতে পারে, তা নয়। শক্তিশালী পুরুষ সেই মানুষও হতে পারে, যে নিজের সীমাবদ্ধতা জেনেও ভালোবাসার মানুষের কাছে পৌঁছাতে হাজার মাইল হাঁটে।

মোহন ভার্গব (স্বদেশ) অবশ্য প্রেমিক-নায়ক নয়। কিন্তু শাহরুখের পুরুষত্বের আরেকটি দিক সেখানে দেখা যায়। সে সমস্যার সমাধান করে বন্দুক দিয়ে নয়, প্রযুক্তি দিয়ে; ক্ষমতা দেখিয়ে নয়, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে। গ্রামের মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার জন্য সে ফিরে আসে। চাক দে! ইন্ডিয়া-র কবির খানও একইভাবে পুরুষত্বের আরেকটি সংজ্ঞা তৈরি করেন। তিনি খেলোয়াড়দের ওপর কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেন না; বরং তাদের নিজেদের শক্তি খুঁজে নিতে সাহায্য করেন। এই দুই চরিত্র দেখিয়ে দেয়, শাহরুখের ‘সফট’ পুরুষ মানেই দুর্বল পুরুষ নয়।

শাহরুখ খান বলিউডের প্রথম প্রেমিক-নায়ক ছিলেন না। তার আগেও প্রেমিক নায়ক ছিলেন। রাজ কাপুর ছিলেন, দেব আনন্দ ছিলেন, রাজেশ খান্না ছিলেন। কিন্তু শাহরুখের বিশেষত্ব হলো, তিনি নব্বইয়ের দশকের মূলধারার হিন্দি সিনেমায় এই কোমলতাকে নায়কোচিত করে তুলেছিলেন।

আরও