আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রিমিয়ারে সিনেমা শেষ হওয়ার পর দাঁড়িয়ে করতালিসহ অভ্যর্থনা দেয়াই রীতি। তবে কিছু সিনেমার ক্ষেত্রে এবং সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অভ্যর্থনা দীর্ঘ হওয়াই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় এ উচ্ছ্বাসে অভিনেতা ও নির্মাতাদেরও অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়। করতালির সময় যখন দুই অংকে পৌঁছে যায়, তখন তাদের চেহারায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এতক্ষণ কী করা উচিত, সেটিই যেন বুঝে উঠতে পারছেন না তারা। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে এ বছর বিষয়টি আরো বেশি দেখা গেছে। গতকাল উৎসব শেষ হলেও যেন করতালির রেশ যাচ্ছে না।
এবারের আসরে জন মালকোভিচ, স্যাম রকওয়েল, পরিচালক মার্টিন ম্যাকডোনা, পেনেলোপি ক্রুজ ও রবার্ট প্যাটিনসনের জন্য এবারের ভেনিস উৎসবের সে সমস্যাই ছিল। মার্টিন ম্যাকডোনার ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ লিডোর বিখ্যাত পালাজ্জো দেল সিনেমায় পেয়েছে ১৩ মিনিটের অভ্যর্থনা।
পেনেলোপি ক্রুজ ও হাভিয়ের বারদেমের ‘বাঙ্কার’ পেয়েছে ১৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের করতালি। প্যাটিনসনের ‘প্রাইমটাইম’ পেয়েছিল সাড়ে ১৭ মিনিট। গাজা নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘নাজা’ ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের অভ্যর্থনা পেয়ে রেকর্ড গড়ে।
হলিউড চলচ্চিত্র উৎসবগুলোকে প্রায় পরিত্যাগ করেছে এমন অভিযোগ থাকলেও বড় তারকার উপস্থিতিতে এবারের ভেনিসে ঘাটতি ছিল না। রবার্ট প্যাটিনসন, ক্রুজ ও বারদেম এবং ওসিস ব্যান্ডের লিয়াম ও নোয়েল গ্যালাঘেরের মতো অনেক পরিচিত মুখই উৎসবের প্রশংসাকে পুরস্কারের আলোচনায় কিংবা বক্স অফিস সাফল্যে রূপ দেয়ার আশায় হাজির হয়েছিলেন। এদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন জর্জ ক্লুনি। সম্মানসূচক গোল্ডেন লায়ন পেয়েছেন এ অভিনেতা।
এবারের আসরের মাধ্যমে অস্কারের দৌড়ে এগিয়ে গেলেন জন মালকোভিচ। মার্টিন ম্যাকডোনা পরিচালিত সিনেমায় একজন সিআইএ এজেন্টের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। অভিনেতাদের লিডো থেকে অস্কারের মঞ্চে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে পরিচালক মার্টিন ম্যাকডোনার রেকর্ডও বেশ ভালো। ২০১৭ সালের ‘থ্রি বিলবোর্ডস আউটসাইড এবিং’, ‘মিসৌরি’ সিনেমার জন্য স্যাম রকওয়েল ও ফ্রান্সেস ম্যাকডরম্যান্ড অস্কার জিতেছিলেন। ২০২২ সালের ‘দ্য বানশিজ অব ইনিশেরিন’ সিনেমার জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন কলিন ফ্যারেল ও ব্রেন্ডন গ্লিসন। দুটো সিনেমাই ভেনিসে প্রদর্শন হয়েছিল।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্কারের স্বীকৃতি থেকে দূরে থাকা মালকোভিচের ক্ষেত্রে এবার সে স্বীকৃতি যেন বহু প্রতীক্ষিত। ১৯৯৩ সালের ‘ইন দ্য লাইন অব ফায়ার’ সিনেমার জন্য সর্বশেষ অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক অন্যান্য চলচ্চিত্র উৎসবের মতো ভেনিসের আসরও ছিল বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে সরব। ভেনিসের শিল্প নির্দেশক আলবের্তো বারবেরা এবারের আসরকে ‘এ যাবৎকালের সবচেয়ে রাজনৈতিক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তার কথায় বাড়াবাড়ি ছিল না। ৮৩তম আসরে দক্ষিণপন্থী গণমাধ্যম মালিক (ইঙ্ক), দক্ষিণপন্থী ট্রল (মাস্ক), মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত (নাজা) এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই (দে’আর হিয়ার)-এর মতো উত্তপ্ত রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সিনেমা দেখা গেছে।
উৎসবের বাইরেও এখন চলচ্চিত্র উৎসবগুলোয় অভিনেতা ও নির্মাতাদের কাছে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। বার্লিন উৎসবে জুরি সভাপতি ভিম ভেন্ডার্স নির্মাতাদের ‘রাজনীতির বাইরে থাকা উচিত’ মন্তব্য করার পর বিষয়টি আরো জোরালোভাবে সামনে আসে।
তবে ভেনিসের জুরি সভাপতি ম্যাগি জিলেনহাল এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। জুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, সিনেমা ‘মৌলিকভাবেই এবং অনিবার্যভাবেই রাজনৈতিক’। একই সঙ্গে তিনি দর্শককে ‘সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত, সবচেয়ে বিকৃত মানুষের গল্প শুনতে’ আহ্বান জানান। তার যুক্তি, ‘এর মধ্য দিয়েই সহমর্মিতা খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।’
তবে দর্শক সিনেমায় রাজনীতির এমন উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি করছে না বলেই মনে হচ্ছে। গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের ওপর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা ব্যবস্থাগুলো নিয়ে নির্মিত নাজা পেয়েছে চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে দীর্ঘতম দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা।
তবে এ বছর নারী নির্মাতাদের উপস্থিতি ছিল আশঙ্কাজনক কম। জুরি সভাপতি ম্যাগি জিলেনহাল। জুরিপ্রধান নারী হলেও মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নারী নির্মাতাদের কমতি নিয়ে তিনিও অন্য সবার মতোই প্রশ্ন তুলেছেন। গোল্ডেন লায়নের জন্য প্রতিযোগিতায় থাকা মাত্র দুটি সিনেমা নারী নির্মাতাদের পরিচালিত।
সংবাদ সম্মেলনে জিলেনহাল রসিকতা করে বলেন, ‘আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে নারীদের চেয়ে পুরুষরাই ভালো সিনেমা বানায়।’
এর মধ্যেই আছে নতুন তারকাদের আবির্ভাব। ৩০ বছর বয়সী নির্মাতা ল্যান্স ওপেনহাইম বড় প্রতিভা হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন। ‘সাম কাইন্ড অব হেভেন’ ও এইচবিওর ‘রেন ফেয়ার’-এর মতো নন-ফিকশন কাজের জন্য পরিচিত ওপেনহাইম এবার প্রথম ফিচার সিনেমা প্রাইমটাইম নিয়ে হাজির হয়েছেন।