ভয়ের চেনা ছক ভেঙে হরর সিনেমায় নতুন চমক

পুরনো বাড়ি ও অতিপ্রাকৃত রহস্যের আবহে নির্মিত ড্যামিয়েন ম্যাকার্থির ‘হোকাম’ ফিরিয়ে এনেছে ধ্রুপদি ভৌতিক গল্পের স্বাদ। সিনেমায় ওহম চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যাডাম স্কট।

ভয় দেখানোর চেনা কৌশল যখন দর্শকের কাছে একঘেয়ে হয়ে ওঠে, তখনই নতুন গল্প আর অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয় হরর সিনেমা। ২০২৬ সালে সে চেষ্টাই যেন আরো স্পষ্ট। কোথাও জম্বির তাড়া, কোথাও ভিনগ্রহবাসীর সঙ্গে অদ্ভুত সম্পর্ক, আবার কোথাও পুরনো হোটেলের রহস্য কিংবা প্রেমের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়। সব মিলিয়ে এ বছর হরর সিনেমা শুধু আতঙ্ক ছড়াচ্ছে না, বরং জনরাটির প্রচলিত ধারণাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বছরের হরর সিনেমার তালিকায় যেমন আছে স্বল্প বাজেটে নির্মিত ‘ব্যাকরুমস’ ও ‘অবসেশন’-এর মতো বক্স অফিসে সফল ছবি, তেমনি হতাশ করেছে ‘স্ক্রিম ৭’ ও ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার্স-চ্যাপ্টার ৩’-এর মতো কিছু সিকুয়াল। তবে ব্যতিক্রমী গল্প বলার সাহস, অভিনয় ও নির্মাণশৈলীর কারণে কয়েকটি ছবি আলাদা করে নজর কেড়েছে। এগুলোর বিশেষত্ব হলো দর্শককে ভয় দেখানোর পাশাপাশি কখনো হাসিয়েছে, কখনো অস্বস্তিতে ফেলেছে, আবার কখনো পরিচিত সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

রেসিডেন্ট ইভিল

ভিডিও গেম অবলম্বনে নির্মিত ‘রেসিডেন্ট ইভিল’ সিনেমাটিতে পরিচালক জ্যাক ক্রেগার হরর নির্মাতা হিসেবে নিজের সাফল্যের ধারাকে আরো সুদৃঢ় করেছেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা ধরে রাখা ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ অস্টিন আব্রামসের অভিনয়।

ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও তার চরিত্রের হাস্যরস দর্শকের জন্য স্বস্তির জায়গা তৈরি করে। একসময় সে চরিত্রই জড়িয়ে পড়ে জম্বিদের তাড়া খাওয়া এক দুঃস্বপ্নময় অভিযানে। ‘বারবারিয়ান’ ও ‘ওয়েপনস’-এর তুলনায় ছবিটির আবহ আলাদা, যা ক্রেগারের পরবর্তী কাজ নিয়েও আগ্রহ তৈরি করে।

টাচ মি

এলিয়েনকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রচলিত হরর ছবির ধারণাকে একেবারে ওলটপালট করে দিয়েছেন পরিচালক অ্যাডিসন হাইম্যান। মাদক, যৌনতা, জাপানি সিনেমা, আশির দশকের হিপহপ ও জটিল সম্পর্কের নানা উপাদান মিলিয়ে সিনেমাটি তৈরি করেছে এক বিচিত্র মনস্তাত্ত্বিক জগৎ। অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত এক তরুণী ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এক ভিনগ্রহবাসীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এলিয়েনটির বিশেষ ক্ষমতা তাদের নিয়ে যায় মাদকসৃষ্ট ঘোরের মতো এক উচ্ছ্বাসের জগতে। কিন্তু সে আনন্দের আড়ালেই ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় বিপদের ইঙ্গিত। হাস্যরস ও অপ্রত্যাশিত ঘটনার মধ্য দিয়ে সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত দর্শককে নিয়ে যায় মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক অদ্ভুত লড়াইয়ে।

হোকাম

পুরনো বাড়ি ও অতিপ্রাকৃত রহস্যের আবহে নির্মিত ড্যামিয়েন ম্যাকার্থির ‘হোকাম’ ফিরিয়ে এনেছে ধ্রুপদি ভৌতিক গল্পের স্বাদ। সিনেমায় ওহম চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যাডাম স্কট। ওহম আয়ারল্যান্ডের একটি রহস্যময় হোটেলে এসে ওঠেন। একসময় সেখানে আটকে পড়ার পর তাকে মোকাবেলা করতে হয় হত্যারহস্য ও অস্বাভাবিক নানা ঘটনার। ছবিটির পুরনো, স্যাঁতসেঁতে হোটেল যেন নিজেই একটি চরিত্র। এর দৃশ্যসজ্জায় একদিকে রয়েছে আরামদায়ক পরিবেশ, অন্যদিকে জমে থাকা অজানা আতঙ্ক। ওহমের বিরক্তিকর ও অসহিষ্ণু স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আত্মোপলব্ধির যাত্রাও গল্পটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। ভরা প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি দেখার আনন্দই আলাদা।

ডেথ অ্যাট ক্যাম্প মিয়াজম

পরিচালক জেন শোনব্রুনের রোমান্টিক কমেডির শিকড় গাঁথা স্ল্যাশার হরর সিনেমার প্রতি গভীর অনুরাগে সিনেমাটি এমনভাবে নির্মিত যে একবার দেখে দর্শকের তৃপ্তি মিটবে না, বরং বারবার দেখার ইচ্ছা জাগবে।

কারণ এর মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে পপ সংস্কৃতির অসংখ্য অনুষঙ্গ, যা প্রতিবার দেখার সময় নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। তবে সিনেমাটি কেবল পুরনো হরর সিনেমার অনুকরণ নয়। হান্না আইনবাইন্ডার ও গিলিয়ান অ্যান্ডারসনের অভিনয়ের রসায়ন ছবিটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে এমন কিছু দৃশ্য, যা সহজে ভোলা যায় না। যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ এক কেএফসি ডিনার থেকে শুরু করে কাউন্টিং ক্রোজের গানের আবহে নির্মিত প্রাণবন্ত গণহত্যার দৃশ্য—সবকিছু মিলিয়ে ছবিটি হয়ে উঠেছে বিচিত্র, স্মরণীয় ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।

অবসেশন

সমালোচনা ও বিশ্লেষণের আলোচনায় আসার আগেই অবসেশন দর্শকের সামনে হাজির হয়েছিল একটি নির্মম থ্রিলার হিসেবে। পুরনো দিনের ‘মাঙ্কিজ প’ ধরনের অতিপ্রাকৃত কল্পকাহিনীর সঙ্গে এতে মিশেছে আধুনিক সম্পর্কের এক পরিচিত সংকট—বন্ধুত্বের গণ্ডিতে আটকে পড়া প্রেম। গল্পটি আপাতদৃষ্টিতে সরল হলেও এর ভয় ও মোচড় দর্শককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ইন্দে নাভারেত্তের অসাধারণ অভিনয় সিনেমাটির আতঙ্ককে আরো তীব্র করে তুলেছে। এমন কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা রয়েছে, যেগুলো নিয়ে দর্শক মাসের পর মাস আলোচনা করেছে—অনেকের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এটা কীভাবে সম্ভব!’ সিনেমাটির বিষণ্ন সমাপ্তি এমন এক অস্বস্তি রেখে যায়, যা প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসার পরও সহজে কাটে না।

সব মিলিয়ে ২০২৬-এর উল্লেখযোগ্য হরর সিনেমার বড় আকর্ষণ কেবল ভয় নয়, বরং সে ভয়ের ভেতর দিয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক ও মানসিক অস্থিরতাকে তুলে ধরা। প্রচলিত ফর্মুলার বাইরে যাওয়ার এ প্রবণতাই এ বছরের সিনেমাগুলোকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।

সূত্র: ভ্যারাইটি

আরও