পিয়া জান্নাতুল। বিজ্ঞাপন-নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে পরিচিতি মুখ তিনি। জিতেছেন একাধিক বিউটি কনটেস্ট। আইনজীবী হিসেবে এখন তুমুল ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। শোবিজ ও আইন পেশা দুই ক্যারিয়ারেই সফল পিয়া জান্নাতুল সম্প্রতি বণিক বার্তার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সে আলাপচারিতায় ওঠে এসেছে বাংলাদেশের গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে নারীর অবস্থান, একইসঙ্গে একজন নারীর সফলতার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা কথা—
বাংলাদেশে মডেলিং বা অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটা বয়সের পর নারীদের আর কাজের সুযোগ থাকে না। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই তাদের নিয়ে কাজ হয়। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
মডেলিং-এর ক্ষেত্রে খুব একটা সুযোগ নাই। কারণ মডেলিং-এ একটা গ্ল্যামারের ব্যাপার থাকে। যুগ যুগ ধরেই গ্ল্যামার বলতে আমরা ওই রকম বয়সী মেয়েদেরই বুঝি। কারণ আমরা সৌন্দর্য বলতে আউটলুকটাকে বেশি প্রাধান্য দেই। একজন নারী বা যেকোনো মানুষের বয়সের সাথে সাথে যে অন্যরকম সৌন্দর্য তৈরি হয়, সেটা দেখার চোখ আমাদের এখনো তৈরি হয়নি। হ্যাঁ অভিনয়ের ক্ষেত্রে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় সিনিয়র আর্টিস্টিদেরকে ঘিরেই সেরকম ভিন্নধর্মী গল্প তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেটাও খুব কম। সেই হিসেবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি তো খুবই ছোট। তাই আমাদের জন্য আরেকটু টাফ।
মডেল বা অভিনেত্রীদের পাবলিক স্পেসে দেখলে মানুষ সম্মান দেখায়, সেলফি তুলতে চায়। আবার সেই মানুষটিরই সোশ্যাল মিডিয়ায় গিয়ে বাজে মন্তব্য করে। এটা কেন করে বলে মনে করেন?
আমার মনে হয় এশিয়ার এ সাবকন্টিনেন্টে নারীদের সফলতাকে আমরা এখনো মেনে নিতে শিখিনি। আমরা ধরেই নিই, কেউ মিডিয়াতে কাজ করছে মানে সেটা শুধু ইন্টারটেইনমেন্টের জন্য। এর পাশাপাশি তারও যে ইন্টালিজেন্স থাকতে পারে, সেও যে অনেককিছু জানে, কাজের বাইরেও তার একটা জীবন আছে, পরিবার আছে সেটা আমরা ভুলে যাই। আমরা ধরেই নেই সে আমাদের স্বপ্নের নায়িকা। স্বপ্নের নায়িকাকে যা ইচ্ছা বলা যাবে। গালি দেয়া যাবে। সে যে একটা বাস্তব মানুষ, এটা তারা ভাবতে পারে না। আমার মনে হয় এটা তৈরি হতে একটু সময় লাগবে।
দর্শকের বিভিন্ন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পেছনে কি পর্দার সামনে মানুষগুলোর কোনো কোনো দায়িত্বহীন কাজ দায়ী?
ভালো-খারাপ সব পেশাতেই থাকে। সেখানে একজনের জন্য সবাইকে তো খারাপ বলতে পারেন না। কিন্তু আমরা যারা মিডিয়াতে কাজ করছি, আমাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা ঘটছে। বিষয়টা দুঃখজনক।
আপনাকেও নিশ্চয়ই অনেক সময় অনেক জাজমেন্টের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো দর্শকের জাজমেন্টের কারণে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেছেন?
অনেকেই বলে যে, বিশেষ করে অভিনয়শিল্পীরা— দর্শকই আমার সব। দর্শকই আমার প্রাণ, দর্শকের জন্যই আমি বেঁচে আছি। আমি ওসব বলি না। আমি খুবই সিম্পল একজন মানুষ। আমি কাজ করতে পছন্দ করি। মানুষ অ্যাপ্রিসিয়েট করলে থ্যাংকিউ বলি। কাজের বিনিময়ে আমি উপার্জন করতে পারি। সম্মানও পাই। এবং আমি নিজের একটা পরিচয় তৈরি করেছি। এমন কখনই ছিল না, দর্শক যাই বলে সেটাতে আমি নাচব। আমার নিজের কণ্ঠস্বর আছে, আমার নিজের অধিকার আছে, আমি আমার নিজের বাউন্ডারি জানি। আমি ছোটবেলা থেকেই জানি আমার কী করতে হবে। এমন না আমি সব ঠিক কাজ করেছি। মানুষ হিসেবে ভুল হতেই পারে। কিন্তু আমি কখনো কারো কথায় নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করি না। কিন্তু হ্যাঁ, দিনশেষে আমি নিজে চিন্তা করি আমার কী কী সমস্যা আছে।
নিজের দুর্বলতাটা বের করতে পারলে আপনার সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারবেন। তাই আমি নিজেই নিজের দুর্বলতা বোঝার চেষ্টা করি। কখনো কখনো আমার হাজবেন্ডকে জিজ্ঞেসও করি। কিন্তু দর্শক তো আমাকে ভালো করে চেনে না। তাই তাদের ভাবনার জন্য আমি নিজেকে বদলাব না।
দর্শকের মাঝে শোবিজ নিয়ে অনেক ধরনের চিন্তা আছে, অনেকে মনে করেন ‘কম্প্রোমাইজ’ ছাড়া এখানে টেকা সম্ভব না। আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
এসব ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা খারাপ না। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমি জানতাম আমার কোনটা করতে হবে। আমি একেবারেই কনফিউজড না। আমি জানি কোনটা আমার জন্য ভালো কোনটা খারাপ। আমি জানতাম কোথায় ‘না’ বলতে হবে। ছোটবেলা থেকে তো এমনিতেও আমরা ভালো খারাপ কিছুটা শিখতে শিখতে বড় হই। যেমন মিথ্যা কথা বলা যাবে না, রাত করে বাড়ি ফেরা যাবে না, সিগারেট খাওয়া যাবে না, জাংকফুড স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না ইত্যাদি। এ ধরনের বিষয়গুলো আমি মেনে চলার চেষ্টা করেছি। এরপর আস্তে আস্তে বুঝেছি আমার বাউন্ডারি কোথায়।
মিডিয়াতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাউকে ফোর্স করে কিছু করা হয় না। তাই একটা মেয়েরও বুঝতে হবে কোথায় আমার না বলতে হবে। এবং শর্টকাটে খুব বেশিদিন বেশি জায়গায় যাওয়া যায় না। আমার পায়ের মাটি খুব শক্ত। কারণ আমি শর্টকাটে এ পর্যন্ত আসিনি। আমার ১৮-১৯ বছরের ক্যারিয়ার। তবুও যখন কোথাও বোল্ড কোনো কথা বলেছি, তখন ইন্ডাস্ট্রিরই অনেকে আমাকে সরাতে চেয়েছে। আমাকে পারেনি কারণ আমি মাল্টিটাস্কিং করতাম। এক জায়গা থেকে সরালে অন্য কাজ করতাম।
এক সময় বাংলাদেশের বিউটি কনটেস্টগুলো থেকে আমরা খুব ভালো ভালো মুখ পেয়েছি। শেষ কয়েক বছরে এ প্রতিযোগিতাগুলো আলোচনার থেকে সরে গিয়েছে। কারণটা কী?
এখন আসলে অপশন অনেক বেশি। তাই মানুষ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় ভুল করে। আপনি যদি রাইট অপশনটা রাইট টাইমে চুজ করতে না পারেন তাহলে দিক হারিয়ে ফেলবেন। আমরা যে ইন্ডাস্ট্রি বা প্লাটফর্মটা তৈরি করতে পারছি না, এখন এমন একটা সময়ে আমরা চলে এসেছি, আমাদের সুযোগও অনেক আছে। কিন্তু আপনি যদি না বুঝে একটা নৌকায় পা দেন, নৌকাটা দুলবে, নাকি সময়মতো আপনি তীরে যাবেন, সেটা ভাবার বিষয়। এগুলো সব বুঝে পা ফেলতে হবে।
যে সকল নারীরা ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
সবার আগে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে হবে। এবং কাউকে কখনই অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাবে না। অনেকেই নিজের স্বামীর হাতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, চেকবুক সব তুলে দেয়। তখন অন্য কেউ তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা মানুষ। সেই জায়গাটাকে সম্মান করতে হবে। এটার মানে ভালোবাসা কমে যাওয়া না। এটার মানে নিজেকে সম্মান দিতে শেখা, সাথে অন্যকেও সম্মান করতে শেখা।