জহির রায়হানের জন্মদিন ও উৎপল দত্তের প্রস্থান— নিছকই কাকতাল?

একজনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুরে, অন্যজনের মৃত্যু ১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট কলকাতায়। কিন্তু এই তারিখের তাৎপর্য কেবল জন্ম-মৃত্যুর কাকতালীয়তায় নয়। বরং আরো গভীরে গেলে দেখা যায় — দুজনের শিল্পজীবনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, রাজনীতি, ইতিহাস এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে শিল্পের অবস্থান। একজন চলচ্চিত্রের পর্দায় পাকিস্তানী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, অন্যজন মঞ্চকে বানিয়েছিলেন রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সমালোচনার এক বিস্ফোরক এলাকা

ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৯ আগস্ট হয়তো আর দশটি দিনের মতোই একটি দিন। কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে দিনটি যেন অদ্ভুত এক প্রতীক বহন করে। এই দিনে জন্মেছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম দূরদর্শী নির্মাতা, লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা জহির রায়হান, আর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন বরিশালে জন্ম নেওয়া ভারতীয় বাঙালি অভিনেতা, নাট্যকার ও রাজনৈতিক থিয়েটারের কিংবদন্তি উৎপল দত্ত।

একজনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুরে, অন্যজনের মৃত্যু ১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট কলকাতায়। কিন্তু এই তারিখের তাৎপর্য কেবল জন্ম-মৃত্যুর কাকতালীয়তায় নয়। বরং আরো গভীরে গেলে দেখা যায় — দুজনের শিল্পজীবনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, রাজনীতি, ইতিহাস এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে শিল্পের অবস্থান। একজন চলচ্চিত্রের পর্দায় পাকিস্তানী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, অন্যজন মঞ্চকে বানিয়েছিলেন রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সমালোচনার এক বিস্ফোরক এলাকা।

একই বাংলার দুই প্রান্ত থেকে উঠে আসা দুই শিল্পী

জহির রায়হানের জন্মনাম ছিল জহিরুল্লাহ। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে প্রথমদিকের ছাত্রদের মিছিলে ছিলেন, তাদের একজন, গ্রেফতারও হয়েছিলেন। তার রাজনৈতিক বোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল কমিউনিস্ট আন্দোলন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের জন্য তিনি একসময় বার্তাবাহকের কাজও করেছিলেন। গোপন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেই তার নাম ‘রায়হান’ হয়ে ওঠে।

জহির রায়হান

অর্থাৎ জহিরের শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পটি শুরু থেকেই রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। সাহিত্য দিয়ে শুরু করে তিনি সাংবাদিকতা, ফটোগ্রাফি এবং শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রে আসেন। ১৯৫২ সালে কলকাতায় গিয়ে প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল ফটোগ্রাফি স্কুলে ভর্তি হওয়া তার চলচ্চিত্র-চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৫৬ সালে চলচ্চিত্রে প্রবেশের পর ১৯৬১ সালে মুক্তি পায় তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনো আসেনি’। এরপর ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘সঙ্গম’, ‘বাহানা’সহ একের পর এক কাজ তাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে স্বতন্ত্র নির্মাতাদের একজন করে তোলে।

আর উৎপল দত্ত- জন্মেছিলেন ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ বরিশালে, ব্রিটিশ ভারতের বাংলায়। তার শিল্পীজীবনের প্রথম বড় পরিচয় অবশ্য চলচ্চিত্র নয়, থিয়েটার। ১৯৪৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’। শেক্সপিয়র, ইবসেন, গোর্কি থেকে ব্রেখট— বিশ্বনাট্যের সঙ্গে পরিচিত এই তরুণ অভিনেতা খুব দ্রুত বুঝতে শুরু করেন, থিয়েটার যদি কেবল অভিজাত দর্শকের বিনোদন হয়, তবে তার সামাজিক সম্ভাবনার বড় অংশ অপচয় হয়ে যায়। সেখান থেকেই তাঁর পথ ক্রমে রাজনৈতিক থিয়েটারের দিকে বাঁক নেয়।

জহির রায়হান ও উৎপল দত্ত দুজনের মাধ্যম আলাদা। একজন সিনেমা নির্মাণ করেছেন, অন্যজন মূলত থিয়েটারকে কেন্দ্র করে নিজের শিল্পভুবন নির্মাণ করেছেন। কিন্তু তাদের শিল্পের ভেতরকার প্রশ্নটি আশ্চর্যভাবে কাছাকাছি—‘শিল্পী কি তার সময়ের অন্যায়ের সামনে নিরপেক্ষ থাকতে পারেন?’

জহির রায়হান: ক্যামেরা যখন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অস্ত্র

জহির রায়হানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, তিনি সময়কে শুধু দেখেননি— সময়কে চলচ্চিত্রের ভাষায় রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ের পর ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় তাঁর ‘জীবন থেকে নেয়া’। আপাতদৃষ্টিতে একটি পারিবারিক গল্প, কিন্তু পরিবারের ভেতরের কর্তৃত্ববাদী চরিত্রটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে পাকিস্তানী রাষ্ট্রের রূপক। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এক ব্যক্তির স্বৈরাচার আর একটি রাষ্ট্রের মানুষের ওপর কর্তৃত্ব-দুটি স্তরকে একই প্রতীকে পড়ার সুযোগ তৈরি করেছিলেন জহির। এই কারণেই ‘জীবন থেকে নেয়া’কে শুধু একটি রাজনৈতিক সিনেমা বলা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল রাজনৈতিক রূপকের চলচ্চিত্রায়ন।

এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। জহির তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র-ভাষাকে শুধু রাজনৈতিক করেননি, প্রযুক্তিগতভাবেও এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তার ‘সঙ্গম’ ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র, ‘বাহানা’ ছিল সিনেমাস্কোপে নির্মিত। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ হওয়া আর চলচ্চিত্রের কারিগরি আধুনিকতার মধ্যে তিনি কোনো বিরোধ দেখেননি।

১৯৭০ সালের ১০ এপ্রিল মুক্তি পায় জহির রায়হানের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। এ ছবি মুক্তিতে পাকিস্তানীদের নানা ছল-চাতুরি, নিষেধাজ্ঞা জহিরকে দমাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি মুক্তি পায়, বাংলার মানুষের স্বাধীকারের চেতনা ছড়িয়ে পড়ে বড় পর্দায়।

তারপর এলো মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ-এর পর তার অসমাপ্ত ইংরেজি চলচ্চিত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ আর শেষ হয়নি। তিনি কলকাতায় চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হন। সেখানেই তৈরি করেন তার সবচেয়ে ঐতিহাসিক কাজ ‘স্টপ জেনোসাইড’। এটি মাত্র প্রায় ২০ মিনিটের প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। কিন্তু দৈর্ঘ্য দিয়ে তার অভিঘাত মাপা যায় না।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যা, শরণার্থীদের দুর্দশা এবং যুদ্ধের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে তুলে ধরার জন্য নির্মিত এই চলচ্চিত্র মুক্তিযুদ্ধের ভিজ্যুয়াল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রদর্শিত হয় এবং ১৯৭২ সালে তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কারও পায়।

আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা— প্রথম দিকের প্রদর্শনগুলোর একটিতে মুজিবনগর সরকারের নেতারা চলচ্চিত্রটি দেখেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও চলচ্চিত্রটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সেটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারের উদ্যোগ নেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ জহিরের ক্যামেরা তখন আর কেবল সিনেমা বানাচ্ছিল না। একটি সদ্য জন্ম নিতে থাকা রাষ্ট্রের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের কাজ করছিল।

মঞ্চে উৎপল দত্ত

উৎপল দত্ত: মঞ্চ যখন রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে শুরু করে

উৎপল দত্তের ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক শিল্পচেতনা অন্য পথে বিকশিত হয়েছিল। তিনি প্রথমে শেক্সপিয়রীয় অভিনয়, ইংরেজি থিয়েটার এবং বিশ্বনাট্যের গভীর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়— এই থিয়েটার কি সেই সমাজের মানুষের সঙ্গে কথা বলছে, যে সমাজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে? লিটল থিয়েটার গ্রুপের যাত্রার পর তিনি বাংলা ভাষায় আরো বেশি করে কাজ করতে শুরু করেন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যান। এই যাত্রার সবচেয়ে বিস্ফোরক মাইলফলক ‘কল্লোল’।

১৯৬৫ সালে মঞ্চস্থ হওয়া এই নাটকের বিষয় ছিল ১৯৪৬ সালের ‘রয়াল ইন্ডিয়ান নেভি মিউনিটি’। ব্রিটিশ শাসনের শেষপর্বে এটি ছিল ভারতীয় নৌসেনাদের বিদ্রোহ। ইতিহাসের এই অধ্যায়কে মঞ্চে এনে উৎপল দত্ত শুধু অতীতের গল্প বলেননি, তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন— কোন ইতিহাস রাষ্ট্র মনে রাখতে চায়, আর কোন ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে চায়?

নাটকটি এতটাই রাজনৈতিক অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল যে ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে উৎপল দত্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিচার ছাড়াই প্রেসিডেন্সি জেলে আটক রাখা হয়। গবেষণামূলক সূত্রগুলোয় তার গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে একটি রাজনৈতিক প্রবন্ধের উল্লেখ থাকলেও, ‘কল্লোল’-এর রাজনৈতিক প্রভাবই যে এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল, সে বিষয়টি বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। কিন্তু শিল্পীকে গ্রেফতার করা গেলেও নাটককে থামানো গেল না।

প্রেক্ষাগৃহে হামলার চেষ্টা হয়েছে, অভিনেতাদের হুমকি দেয়া হয়েছে, সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন ও পর্যালোচনা ঠেকানোর চেষ্টা হয়েছে। তবু দর্শক থামেনি। ‘কল্লোল’ চলতে থাকে। সেই সময়কার জনপ্রিয় স্লোগান হয়ে ওঠে—‘চলছে, চলবে।’ এটি শুধু একটি নাটকের স্লোগান ছিল না। পরবর্তী সময়ে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও বাক্যটি এক ধরনের প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে। অর্থাৎ জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর মতো উৎপল দত্তের ‘কল্লোল’ও শিল্পকে দর্শকের সামনে রাজনৈতিক ইতিহাসের বিকল্প পাঠ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল।

কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্যটাও গুরুত্বপূর্ণ। জহির রায়হানের রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের কেন্দ্র ছিল জাতীয় মুক্তি, ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম। তার শিল্প ধীরে ধীরে একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

অন্যদিকে উৎপল দত্তের রাজনৈতিক শিল্প ছিল অনেক বেশি শ্রেণিচেতনা, মার্কসবাদ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিপ্লবী রাজনীতিকেন্দ্রিক। তার প্রশ্ন ছিল— স্বাধীনতা অর্জনের পরও ক্ষমতার কাঠামো কি বদলায়? শোষণ কি শেষ হয়? ইতিহাসের মালিক কে? তাই দুজনের রাজনৈতিক অবস্থানকে এক করে ফেলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, জহিরের শিল্প প্রশ্ন করেছিলেন— ‘একটি জাতি কীভাবে স্বাধীন হবে?’ আর উৎপল দত্ত বারবার প্রশ্ন করেছিলেন— ‘স্বাধীন হওয়ার পর সেই রাষ্ট্রটি কাদের?’ এই পার্থক্য তাদের শিল্পকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

আরেকটি অদ্ভুত যোগসূত্র: বরিশাল, বাংলা এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ভূগোল

এই গল্পে আরেকটি সূক্ষ্ম ইতিহাস আছে। উৎপল দত্তের জন্ম বরিশালে। জহির রায়হানের জন্ম ফেনীতে। দুজনই জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার ভূগোলে— দেশভাগের আগে। একজন পরে পূর্ব পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠলেন; অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক থিয়েটারের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ। অর্থাৎ তাদের জীবন এক অর্থে দেশভাগের দুই পাশে ছড়িয়ে যাওয়া বাংলা সংস্কৃতির দুই ধারার গল্পও। ১৯৪৭ সালে তাদের ভূগোল ভাগ করেছিল; কিন্তু বাংলা ভাষা, সাহিত্য, নাটক ও সিনেমার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে পুরোপুরি ভাগ করতে পারেনি। এই কারণেই ১৯ আগস্টের এই কাকতালীয়তা কেবল ব্যক্তিগত নয়—দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও এক অদ্ভুত প্রতীক।

সাহিত্যে জহির রায়হান ও সিনেমায় উৎপল দত্ত: আরেক বিপ্লব

উৎপল দত্তকে শুধু রাজনৈতিক নাট্যকার হিসেবে দেখলে তার চলচ্চিত্র-অবদানও ছোট করে দেখা হবে। তিনি বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ আছে। মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’, সত্যজিৎ রায়ের ‘জন অরণ্য’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘আগন্তুক’, ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’, গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’—বিভিন্ন নির্মাতার চলচ্চিত্রে তার অভিনয় বাংলা সিনেমার অভিনয়ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার একই মানুষ ‘গোলমাল’-এর মতো জনপ্রিয় হিন্দি কমেডিতেও এমন চরিত্র নির্মাণ করেছেন, যা তাঁকে মূলধারার দর্শকের কাছেও কিংবদন্তি করে তোলে।

জহির রায়হানকে শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে দেখলেতাঁর সৃষ্টিশীলতার একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। হাজার বছর ধরে, আরেক ফাল্গুন, বরফ গলা নদী, আর কত দিন— তার গল্প-উপন্যাসে বারবার ফিরে আসে সাধারণ মানুষের জীবন, প্রেম, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্তিত্বের সংকট। তার লেখার শক্তি ছিল সরাসরি বর্ণনা না করে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভেতর দিয়ে সময়কে অনুভব করানো। তাই তার গল্প-উপন্যাসের অনেক বাস্তবতা নির্দিষ্ট একটি যুগের হলেও, ক্ষুধা, বৈষম্য, নিঃসঙ্গতা, ভালোবাসা কিংবা ক্ষমতার কাছে মানুষের অসহায়ত্ব- এসব প্রশ্ন আজও পুরোনো হয়ে যায়নি। জহির রায়হানের সাহিত্য তাই কেবল তার সময়ের দলিল নয়; সময় বদলালেও মানুষের যে মৌলিক সংকটগুলো থেকে যায়, তারই এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি। সাহিত্য ‘সময়ের প্রয়োজনে’ কী রূপ ধারণ করে, তার অনন্য নজির রেখে গেছেন তিনি।

হয়তো আরো অনেক দূর যেতে পারতেন জহির রায়হান, কিন্তু তার গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক জায়গাটি এখানেই। তিনি মাত্র ৩৬ বছর বয়সে অন্তর্ধান করেন। ১৯৭১-এর শেষদিকে তার বড় ভাই, লেখক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করা হয়। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি জহির খবর পান যে তার ভাইকে মিরপুরের কোথাও পাওয়া যেতে পারে। তিনি তাকে খুঁজতে বের হন। আর ফিরে আসেননি। জহিরের মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত ভাষায় অনেক সময় ‘মৃত্যু’ বলা হলেও ঐতিহাসিকভাবে আরো সতর্ক শব্দ হলো অন্তর্ধান। তার দেহ উদ্ধার হয়নি। তার পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণের অভাবেই বাংলাদেশে দিনটি ‘জহির রায়হান অন্তর্ধান দিবস’ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

আরও