বলিউডে সাফল্যের সংজ্ঞা অনেক সময় নির্ধারিত হয় বক্স অফিস, জনপ্রিয়তা আর তারকাখ্যাতির মাপকাঠিতে। কিন্তু এ তিনের সমন্বয়ও যে একজন অভিনেত্রীর পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তার এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চনের। ক্যারিয়ারের সোনালি সময়ে, যখন তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত ও চাহিদাসম্পন্ন অভিনেত্রী, তখনই একের পর এক ছবি থেকে বাদ পড়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল, যেসব ছবিতে কাজ করার কথা ছিল, সেগুলো থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার নিজের ছিল না। কেন তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নেরও মেলেনি সন্তোষজনক উত্তর।
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৩ সালে, পরিচালক আজিজ মির্জার 'চলতে চলতে' সিনেমাকে ঘিরে। শাহরুখ খান ও ঐশ্বরিয়া রায়কে জুটি করে সিনেমাটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর আগে 'জোশ (২০০০)', 'মোহাব্বতে (২০০০)' ও 'দেবদাস (২০০২)'-এ একসঙ্গে কাজ করেছেন তারা। ফলে নতুন ছবিতে তাদের জুটি নিয়েও দর্শকের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ছবির শুটিং শুরু হওয়ার পরই বদলে যায় সমীকরণ। ঐশ্বরিয়ার জায়গায় নেওয়া হয় রানি মুখার্জিকে।
এটি কেবল প্রাথমিক পর্যায়ের কোনো কাস্টিং পরিবর্তন ছিল না। সিনেমার জন্য শ্যুটিংও করেছিলেন ঐশ্বরিয়া। বহু বছর পর রেডিও নাশার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক আজিজ মির্জা জানান, ঐশ্বরিয়াকে নিয়ে ‘প্রেম নগরিয়া’ গানটির শুটিং হয়েছিল। যদিও সেই শুটিং চলেছিল মাত্র এক দিন। ঠিক কী কারণে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি পরিচালক। শুধু জানিয়েছেন, পরিস্থিতি প্রত্যাশামতো এগোয়নি এবং পরবর্তী সময়ে রানি মুখার্জি ছবিতে যুক্ত হন।
ঐশ্বরিয়ার এই বাদ পড়ার পেছনে তার তৎকালীন প্রেমিক সালমান খানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ঘটনার কথা বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সিনেমাটির শ্যুটিং সেটে সালমানের উপস্থিতি ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে 'চলতে চলতে'ই' ঐশ্বরিয়ার পেশাগত জীবনের একমাত্র এমন অভিজ্ঞতা ছিল না। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সিমি গারেওয়ালের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান 'রঁদেভু উইথ সিমি গারেওয়াল'-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। সেখানে শাহরুখ খানের সঙ্গে একাধিক সিনেমাতে কাজ করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেসব প্রকল্প থেকে বাদ পড়ার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়। ঐশ্বরিয়া জানান, এমন কিছু সিনেমা ছিল, যেগুলোতে তাদের একসঙ্গে কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সেসব কাজ আর এগোয়নি। সবচেয়ে অস্বস্তিকর ছিল, কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার কোনো ব্যাখ্যাও তাকে দেওয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে 'ভীর জারা' ও 'কাল হো না হো' সিনেমার নামও বারবার এসেছে। দুটি সিনেমাতেই শেষ পর্যন্ত শাহরুখ খানের বিপরীতে অভিনয় করেন প্রীতি জিনতা।
এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি সামনে আসে শাহরুখ খানের নিজের বক্তব্যে। ২০০৩ সালের ৭ জুলাই ইন্ডিয়া টুডে-তে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'চলতে চলতে' থেকে ঐশ্বরিয়াকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা আছে কি না। উত্তরে শাহরুখ স্বীকার করেন, ঐশ্বরিয়া কোনো ভুল না করলেও তাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একজন বন্ধু হিসেবে সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল বলে তিনি মনে করেন, যদিও প্রযোজক হিসেবে তখন সেটিকে বাণিজ্যিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, এ ঘটনার জন্য ঐশ্বরিয়ার কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
শাহরুখের এই স্বীকারোক্তি ঘটনাটিকে অন্য মাত্রা দেয়। কারণ, এটি আর কেবল সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো গুঞ্জন ছিল না, সিনেমাটির একজন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ও অভিনেতার বক্তব্যেই উঠে এসেছিল সিদ্ধান্তটির পেছনে থাকা ব্যক্তিগত ও পেশাগত দ্বন্দ্ব।
ঐশ্বরিয়ার নিজের বক্তব্যে অবশ্য সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে এই অভিজ্ঞতার মানসিক অভিঘাত। সিমি গারেওয়ালকে তিনি জানিয়েছিলেন, এমন পরিস্থিতিতে তিনি বিস্মিত, বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। বিশেষ করে যেসব কাজ নিয়ে আগে থেকে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও যখন কেউ কারণ ব্যাখ্যা করেনি, তখন বিষয়টি তার কাছে আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তবু তিনি কারও কাছে গিয়ে কৈফিয়ত চাননি। তার ভাবনা ছিল, কারও যদি কিছু ব্যাখ্যা করার থাকে, তবে সে নিজে থেকেই তা করবে। নিজের অবস্থান বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের কৃপায়, অন্য কেউ আমাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারবে না।’
কথাটির মধ্যে ছিল আত্মমর্যাদার পাশাপাশি একধরনের পেশাগত উপলব্ধি। জনপ্রিয়তা, সাফল্য কিংবা পরিচিতি-কোনোটিই একজন শিল্পীকে অন্যের সিদ্ধান্তের বাইরে রাখতে পারে না। অথচ নিজের পরিচয় ও আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।
বহু বছর পরও বিষয়টি পুরোপুরি অতীত হয়ে যায়নি। ২০১৮ সালের আগস্টে শাহরুখ খানের সঙ্গে আবার কবে কাজ করবেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে ঐশ্বরিয়া ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ছবির কাস্টিংয়ের সিদ্ধান্তে অনেক সময় নায়ক বা প্রধান অভিনেতাদেরও ভূমিকা থাকে। তাই প্রশ্নটি তাদেরই করা উচিত। সংক্ষিপ্ত সেই মন্তব্যে পুরোনো অভিজ্ঞতার একটি ক্ষীণ প্রতিধ্বনি যেন আবার শোনা গিয়েছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে তাদের পেশাগত দূরত্ব কিছুটা কমে। ২০১৬ সালে করণ জোহরের 'অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল' সিনেমাতে শাহরুখ খান অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিতে ঐশ্বরিয়ার সাবেক স্বামীর ভূমিকায় তাকে দেখা যায়। পর্দায় তাদের উপস্থিতি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর আবার একই সিনেমাতে দেখা যাওয়াটা ছিল উল্লেখযোগ্য।
ঐশ্বরিয়া রাইয়ের ক্যারিয়ারের এই অধ্যায় তাই কেবল কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ হারানোর গল্প নয়। বরং বলিউডের তারকাব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাও সামনে আনে। যেখানে জনপ্রিয়তা থাকলেও সব সময় নিজের কাজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না, আন্তর্জাতিক পরিচিতি থাকলেও পেশাগত সিদ্ধান্তে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করা যায় না। পর্দায় যিনি দর্শকের ভালোবাসা ও নির্মাতাদের আগ্রহের কেন্দ্র, পর্দার বাইরে তাকেও কখনো কখনো এমন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়, যার কারণ জানার অধিকারটুকুও যেন তার থাকে না।
বলিউড সাধারণত মনে রাখে সফল ছবির নাম, তারকাদের জুটি, বক্স অফিসের হিসাব আর দর্শকের উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে থেকে যায় এমন কিছু গল্প, যেখানে কোনো অভিনেত্রীর উপস্থিতি প্রথমে পরিকল্পিত হয়েছিল, অথচ শেষ পর্যন্ত তাঁকে ছাড়াই তৈরি হয়েছে ছবিটি। ঐশ্বরিয়ার অভিজ্ঞতা তেমনই এক গল্প। যে গল্পে আলোচনার বিষয় শুধু তিনি কোন ছবিতে অভিনয় করেননি, তা নয়, বরং সাফল্যের শীর্ষে থেকেও কেন তাকে নিজের পেশাগত অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।