প্রেমিক নাকি বদরাগী— কতটুকু জানা যায় নানা পাটেকরকে

নানা পাটেকরের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল, খ্যাতি তাকে খুব একটা আকৃষ্ট করত না। ক্যারিয়ারের শুরুতে একের পর এক প্রস্তাব এলেও অনেক সিনেমা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজের পুরনো সিনেমাও দেখতে চাইতেন না। যেন প্রতিটি চরিত্র শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে নিজের ভেতর থেকেও মুছে ফেলতে চাইতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ যদি নিজের তৈরি চরিত্রের প্রেমে পড়ে যায়, একসময় সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে

কী করে বলব তুমি আমার কে?— মাধুরী দীক্ষিতের উদ্দেশে বলা সেই প্রেমের কবিতা আর পর্দা কিংবা শুটিংয়ের সেটে বদরাগী, রুক্ষ, রগচটা নানা পাটেকর। আসলে কোনটা ছিলেন তিনি? এ অমিমাংসিত প্রশ্ন রেখে আজ ৭৫ বছর বয়সে গোয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন অভিনেতা। ভারতীয় সিনেমা শুধু একজন অভিনেতাকে হারাল না; হারাল এমন একজন মানুষকে, যার জীবনের অনেক গল্পই সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয়।

নানা পাটেকরের প্রথম শিক্ষক ছিল ক্ষুধা। ১৩ বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক টানাপড়েনের কারণে স্কুলের পর প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে চুনাভাট্টি যেতেন সিনেমার পোস্টার আঁকতে। মাসে ৩৫ টাকা আর একবেলা খাবার, এই ছিল পারিশ্রমিক। নবম শ্রেণির সেই কিশোরকে তখন সংসার চালানোর কথাও ভাবতে হয়েছে। অনেক বছর পর নানা বলেছিলেন, সেই বয়সের ক্ষুধা ও অপমানই তাকে অভিনয় শিখিয়েছে।

কিন্তু জীবনের ক্ষত শুধু দারিদ্র্যেই থামেনি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর কয়েক বছরের মধ্যেই হারান প্রথম সন্তান দুর্বাসাকে। জন্ম থেকেই শিশুটির ঠোঁটে সমস্যা ছিল, এক চোখেও দৃষ্টিজনিত সমস্যা ছিল। সন্তানকে দেখে তার প্রথম চিন্তা ছিল—মানুষ কী বলবে! সন্তানের কষ্টের চেয়ে সমাজের চোখকে বেশি ভয় পেয়েছিলেন তিনি। পরে সেই সন্তানের জন্য অদ্ভুত ভালোবাসা জন্মেছিল তার মনে। কিন্তু ততদিনে সময় ফুরিয়ে এসেছিল। আড়াই বছর বয়সেই মারা যায় দুর্বাসা।

থিয়েটারের প্রতি নানার আকর্ষণ ছিল ছোটবেলা থেকেই, মঞ্চ ছিল আত্মপ্রকাশের জায়গা। তারপর ধীরে ধীরে প্রবেশ করলেন সিনেমায়। গমন, পারিন্দা, ক্রান্তিবীর ও আগ্নিসাক্ষীসহ অসংখ্য সিনেমায় ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের হাজির হয়েছিলেন তিনি। একসময় যাকে নায়ক হিসেবে কেউ কল্পনাই করতে পারেনি, সে-ই হয়ে উঠল ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী মুখ। তিনি নায়ক হলেন, খলনায়ক হলেন, চরিত্রাভিনেতা হলেন, আবার 'ওয়েলকাম' এর উদয় শেঠি হয়ে হাসালেন কোটি মানুষকে। সংলাপের চেয়ে অনেক সময় নীরবতাই বেশি কথা বলত তার অভিনয়ে।

নানা পাটেকরের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল, খ্যাতি তাকে খুব একটা আকৃষ্ট করত না। ক্যারিয়ারের শুরুতে একের পর এক প্রস্তাব এলেও অনেক সিনেমা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজের পুরনো সিনেমাও দেখতে চাইতেন না। যেন প্রতিটি চরিত্র শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে নিজের ভেতর থেকেও মুছে ফেলতে চাইতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ যদি নিজের তৈরি চরিত্রের প্রেমে পড়ে যায়, একসময় সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।

তার আরেকটি পরিচয় ছিল কৃষকদের প্রতি ভালোবাসা। মারাঠি অভিনেতা-পরিচালক মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে আত্মহত্যা করা কৃষকদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো নানা পাটেকর। 'নাম ফাউন্ডেশন' নামের অলাভজনক সংস্থার মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে কাজ করেছেন তিনি। ক্যামেরার সামনে বক্তৃতা দেয়ার চেয়ে মাঠে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে বেশি জরুরি মনে করেছিলেন এ শক্তিমান অভিনেতা।

তার ব্যক্তিত্ব কখনই সরল ছিল না। রাগ ছিল, একগুঁয়েমি ছিল, সহকর্মীদের সঙ্গে সংঘাতের গল্প ছিল। ২০১৮ সালের #মিটু আন্দোলনের সময় অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন, নানা অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে মুম্বাই পুলিশ পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়ে 'ক্লোজার রিপোর্ট' দাখিল করে। ঘটনাটি তার জীবনের বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থেকে যায়, যে অধ্যায়কে না অতিরঞ্জিত করা যায়, না মুছে ফেলা যায়।

নানা পাটেকর বদনাম পেয়েছেন, সুনাম পেয়েছেন, জাতীয় পুরস্কার, পদ্মশ্রী, দর্শকের কটাক্ষ এবং ভালোবাসা সব পেয়েছেন। তবে আজ সব তর্ক বিতর্ক ভালো-খারাপকে পেছনে ফেলে অনন্তের পথে যাত্রা করলেন উপমহাদেশের গুণী এ অভিনেতা।

আরও