আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার উপস্থিতি সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একের পর এক সিনেমা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নিচ্ছে। পাশাপাশি মিলছে পুরস্কার ও নানা স্বীকৃতি। সর্বশেষ উদাহরণ রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। সিনেমাটি গত ২৩ জুলাই ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়। ৬ সেপ্টেম্বর এ উৎসবে সিনেমাটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়। পরে স্বাধীন চলচ্চিত্র সমালোচকদের পুরস্কার ‘প্রেমিও বিসাতো দ’ওরো’ অর্জন করে। এছাড়া টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও (টিআইএফএফ) সিনেমাটি প্রদর্শিত হয়।
এর আগে ভারতের বিভিন্ন উৎসব ও নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশের আরেক সিনেমা ‘মানুষের বাগান’। সাম্প্রতিক এসব অর্জন যেন গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সিনেমার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিরই ধারাবাহিকতা।
সাফল্যের নতুন ধারাবাহিকতা
২০২১ সালে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘আঁ সার্তে রিগা’ বিভাগে নির্বাচিত হয়। এটি ছিল ওই বিভাগে প্রথম কোনো বাংলাদেশী সিনেমার অংশগ্রহণ। একই বছর এশিয়া-প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডসে সিনেমাটির জন্য জুরি গ্র্যান্ড প্রাইজ পান পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ এবং সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান আজমেরী হক বাঁধন।
এরপর ২০২২ সালে নুহাশ হুমায়ূনের স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘মশারি’ এসএক্সএসডব্লিউ উৎসবে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার এবং আটলান্টা চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ন্যারেটিভ স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমার পুরস্কার পায়। এ সময় আন্তর্জাতিক উৎসবে স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য—দুই ধরনের সিনেমা নিয়েই বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতাদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে।
রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদ সভাপতি ও ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল এ পরিবর্তনকে দেখছেন ইতিবাচক হিসেবেই। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের সিনেমা বিশ্ব দরবারে প্রদর্শিত হচ্ছে—এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের বিষয়। যখন আমাদের দেশের সিনেমাগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন স্বীকৃতি ও পুরস্কার অর্জন করে, তখন সেটি আমার জন্য গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।’
তার মতে, আন্তর্জাতিক সাফল্যকে শুধু পুরস্কারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে এর বড় দিকটি আড়ালে থেকে যায়। বাংলাদেশের নির্মাতারা নিজেদের গল্প, ভাষা, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ব সিনেমার বৃহত্তর আলোচনায় যুক্ত হচ্ছেন—এটাই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
২০২৩ সালেও বাংলাদেশের সিনেমার জন্য আসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর ‘বলী’ বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ‘নিউ কারেন্টস’ বিভাগে নির্বাচিত হয়ে অর্জন করে নিউ কারেন্টস অ্যাওয়ার্ড। একই বিভাগে জায়গা করে নেয় বিপ্লব সরকারের ‘আগন্তুক’। এরপর বিভিন্ন সময়ে ‘সাবা’, ‘বাড়ির নাম শাহানা’, ‘স্যান্ড সিটি’সহ আরো কয়েকটি সিনেমা কান, টরন্টো, বুসান, রটারডাম, কার্লোভি ভ্যারি, কায়রোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সাফল্যের পরও স্থানীয় সংকট
আন্তর্জাতিক উৎসবে ধারাবাহিক উপস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশের সিনেমা বিদেশী প্রযোজকদেরও নজর কাড়ছে। মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’, রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের ‘মাস্টার’ এবং মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম পরিচালিত ‘দেলুপি’ একই সময়ে রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিভিন্ন বিভাগে জায়গা করে নেয়। ‘মাস্টার’ বিগ স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। অন্যদিকে মেহেদী হাসানের ‘স্যান্ড সিটি’ কার্লোভি ভ্যারি চলচ্চিত্র উৎসবের প্রক্সিমা বিভাগে গ্রাঁ প্রি পুরস্কার পায়।
এ ধারাবাহিক সাফল্যের মধ্যেই অবশ্য একটি প্রশ্ন সামনে আসে—আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রশংসিত সিনেমাগুলো দেশের দর্শকের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে? নির্মাতা নুরুল আলম আতিকের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, পাঁচ-সাত বছর আগেও আন্তর্জাতিক অনুদান, বিশেষ করে নির্মাণ-পূর্ব অনুদান পাওয়া কিংবা বড় উৎসবে আমাদের সিনেমার পুরস্কার পাওয়া ছিল বিরল ঘটনা। এখন আর তা নয়। তবে তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সঙ্গে স্থানীয় দর্শকের সম্পর্ক তৈরি করাও জরুরি।
নুরুল আলম আতিক বলেন, ‘বিদেশে পুরস্কার পাওয়া সিনেমা দেশে এসে যদি দর্শকের মধ্যে তেমন কৌতূহল তৈরি না করে, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে। আবার দেশের দর্শক যে সিনেমাগুলো পছন্দ করছেন, সেগুলোও সবসময় আন্তর্জাতিক উৎসবে একইভাবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। সিনেমা আন্তর্জাতিক ভাষা হলেও তার প্রথম ভিত্তি হওয়া দরকার নিজের মানুষ, সমাজ, ভাষা ও নিজের বাস্তবতা।’
প্রতিভার সঙ্গে প্রয়োজন অবকাঠামো ও বাজার
আন্তর্জাতিক সাফল্যের বিপরীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো অবকাঠামোর ঘাটতি। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও আধুনিক পোস্ট-প্রডাকশন সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অথচ এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নির্মাতারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের কাজ নিয়ে যাচ্ছেন।
নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো যথাযথ চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নেই। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়েও চলচ্চিত্রের জন্য তেমন পৃষ্ঠপোষকতা নেই। যথাযথ পোস্ট-প্রডাকশন সুবিধাও নেই। তার পরও আমাদের নির্মাতারা সিনেমা বানাচ্ছেন এবং সেগুলো আন্তর্জাতিক উৎসবে জায়গা করে নিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, আমাদের নির্মাতাদের প্রতিভা ও সিনেমার প্রতি ভালোবাসার কোনো ঘাটতি নেই।’ তার মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরো ভালো কাজ করতে হলে চলচ্চিত্রশিক্ষার পাশাপাশি হাতেকলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, নির্মাতাদের নিজেদের চলচ্চিত্রের ভাষাও তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত। তার পরিচালিত ‘মাস্টার’ রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিগ স্ক্রিন বিভাগে প্রদর্শিত হয়ে বিগ স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।
রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত বলেন, ‘আমাদের নির্মাতাদের নিজস্ব স্বর তৈরি করতে হবে। গল্প, উপস্থাপন, চিত্রগ্রহণ, শব্দ পরিকল্পনা ও চরিত্র নির্মাণে নিজস্বতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ব সিনেমার বর্তমান ভাষা সম্পর্কেও ধারণা থাকতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক সিনেমাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করলে হবে না। আমাদের গল্প ও চরিত্রের শিকড় থাকতে হবে বাংলা ও বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে।’
আন্তর্জাতিক সাফল্য থেকে বাজারের সম্ভাবনা
আন্তর্জাতিক উৎসবে সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ। কোনো সিনেমা বড় উৎসবে নির্বাচিত হলে কিংবা পুরস্কার পেলে আন্তর্জাতিক বিক্রয় প্রতিনিধি, পরিবেশক ও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের নজরে আসার সম্ভাবনা বাড়ে। এর পাশাপাশি এখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক বাজারে আরো সাফল্যের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো তরুণ নির্মাতাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা। প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও কাজের পরিবেশ তৈরি করতে পারলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সিনেমা সাফল্য পাবে।