বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, এক দীর্ঘ চড়াই উৎরাইয়ের নাম। যেখানে আলো-ছায়ার ভেতর দিয়ে একটি জাতির ইতিহাস, স্বপ্ন, পতন আর পুনর্জাগরণের গল্প ক্রমাগত লেখা হয়েছে।
এই যাত্রার সূচনা উনিশ শতকের অন্তিম প্রহরে। ১৮৯৮ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো বায়োস্কোপ প্রদর্শিত হয়।এরপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে প্রদর্শন ও নির্মাণের প্রাথমিক কাঠামো। ১৯১০-এর দশকে অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত পরিচালিত ‘সুকুমারী’ নামের স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যা এই অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত। এ চলচ্চিত্রের উদ্যোক্তা ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবার। এর কিছু পরেই একই নির্মাতার নির্মাণে আসে পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’, যা বাঙালির চলচ্চিত্র-সৃষ্টির আত্মপ্রকাশকে সুস্পষ্ট করে তোলে।
১৯৪৭-এর ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার বিভাজনের পর পূর্ববাংলা যখন পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত হয়, তখন চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে এক নীরব প্রতিরোধের ভাষা। সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সাংস্কৃতিক চাপের মধ্যেও ১৯৫৬ সালে আব্দুল জব্বার খান নির্মিত ‘মুখ ও মুখোশ’ এ ভূখণ্ডের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, জাতির পুনর্গঠন এবং সামাজিক বাস্তবতার গভীরতা চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হতে থাকে। ১৯৭২ সালে চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ‘ওরা এগারো জন’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম দিককার চলচ্চিত্রগুলোর একটি হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই সময়েই গড়ে ওঠে ঢাকাকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রশিল্প, যা ‘ঢালিউড’ নামে পরিচিত।
সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সময়টি ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ। জহির রায়হান ও আলমগীর কবিরের মতো নির্মাতারা চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের গণ্ডিতে আটকে রাখেননি; বরং এটিকে রূপ দিয়েছিলেন সমাজ-সচেতন শিল্পমাধ্যমে। একইসঙ্গে বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রও সমানতালে জনপ্রিয়তা পায়।
তবে নব্বইয়ের দশকে এসে এ প্রবাহে ভাঙন দেখা দেয়। সালমান শাহর মতো তারকার উত্থান চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করলেও, তার অকালমৃত্যু ১৯৯৬ সালে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে। একই সময়ে চলচ্চিত্রের গল্পে একঘেয়েমি, বিদেশী চলচ্চিত্রের অনুকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা শিল্পটিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তোলে।
চলতি দশকের শুরুতে এ সংকট চরমে পৌঁছে। পাইরেসি চলচ্চিত্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ভেঙে দেয়, একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যায়, এবং নিম্নমানের নির্মাণ ও পুনরাবৃত্ত কাহিনি দর্শকদের বিমুখ করে তোলে।
কিন্তু ইতিহাসের মতোই, এই শিল্পও থেমে থাকেনি। ২০১০-এর দশক থেকে শুরু হয় এক নীরব পুনর্জাগরণ। ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার, নতুন নির্মাতাদের আগমন ও ভিন্নধর্মী গল্প বলার প্রয়াস চলচ্চিত্রে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। নগরজীবন, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও বাস্তবধর্মী কাহিনি ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় পর্দায়।
এই ধারার পরিণতি স্পষ্ট হয় ২০২১ সালে, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান চলচ্চিত্রের দর্শকভিত্তিকে বিস্তৃত করে, এবং নির্মাতাদের সামনে খুলে দেয় নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
তবুও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, সীমিত প্রেক্ষাগৃহ, অর্থসংকট, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং নীতিগত প্রতিবন্ধকতা এখনো এই শিল্পকে চাপে রাখে। কিন্তু এর মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক নতুন দিগন্ত।যেখানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আর কেবল অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব ভাষা ও নান্দনিকতায় বিশ্বমুখী হয়ে উঠছে।