হরর, অ্যাকশন ও ফ্র্যাঞ্চাইজির দাপট— বলিউডে প্রযোজকরা কেমন গল্প চাইছেন

চলতি বছরের বলিউডে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নিঃসন্দেহে ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’। বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৮০০ কোটিরও বেশি রুপি আয় করা ছবিটি শুধু বক্স অফিসে নয়, প্রযোজকদের চিন্তাভাবনায়ও বড় প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ‘ভূত বাংলা’, ‘বর্ডার ২’ এবং ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’-এর সাফল্য প্রমাণ করেছে, বড় পর্দার দর্শক এখনো শক্তিশালী বিনোদন খুঁজছেন। ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’-এর ব্যর্থতার পর এখন নজরে রয়েছে ‘আলফা’, ‘রামায়ণ’ও ‘কিং’-এর মতো বড় ছবির দিকে

সর্বশেষ দুই-আড়াই দশকের বলিউড খেয়াল করলে কিছু প্রবণতা চোখে পড়ে। একসময় বায়োপিকের জোয়ার ছিল, এরপর আসে প্যান-ইন্ডিয়া অ্যাকশন, স্পাই ইউনিভার্স আর ফ্র্যাঞ্চাইজি সিনেমার যুগ। প্রায় নীরবেই হারিয়ে গেছে রোমান্টিক সিনেমা। এখন আবার বদলে যাচ্ছে সমীকরণ। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার মুখে প্রশ্ন উঠেছে—বলিউডের বর্তমান ট্রেন্ড কী? প্রযোজকরা এখন কেমন গল্প চাইছেন? আর কোন ধরনের গল্প ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে চিত্রনাট্যকার এবং স্ক্রিনরাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এসডব্লিউএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন এক বলিউড, যেখানে একদিকে বড় বাজেটের বাণিজ্যিক সিনেমার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে, অন্যদিকে মৌলিক গল্প ও বৈচিত্র্যময় ঘরানার সংকটও স্পষ্ট। ফলে বিভ্রান্তিতে ভুগছেন প্রযোজকরা।

চলতি বছরের বলিউডে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নিঃসন্দেহে ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’। বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৮০০ কোটিরও বেশি রুপি আয় করা ছবিটি শুধু বক্স অফিসে নয়, প্রযোজকদের চিন্তাভাবনায়ও বড় প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ‘ভূত বাংলা’, ‘বর্ডার ২’ এবং ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’-এর সাফল্য প্রমাণ করেছে, বড় পর্দার দর্শক এখনো শক্তিশালী বিনোদন খুঁজছেন। ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’-এর ব্যর্থতার পর এখন নজরে রয়েছে ‘আলফা’, ‘রামায়ণ’ও ‘কিং’-এর মতো বড় ছবির দিকে।

চিত্রনাট্যকার অলঙ্কৃতা শ্রীবাস্তবের মতে, বড় পর্দায় এখন সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে হরর ঘরানার। তার মতে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ভিন্নধর্মী হরর সিনেমা দেখিয়েছে, নতুন প্রজন্মের দর্শক এই ধরনের গল্পকে সাদরে গ্রহণ করছে। তবে একই সঙ্গে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ব্যক্তিগত অনুভূতি বা দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট গল্পভিত্তিক ‘স্লাইস অব লাইফ’ সিনেমার প্রতি এখন প্রযোজকদের আগ্রহ খুবই কম। তার বিশ্বাস, ছোট বাজেটের সাহসী ও নিরীক্ষাধর্মী সিনেমার জন্য এখনই উপযুক্ত সময়।

চিত্রনাট্যকার সাইউইন কোয়াড্রাস অবশ্য ভিন্ন একটি সংকটের কথা বলেছেন। তার মতে, ‘ধুরন্ধর’-এর বিশাল সাফল্যের পর অনেক প্রযোজকই আসলে বিভ্রান্ত। তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, পরবর্তী বড় বাজি কোন ধরনের গল্পে ধরা উচিত। তিনি বলেন, প্রযোজকদের সঙ্গে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে শব্দগুলো শোনা যায়, তা হলো—হরর, মাঝারি বাজেট এবং ওটিটি। এমনকি বড় পর্দায় সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকা গল্পও অনেক সময় ওটিটির জন্য বেশি উপযুক্ত বলে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। তার ধারণা, প্রচলিত ভূতের গল্পের বদলে মনস্তাত্ত্বিক হরর বা অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার ঘরানায় নতুন সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যকার অঙ্কুর পাঠকের পর্যবেক্ষণ, এখন সৃজনশীলতার চেয়ে অ্যালগরিদমই বেশি প্রভাব ফেলছে। আগে বিভিন্ন ধরনের গল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও এখন সফল কোনো সিরিজের ফর্মুলাকেই বারবার অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে একই ধরনের অপরাধ, রহস্য, কার্টেল, থ্রিলার কিংবা অতীতের ট্রমায় ভোগা পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে গল্পই বেশি দেখা যাচ্ছে।

তার মতে, এই প্রবণতা সৃজনশীলতার পরিসর সংকুচিত করছে। রাজনৈতিক গল্পকে ঝুঁকিপূর্ণ, অযৌক্তিক কমেডিকে অতিরিক্ত পরীক্ষামূলক মনে করা হচ্ছে। অথচ বলিউডের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল রোমান্টিক সিনেমা। সেই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। একই সঙ্গে আধুনিক শহুরে জীবনের সংকট, সম্পর্ক ও বাস্তবতাভিত্তিক গল্পও প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে।

চিত্রনাট্যকার সত্যাংশু সিং লেখকদের ট্রেন্ডের প্রতি অন্ধ না থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তার যুক্তি, আজ যে ঘরানার চাহিদা বেশি, তেমন একটি সিনেমা নির্মাণ শেষ হতে হতে কয়েক বছর কেটে যায়। তখন সেই ট্রেন্ড হয়তো আর থাকবে না। তাই বাজারের চাহিদার চেয়ে নিজের বিশ্বাস ও আবেগ থেকে গল্প বেছে নেওয়াই একজন লেখকের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

স্ক্রিনরাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি চারুদত্ত আচার্যের মতে, লেখকদের জন্য পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। এখন আরো বেশি প্রযোজনা সংস্থা শুরু হচ্ছে। তবে লেখকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যূনতম চুক্তি কার্যকর করা এবং রয়্যালটি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই এখন সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য।

সব মিলিয়ে বলিউডের বর্তমান চিত্রে কয়েকটি প্রবণতা স্পষ্ট। বড় বাজেটের অ্যাকশন, হরর এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি সিনেমার প্রতি আগ্রহ এখনো সবচেয়ে বেশি। স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে অপরাধ ও থ্রিলারনির্ভর গল্পের আধিপত্য বজায় রয়েছে। তবে একই সঙ্গে নির্মাতা ও লেখকদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রেমের গল্প, শহুরে জীবন এবং ছোট পরিসরের মানবিক গল্পের জন্যও দর্শকের আগ্রহ রয়েছে—শুধু সেই ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখাতে হবে প্রযোজকদের।

আরও