বলিউড এ বছর কোনো এক ধারার সিনেমা নিয়ে এগোয়নি। ছিল ঐতিহাসিক মহাকাব্য, কোর্টরুম ড্রামা, যুদ্ধের সিনেমা, প্রেমকাহিনী, সামাজিক গল্প, কমেডি আর মাঝারি বাজেটের চমকের বছর। বলা হচ্ছে, ২০২৫ আসলে বলিউডের প্রত্যাবর্তনের বছর। তবে সেটা বলিউড জোর গলায় দাবি করেনি; অর্জন করেছে।
এ বছর বেশকিছু বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। তবে ২০২৫ শুধু ‘সুপারস্টার’দের বছর ছিল না। এ বছর গল্পভিত্তিক সিনেমাই দর্শক পছন্দ করেছেন। বড় বাজেটের কিছু সিনেমা ভালো আয় করেছে। অন্যান্য স্বল্প বাজেটের সিনেমাও ভালো করেছে। হাইপের চেয়ে কনটেন্টেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন দর্শক। বলিউড দিয়েছে হিট, ব্লকবাস্টার, অ্যাভারেজ, ফ্লপ আর ডিজাস্টার—কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, দিয়েছে বৈচিত্র্য।
২০২৫ সাল শুরু হয়েছিল ভিকি কৌশল অভিনীত ‘ছাভা’ দিয়ে। সম্ভাজি মহারাজ হিসেবে ভিকি কৌশলের অভিনয় ছিল সম্পূর্ণ নিবেদন। প্রত্যাশা নিয়ে আসা এ সিনেমা করতালি নিয়ে ফিরেছে। ১৫০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটির বৈশ্বিক আয় ৮০০ কোটি রুপির বেশি। এর মধ্যে ভারত থেকে আয় করেছে ৬০০ কোটি রুপির বেশি।
বছরের শেষে মুক্তি পেয়েছে আদিত্য ধর পরিচালিত ধুরন্ধর। সিনেমাটি শুরুতে দর্শক না পেলেও পরবর্তী সময়ে ব্লকবাস্টারে পরিণত হয়েছে। মজার ব্যাপার, ছাভা ও ধুরন্ধর উভয় সিনেমাতেই প্রশংসিত হয়েছেন অক্ষয় খান্না। এ যেন তার প্রত্যাবর্তন। ২৫০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি এ পর্যন্ত ৭৪০ কোটি রুপি আয় করেছে। এর মধ্যে ভারত থেকে আয় হয়েছে ৪৮৫ কোটি রুপি।
বলিউডে নাকি এখন রোমান্টিক সিনেমা চলে না। সে ধারণা ভেঙেছে মোহিত সুরির সাইয়ারা। দুই নবাগত অভিনেতা অভিনেত্রীকে নিয়ে এ সিনেমা তোলপাড় করে দিল। মনে করিয়ে দিল ‘আশিকি’র কথা।
এই সিনেমাগুলো যেমন সফল হয়েছে। তেমনি কিছু সিনেমা বাজেভাবে ব্যর্থও হয়েছে। যশরাজ ফিল্মসের ওয়ার টু ব্যর্থ হয়েছে। হৃতিক রোশন, জুনিয়র এনটিআরের মতো অভিনেতা থাকার পরও সিনেমাটা ভালো করেনি। ৪০০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি সারা বিশ্ব থেকে আয় করেছে ৩৬০ কোটি রুপি।
আরেক ব্যর্থতার নাম সিকান্দার। সালমান খান থাকলেও সিনেমায় ছিল না কোনো ম্যাজিক। ফলাফল, চরম ব্যর্থতা। সালমান খান মূল অভিনেতা, পরিচালক দক্ষিণের এআর মুরুগাদোস। নায়িকা রাশমিকা মানদানা। এতকিছুর পরও ২০০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমার আয় ১৮২ কোটি রুপি।
অর্থাৎ যে ধারার সিনেমা আগের বছরও বক্স অফিসে ভালো করেছে তা-ই এ বছর দর্শক টানেনি। সে কারণেই কৌশল বদলান আমির খান। তিনি ধীরেসুস্থে ফিরলেন। তারে জমির পার-এর সিকুয়াল সিতারে জমিন পার নিয়ে এলেন। সিনেমাটি বলেছিল সহমর্মিতা, বেড়ে ওঠা আর মানবিক সংযোগের গল্প। ৮০ কোটি রুপি বাজেটের এ সিনেমার আয় ২৬৮ কোটি রুপি।
প্রথম সিনেমার মতো না হলেও রেইডের সিকুয়াল রেইড টু বেশ ভালো করেছে। ৮০ কোটি রুপির সিনেমাটি ২৩৫ কোটি রুপি আয় করেছে। এই সিনেমা প্রমাণ করেছে—সিকুয়াল তখনই কাজ করে, যখন মূল সিনেমাকে সম্মান করা হয়। সেই কারণেই হয়তো ব্যর্থ হয়েছে ‘মেট্রো... ইন দিনো’। দারুণ কাস্ট থাকা সত্ত্বেও ৪৭ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি মাত্র ৬৮ কোটি রুপি আয় করেছে।
সেই কাজটা করেছে ‘জলি এলএলবি থ্রি’ও। কিন্তু কম প্রচারণা ও গল্পের মোড় না থাকায় খুব বেশি আয় করতে পারেনি। ১০০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি আয় করে ১৭০ কোটি রুপি।
প্রেমের গল্প এ বছর দর্শক বেশিই পছন্দ করেছেন। বছরের শেষে আনন্দ এল রাই কবিতার মতো হৃদয়ভাঙার গল্প উপহার দিলেন। নভেম্বরে মুক্তি পায় ধানুশ ও কৃতি শ্যানন অভিনীত ‘তেরে ইশক মে’। ৭৫ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটির বৈশ্বিক আয় ১৬০ কোটি রুপির মতো।
কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে ধড়ক টু। জাতপাত, মারপিট, তারুণ্য, প্রেম থাকার পরও সিনেমাটি ফ্লপ করেছে। ৪৫ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত সিনেমাটি আয় করেছে ৩১ কোটি রুপি।
কমেডিতেও ছিল একই রকম বিষয়। বড় পরিসরে (বাজেট, সেট, কাস্ট) নির্মিত ‘হাউজফুল ফাইভ’ ২২৫ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত। আয় করেছে ২৯২ কোটি রুপি।
অন্যদিকে, ‘ভুল চুক মাফ’ প্রমাণ করল—দর্শক নিজেকে গল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই সিনেমা হিট হয়। রাজকুমার রাও অভিনীত ৪৫ কোটি রুপিতে নির্মিত সিনেমাটি আয় করেছে প্রায় ৯০ কোটি রুপি।
দেশাত্মবোধক ও রাজনৈতিক সিনেমা বলিউডে ভালো করে। ‘কেশরি চ্যাপ্টার টু’ সেভাবেই নির্মিত। কিন্তু প্রভাব ফেলতে পারেনি। এ তুলনায় ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ আলোচনা বেশি তৈরি করেছিল, কিন্তু টিকিট বিক্রি হয়েছে কম। রাজনৈতিক বক্তব্যে ভরপুর এ সিনেমা কৌতূহলকে দর্শকে রূপান্তর করতে পারেনি।
বলিউডের এ বছরের শক্তি ছিল মাঝারি ও কম বাজেটের সিনেমা। ‘এক দিওয়ানে কি দিওয়ানিয়ত’ ছিল বড় চমক। মুখে মুখে প্রচারে সিনেমা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়েছিল। ৩০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত সিনেমার আয় ১১৩ কোটি রুপি। কিন্তু ‘হক’ তার দর্শক খুঁজে পায়নি। অভিনয় আর বার্তার প্রশংসা হলেও বক্স অফিসে সাড়া ছিল কম। ৩০ কোটিতে নির্মিত সিনেমার আয় ২৭ কোটি রুপি।
এ সবকিছু প্রমাণ করে, বলিউড আসলে হারিয়ে যায়নি। সময়ের পরিক্রমা, দর্শক পছন্দ ও পরিবর্তনশীল চাহিদার কারণে ইন্ডাস্ট্রিটি এখন এ সময়ের জন্য উপযুক্ত ধারা ও কৌশল খুঁজছে। নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিচ্ছে।