ষাটের দশক থেকে বলিউডে নজর আন্ডারওয়ার্ল্ডের, বেড়েছে হুমকি-সহিংসতা

মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্পের যোগাযোগের ইতিহাস ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত বিস্তৃত। ওই সময় হাজি মাস্তানের মতো অপরাধজগতের প্রভাবশালীরা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন এবং বিকল্প অর্থের জোগানদাতা হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৯০-এর দশকে এই সম্পর্ক আরো জবরদস্তিমূলক হয়ে ওঠে। অপরাধী চক্রগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থ বিনিয়োগ, বিদেশে ছবি পরিবেশনার স্বত্ব আদায় এবং অভিনয়শিল্পী নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা শুরু করে

মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। গতকালের এ ঘটনায় অল্পের জন্য রক্ষা পান তিনি। ঘটনাটি ফের সামনে আনল বলিউড তারকাদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হুমকির পুরনো ইতিহাস। বিশেষ করে ১৯৯০ দশক পুরোটা ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলো চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ, অভিনয়শিল্পী নির্বাচন এবং পরিবেশনার স্বত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করত।

অবশ্য মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্পের যোগাযোগের ইতিহাস ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত বিস্তৃত। ওই সময় হাজি মাস্তানের মতো অপরাধজগতের প্রভাবশালীরা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন এবং বিকল্প অর্থের জোগানদাতা হিসেবে কাজ করতেন।

১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৯০-এর দশকে এই সম্পর্ক আরো জবরদস্তিমূলক হয়ে ওঠে। অপরাধী চক্রগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থ বিনিয়োগ, বিদেশে ছবি পরিবেশনার স্বত্ব আদায় এবং অভিনয়শিল্পী নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা শুরু করে।

নব্বইয়ের দশকে একের পর এক হামলা

১৯৯৪ সালের জুনে চলচ্চিত্র প্রযোজক জাভেদ রিয়াজ সিদ্দিকি হত্যাকাণ্ড ছিল ওই দশকে বলিউডের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। পরের মাসে আক্রান্ত হন ফিরোজ সরফরাজ খান নামের আরেক প্রযোজক। এসব তথ্য মুম্বাই পুলিশের অপরাধ শাখার নথিতে রয়েছে।

১৯৯৭ সালের ৭ মার্চ আন্ধেরিতে নিজের কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রযোজক ও পরিচালক মুকেশ দুগ্গলকে। তিনি ‘ফতেহ’, ‘সাথী’ ও ‘প্ল্যাটফর্ম’-এর মতো চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছিলেন। এ ছাড়া ‘গোপী কিষাণ’ ছবিটি পরিচালনা করেন তিনি।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী চক্রের সদস্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তদন্তকারীদের ধারণা ছিল, ছোট রাজন ও ছোট শাকিলের সহযোগীদের মধ্যকার বিরোধের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে।

একই বছরের ৩১ জুলাই ‘ত্রিদেব’ ও ‘গুপ্ত’ ছবির পরিচালক রাজীব রাই নিজের কার্যালয়ের বাইরে হামলার শিকার হন। তবে দেহরক্ষীরা পাল্টা গুলি চালালে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। হামলাকারীরা আবু সালেমের গ্যাংয়ের সদস্য বলে ধারণা করা হয়েছিল। গুলিবর্ষণের আগেও রাইকে হুমকি দেয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

আহত টাইগার শ্রফ

গুলশান কুমার হত্যা

এর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে, ১৯৯৭ সালের ১২ আগস্ট আন্ধেরিতে একটি মন্দিরের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয় টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা ও সংগীত প্রযোজক গুলশান কুমারকে। এই হত্যাকাণ্ড বলিউড ও সংগীতশিল্পে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল, তা আরো প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।

মনমোহন শেঠি ও রাকেশ রোশনকে লক্ষ্য করে হামলা

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগেও এই সহিংসতা অব্যাহত ছিল। চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং এডল্যাবসের প্রতিষ্ঠাতা মানমোহন শেঠি ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে প্রাণনাশের চেষ্টা থেকে বেঁচে যান।

ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর আবু সালেমের এক সহযোগী তাকে গুলি করার চেষ্টা করেন। এরপর থেকে শেঠি সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা শুরু করেন। পাশাপাশি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বা সিসিটিভির মাধ্যমে কার্যালয়ে আসা ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়ান।

২০০০ সালের ২১ জানুয়ারি সান্তাক্রুজ ওয়েস্ট এলাকায় নিজের কার্যালয়ের বাইরে গুলির মুখে পড়েন অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক রাকেশ রোশন। এমনই সময় ঘটনাটি ঘটে, যখন তার ছেলে হৃতিক রোশন অভিনীত ‘কহো না... পেয়ার হ্যায়’ ছবিটি সবে সাফল্য পেয়েছে।

রাকেশ রোশনের হাত ছুঁয়ে একটি গুলি বেরিয়ে যায়। আরেকটি গুলি তার বুক ঘেঁষে যায়। চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

‘কহো না... পেয়ার হ্যায়’ ছবিতে হৃতিক রোশন ও আমিশা প্যাটেল

পরবর্তী সময়ে রাকেশ রোশন জানান, আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকজন চাইছিল, তাদের অর্থায়নে নির্মিত ছবিতে হৃতিক অভিনয় করুন। কিন্তু এমন দাবি মেনে ছেলের শুটিংয়ের সময়সূচি পরিবর্তন করতে রাজি হননি তিনি।

২০২৬ সালের এপ্রিলে চলচ্চিত্র নির্মাতা রাম গোপাল ভার্মাও একই ধরনের দাবি করেন। তার বক্তব্য ছিল, ছোট শাকিলের চক্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করায় রাকেশ রোশনের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল।

অভিনেতা হত্যা, পরিচালককে ভয় দেখানো

২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বোরিভলির ন্যাশনাল পার্কে গুলি করে হত্যা করা হয় অভিনেতা ও প্রযোজক দীনেশ আনন্দকে। হিন্দি ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি। নিহত প্রযোজক মুকেশ দুগ্গলের নির্মিত একাধিক ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন আনন্দ।

২০০২ সালের জুলাইয়ে ওশিওয়ারায় নিজের কার্যালয়ের বাইরে হামলার শিকার হন ‘সাজন’ ছবির পরিচালক লরেন্স ডি’সুজা। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

দুই বন্দুকধারী গুলি চালালেও তাকে সরাসরি লক্ষ্য করা হয়নি। একটি গুলি শূন্যে ছোড়া হয়, আরেকটি লাগে ফটকে এবং তৃতীয়টি আঘাত করে পাশের একটি ভবনের দেয়ালে।

পুলিশের ধারণা ছিল, ইজাজ লাকদাওয়ালা গ্যাংয়ের জন্য চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে চলচ্চিত্রশিল্পকে ভয় দেখাতেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। এর আগে টেলিফোনে ডি’সুজার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

সময় বদলেছে, হামলা থামেনি

সময়ের সঙ্গে সহিংসতার ধরন বদলেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চলচ্চিত্র তারকাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও হুমকির ঘটনা আবারও সামনে এসেছে।

২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল বান্দ্রায় সালমান খানের বাসভবনের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই হামলাকারী কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। তবে সালমান খান অক্ষত থাকেন। মুম্বাই পুলিশের দাবি, কারাগারে থাকা গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়েছিল। মহারাষ্ট্রের সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে উত্তর প্রদেশের বেরেলিতে অভিনেত্রী দিশা পাটানির পরিবারের বাসভবনের বাইরে গুলি চালায় বন্দুকধারীরা।

২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জুহুতে চলচ্চিত্র পরিচালক-প্রযোজক রোহিত শেঠির বাসভবন লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ওই বছরের এপ্রিলে মুম্বাই পুলিশ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। পুলিশের দাবি, নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছিল। তবে রোহিত শেঠিকেই কেন লক্ষ্য করা হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট হয়নি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম অবলম্বনে

আরও