আলাউদ্দিন খাঁ

শিবপুর থেকে মাইহার— এক সুরসন্ধানীর দীর্ঘ যাত্রা

আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন একইসঙ্গে কঠোর ও কোমল। তার শিক্ষাদানের কঠোরতা কিংবদন্তি হয়ে আছে; এমনকি শিষ্যদের প্রতি তার রাগ কখনো শারীরিক শাস্তিতেও পৌঁছাত। ওই সময়ের গুরু-শিষ্য পরম্পরার কঠোর বাস্তবতার সাক্ষ্য মেলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে

ছোটবেলায় তিনি যোগ দিয়েছিলেন একটি যাত্রাদলে। বাংলার পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে পরিচিত হয়েছিলেন জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পাঁচালির মতো লোকসংগীতের অসংখ্য সুরের সঙ্গে। সংগীত তখন তার কাছে কোনো একক ঘরানায় শেখার বিষয় ছিল না, যেন সমগ্র বাংলাই ছিল আলাউদ্দিন খাঁর প্রথম সংগীতবিদ্যালয়

তার কাছে কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র ছিল না, ছিল না কোনো নিশ্চিত গন্তব্য। শুধু ছিল এক অদ্ভুত ক্ষুধা— সুরের ক্ষুধা। পুরো ভারতবর্ষের সংগীতকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সেই মানুষটির জন্ম বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুরে। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, যার হাতে সরোদ শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র থাকেনি, হয়ে উঠেছিল এক সম্পূর্ণ সংগীত-ভাষা।

ছোটবেলায় তিনি যোগ দিয়েছিলেন একটি যাত্রাদলে। বাংলার পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে পরিচিত হয়েছিলেন জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পাঁচালির মতো লোকসংগীতের অসংখ্য সুরের সঙ্গে। সংগীত তখন তার কাছে কোনো একক ঘরানায় শেখার বিষয় ছিল না, যেন সমগ্র বাংলাই ছিল আলাউদ্দিন খাঁর প্রথম সংগীতবিদ্যালয়।

তারপর কলকাতা। সেখানে গুরু নুলো গোপালের কাছে শিষ্যত্ব নেয়ার সময় নিজের পরিচয়ও বদলে ফেলতে হয়েছিল বলে তার জীবনকথার বিভিন্ন বিবরণে পাওয়া যায়। নুলো গোপাল ছিলেন কঠোর, প্রাচীন ধারার সংগীতজ্ঞ। তার কাছে শিক্ষা মানে ছিল দীর্ঘ সাধনা- প্রথমে বছরের পর বছর শুধু স্বর-সরগম। কোনো গান নয়, কোনো বাহারি পরিবেশন নয়। কিছু স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়, আলাউদ্দিন খাঁর দিন শুরু হতো গভীর রাতে; কখনো মাত্র একবেলা খাবার জুটত, আর গঙ্গার জলই হয়ে উঠত রাতের আহার। এমনকি অনুশীলনের সময় যেন ঘুমিয়ে না পড়েন তাই চুল বেধে রাখা হত। যাতে চুলে টান পড়ে যাতে ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু সাত বছর পর হঠাৎ সেই সাধনার পৃথিবী ভেঙে গেল। প্লেগে মারা গেলেন নুলো গোপাল।

বাবা আলাউদ্দিন খাঁ তখন সংগীত ছেড়ে দেননি, বরং আরো গভীরে ডুবে গেলেন। এবার কণ্ঠ নয়, বাদ্যযন্ত্র। স্টার থিয়েটারের সংগীত পরিচালক অমৃতলাল দত্তের কাছে তিনি শিখলেন সেতার, বাঁশি, পিকোলো, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জোসহ নানা যন্ত্র। গোয়ার ব্যান্ডমাস্টার লোবোর কাছে শিখলেন পাশ্চাত্য ধারার বেহালা। অন্য গুরুদের কাছে শিখলেন সানাই, পাখোয়াজ, মৃদঙ্গ, তবলা। তিনি যেন এক জীবনে বহু সত্তা নিয়ে বেঁচেছিলেন।

তারপর একদিন মুক্তাগাছার জমিদারবাড়িতে তিনি শুনলেন সরোদের সুর। বাদ্যযন্ত্রটি তাকে এমনভাবে টেনে নিল যে জীবনের দিকই বদলে গেল। আহমদ আলী খাঁর কাছে সরোদের শিক্ষা, তারপর রামপুরে ওস্তাদ ওয়াজির খানের কাছে দীর্ঘ সাধনা-তানসেনের সেনিয়া পরম্পরার সেই কঠিন শিক্ষাই পরে তার সংগীতের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে।

গুরু-অন্বেষণের পথে কতটা উন্মত্ত ছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ, তা বোঝাতে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি আছে— ওয়াজির খান নিষ্ঠা যাচাই করতে তাকে এক ভয়ংকর পরীক্ষার মুখে ফেলেছিলেন, আলাউদ্দিন খাঁ নাকি ছুটে আসা গাড়ির সামনে ঝাঁপ দিয়ে নিজের সংকল্প প্রমাণ করেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত তার ঠিকানা হলো মধ্য ভারতের মাইহার। সেখানেই আরেকটি অদ্ভুত অধ্যায়। এক মহামারিতে অনেক শিশু অনাথ হয়ে গেলে আলাউদ্দিন খাঁ তাদের দেখে স্থির থাকতে পারেননি। রাজদরবারের সংগীতজ্ঞ হয়েও তিনি তাদের হাতে তুলে দিলেন বাদ্যযন্ত্র। যে শিশুর হাতে যে যন্ত্র মানায়, সেটিই তাকে শেখালেন। সেই উদ্যোগ থেকেই গড়ে উঠল মাইহার ব্যান্ড— ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এক অনন্য অর্কেস্ট্রা।

মাইহারেই তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তৈরি হলো। শিষ্যদের মধ্যে ছিলেন ছেলে আলী আকবর খান, মেয়ে অন্নপূর্ণা দেবী, রবিশঙ্কর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল ঘোষ— পরবর্তী সময়ে যারা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেন। আলাউদ্দিন খাঁ শুধু তাদের বাজানো শেখাননি; তৈরি করেছিলেন চিন্তার পদ্ধতি, সাধনার নৈতিকতা, একটি সংগীত-পরম্পরা, যা পরে মাইহার ঘরানা নামে পরিচিত হয়।

আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন একইসঙ্গে কঠোর ও কোমল। তার শিক্ষাদানের কঠোরতা কিংবদন্তি হয়ে আছে; এমনকি শিষ্যদের প্রতি তার রাগ কখনো শারীরিক শাস্তিতেও পৌঁছাত। ওই সময়ের গুরু-শিষ্য পরম্পরার কঠোর বাস্তবতার সাক্ষ্য মেলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে। আবার অন্যদিকে, একজন অসহায় প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকের ব্যক্তিগত যত্ন নেয়ার গল্পও তার জীবনকে ঘিরে প্রচলিত।

১৯৩৫ সালে উদয় শঙ্করের নৃত্যদলের সঙ্গে ইউরোপ সফরে গিয়ে তিনি পশ্চিমা শ্রোতাদের সামনে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক নতুন দরজা খুলে দেন উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। পরে উদয় শঙ্করের ‘কল্পনা’ চলচ্চিত্রের সংগীতও পরিচালনা করেন। তার সংগীতের প্রভাব শুধু সরোদের তারে থেমে থাকেনি; তিনি নতুন রাগ সৃষ্টি করেছেন, বাদ্যযন্ত্রের নির্মাণ ও ব্যবহারে পরীক্ষা করেছেন, এমনকি সরোদের বাজানোর ধরনেও পরিবর্তন এনেছেন।

উস্তাদ আলাউদ্দিন খান ১৯৭২ সালের আজকের দিনে ১০৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু কিছু শিল্পী নিজের সংগীত দিয়ে বেঁচে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই ছোট ছেলেটি ঘর ছেড়েছিল সুরের সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সে নিজেই হয়ে উঠেছিল সুরের একটি আস্ত ঘর।

আরও